এসএসসি পাসের আনন্দে মিষ্টি কেনার বদলে সহপাঠীর ক্যানসার আক্রান্ত মায়ের চিকিৎসায় ৪০ হাজার টাকা তুলে দিয়ে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল একদল শিক্ষার্থী। এবার সেই মানবিক উদ্যোগে সাড়া দিয়ে অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার জন্য নগদ ২ লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কালিদাস গ্রামের কলতান বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া অর্থ নাঈম সিকদারের দাদার হাতে তুলে দেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, কালিদাস কলতান বিদ্যানিকেতনের শিক্ষার্থী নাঈম সিকদারের মা লাইলী বেগম ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনূস আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যেই তার চিকিৎসা ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছিল।
আনন্দের মিষ্টি নয়, বন্ধুর মায়ের চিকিৎসায় ৪০ হাজার টাকা
এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের কয়েক দিন আগে নাঈমের মায়ের শরীরে ক্যানসার শনাক্ত হয়। একই সময়ে পরিবারটি পড়ে চরম আর্থিক সংকটে। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছিল পরিবারটি।
এ অবস্থায় নাঈমের সহপাঠীরা সিদ্ধান্ত নেয়, এসএসসি পাসের আনন্দে মিষ্টি কিনে উৎসব না করে সেই অর্থ বন্ধুর মায়ের চিকিৎসায় দেওয়া হবে। গত ১৬ আগস্ট শিক্ষার্থীরা নাঈমের দাদা আব্দুস সাত্তার সিকদারের হাতে ৪০ হাজার টাকা তুলে দেয়।
পরে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং অন্যান্য শ্রেণির শিক্ষার্থীরাও তাদের পাশে দাঁড়ান। ছোট্ট এই উদ্যোগ ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে।
মানবিক উদ্যোগ নজরে প্রধানমন্ত্রীর
শিক্ষার্থীদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের খবর প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। এরপর নাঈমের মায়ের চিকিৎসায় সহযোগিতার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
শনিবার প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ২ লাখ টাকা নগদ সহায়তা নিয়ে নাঈমদের পরিবারের পাশে দাঁড়ান স্থানীয় সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। কলতান বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি নাঈমের দাদার হাতে এই অর্থ তুলে দেন।
সখীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, শিক্ষার্থীদের মানবিক উদ্যোগের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার পর নাঈমের ক্যানসার আক্রান্ত মা লাইলী বেগমের চিকিৎসায় সহযোগিতা করা হয়েছে।
‘নতুন করে সাহস পাচ্ছি’
নাঈম সিকদার জানায়, তার মা বর্তমানে সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনূস আলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। কয়েক মাস আগে তার বাবা আব্দুল সিকদার ধারদেনা করে কাজের আশায় কাতারে যান। তবে সেখানে এখনো কোনো কাজ পাননি। এর মধ্যেই মায়ের শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ায় পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
নাঈম বলেন, এমন কঠিন সময়ে সহপাঠীরা এসএসসি পাসের আনন্দের টাকা মায়ের চিকিৎসায় দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে। এরপর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও সহযোগিতা পাওয়ায় তিনি ও তার পরিবার নতুন করে সাহস পাচ্ছেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে আপ্লুত বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ
কলতান বিদ্যানিকেতনের পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম বাদল বলেন, শিক্ষার্থীদের এমন মানবিক উদ্যোগে তিনি প্রথম থেকেই আপ্লুত হয়েছেন। তাদের সেই উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রীর নজরে গিয়ে নাঈমের পরিবারের জন্য সহযোগিতা পাওয়ায় বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাই আনন্দিত।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিপদের সময় একজন সহপাঠীর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে তারা মানবিকতার যে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে, তা অন্যদের জন্যও অনুপ্রেরণার।
ছোট্ট উদ্যোগে বড় বার্তা
একদিকে ক্যানসারে আক্রান্ত মায়ের চিকিৎসার ব্যয়, অন্যদিকে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অনিশ্চিত কর্মসংস্থান—সব মিলিয়ে নাঈমের পরিবার যখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, তখন সহপাঠীদের ৪০ হাজার টাকার সহায়তা হয়ে ওঠে আশার আলো।
সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রীর ২ লাখ টাকার সহায়তা পরিবারটির চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমাবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।
শিক্ষার্থীদের এই উদ্যোগ কেবল একজন অসুস্থ মায়ের পাশে দাঁড়ানোর ঘটনা নয়; বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহমর্মিতা, বন্ধুত্ব ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চারও একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

