ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

সাড়ে তিন হাত মাটির দাম দেড় কোটি! ঢাকায় কবর সংরক্ষণের নির্মম বাস্তবতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ১৯, ২০২৬, ০৬:৩৯ পিএম

সাড়ে তিন হাত মাটির দাম দেড় কোটি! ঢাকায় কবর সংরক্ষণের নির্মম বাস্তবতা

ছবিঃ সংগৃহীত

প্রিয়জনের শেষ ঠিকানা—কয়েক হাত মাটির একটি কবর। সেখানে শুয়ে থাকেন বাবা-মা, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান কিংবা আপনজন। জীবিত অবস্থায় সবসময় পাশে থাকা সম্ভব না হলেও মৃত্যুর পর সেই মানুষটির শেষ চিহ্নটুকু ধরে রাখতে চান স্বজনেরা। কবর জিয়ারত, কবরের পাশে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা নিয়মিত পরিচর্যার মধ্য দিয়ে প্রিয়জনকে স্মরণ করেন তারা। কিন্তু রাজধানী ঢাকায় সেই শেষ আশ্রয়টুকুও দিন দিন হয়ে উঠছে দুষ্প্রাপ্য এবং ব্যয়বহুল।

জায়গার সংকটে ঢাকার অধিকাংশ কবরস্থানে দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের সুযোগ সীমিত। কোথাও নতুন করে সংরক্ষণের জায়গা নেই, কোথাও আবার নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য কবর সংরক্ষণ করতে গুনতে হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বনানী কবরস্থানে ২৫ বছরের জন্য একটি কবর সংরক্ষণে দিতে হয় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে ২৫ বছরের জন্য ফি ১ কোটি টাকা। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ৭৫ লাখ, উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ৫০ লাখ টাকা।

অন্যদিকে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ২৫ বছরের জন্য ৩০ লাখ এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমিসংলগ্ন কবরস্থানে ২৫ বছরের জন্য ১৫ লাখ টাকা দিতে হয়।

অর্থাৎ রাজধানীতে প্রিয়জনের কবর দীর্ঘদিন ধরে রাখার ইচ্ছা থাকলেও তা অনেক পরিবারের জন্য এখন আর শুধু আবেগের বিষয় নয়—সামর্থ্যেরও প্রশ্ন।

সাড়ে তিন হাত জায়গার জন্যও এত খরচ কেন?

ঢাকার জনসংখ্যা বাড়ছে দ্রুত, কিন্তু বাড়ছে না কবরস্থানের জমি। নগরায়ণের চাপে আবাসন, সড়ক, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও অন্যান্য নাগরিক অবকাঠামোর জন্য জমির চাহিদা বাড়লেও কবরস্থানের জন্য নতুন জমি সংরক্ষণের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

ফলে বিদ্যমান কয়েকটি বড় কবরস্থানের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে। মৃত্যুর পর একজন মানুষের জন্য প্রয়োজন হয় মাত্র কয়েক হাত জায়গা; কিন্তু সেই জায়গাটি দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে গেলে দিতে হচ্ছে বিপুল অর্থ।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—কবর সংরক্ষণের এই উচ্চ ফি কতটা যৌক্তিক? জায়গা সংকটের পুরো দায় কি মৃতের স্বজনদের ওপর বর্তাবে, নাকি নগর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পর্যাপ্ত কবরস্থান নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সিটি করপোরেশনেরও রয়েছে?

রাজধানীতে দুই সিটির অধীনে ৯ কবরস্থান

ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে রাজধানীতে মোট ৯টি কবরস্থান রয়েছে।

এর মধ্যে ডিএসসিসির অধীনে তিনটি—আজিমপুর, জুরাইন ও খিলগাঁও কবরস্থান। অন্যদিকে ডিএনসিসির অধীনে রয়েছে রায়েরবাজার বধ্যভূমিসংলগ্ন কবরস্থান, বনানী, উত্তরা ৪, ১২ ও ১৪ নম্বর সেক্টর এবং মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান।

দক্ষিণখানের চামুড়খান কবরস্থানটিও ডিএনসিসির আওতায় যুক্ত করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সেখানে নতুন করে ৪৮৪টি কবর তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এখনো কবরস্থানটি আনুষ্ঠানিকভাবে সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।

ডিএসসিসির তিন কবরস্থানেই নতুন সংরক্ষণের জায়গা নেই

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীনে থাকা কবরস্থানগুলোর মধ্যে আজিমপুর সবচেয়ে বড়। প্রায় ৩৭ দশমিক ৫০ একর আয়তনের এই কবরস্থানে প্রায় ২৫ হাজার সাধারণ কবরের জায়গা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৮৫০টি কবর সংরক্ষিত।

প্রায় পাঁচ একর আয়তনের খিলগাঁও কবরস্থানে রয়েছে প্রায় চার হাজার কবরের জায়গা। তবে সেখানে বর্তমানে কবর সংরক্ষণের সুযোগ নেই।

অন্যদিকে প্রায় ১৭ দশমিক ২৬ একর আয়তনের জুরাইন কবরস্থানে রয়েছে প্রায় ১২ হাজার কবরের জায়গা। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৭০০টি সংরক্ষিত। সংরক্ষিত কবরের মধ্যে প্রায় ২০০টি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া মুরাদপুর ও ধলপুর এলাকায় প্রায় ৯৭ শতাংশ জমিতে আরও প্রায় ৯০০টি সাধারণ কবরের জায়গা রয়েছে।

ডিএসসিসির তথ্যমতে, প্রতিবছর গড়ে প্রায় সাত হাজার লাশ দাফন করা হয়। প্রতিটি লাশ দাফনের জন্য নির্ধারিত রেজিস্ট্রেশন ফি ১ হাজার টাকা। এর সঙ্গে কবর খনন, বাঁশ ও চাটাই বাবদ কবরের ধরন অনুযায়ী আলাদা ফি দিতে হয়।

১০ বছরের কবর সংরক্ষণে ৫ লাখ, ২৫ বছরে ২০ লাখ

ডিএসসিসির তিনটি কবরস্থানেই কবর সংরক্ষণের ফি একই। ১০ বছরের জন্য ৫ লাখ, ১৫ বছরের জন্য ১০ লাখ, ২০ বছরের জন্য ১৫ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ২০ লাখ টাকা নির্ধারিত।

তবে বড় অঙ্কের এই ফি দেওয়ার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে তিনটি কবরস্থানেই নতুন করে কবর সংরক্ষণের জায়গা নেই।

সংরক্ষিত কবরের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে স্বজনেরা পুনরায় দাফনের সুযোগ পান। তবে পিতা, মাতা, ভাই, বোন, পুত্র ও কন্যা ছাড়া অন্য কাউকে সংরক্ষিত কবরের ওপর পুনরায় দাফনের সুযোগ নেই।

কবরস্থান থেকে কোটি টাকার রাজস্ব, কিন্তু আলাদা ব্যয় নেই

কবরস্থান ও শ্মশান খাত থেকেও দুই সিটি করপোরেশন প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় করছে।

ডিএসসিসির তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত কবরস্থান ও শ্মশান খাত থেকে আয় হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ টাকা।

২০২৫ সালে এ খাত থেকে আয় হয় ২ কোটি ৬৮ লাখ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৪ সালে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ২৬ হাজার টাকা, ২০২৩ সালে ৮ কোটি ৬১ লাখ ৫০ হাজার ৪৭২ টাকা, ২০২২ সালে ৩ কোটি ৮৭ লাখ ৮৯ হাজার টাকা এবং ২০২১ সালে ১ কোটি ৩৫ লাখ ২৩ হাজার টাকা আয় হয়েছে।

তবে কবরস্থান থেকে আদায় করা অর্থ আলাদাভাবে কবরস্থান ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করা হয় না। সিটি করপোরেশনের অন্যান্য রাজস্বের সঙ্গে তা সমন্বয় করে বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়।

ডিএসসিসিতে নতুন কবরস্থানের জন্য জমি চাওয়া হয়েছে

ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা জানান, রাজধানীতে কবরস্থানের সংকট ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। বিদ্যমান কবরস্থানগুলোর আয়তন বাড়ানোর সুযোগও সীমিত।

তিনি বলেন, নতুন কবরস্থান স্থাপনের জন্য ঢাকার জেলা প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। নতুন জমি পাওয়া গেলে বিদ্যমান কবরস্থানগুলোর ওপর চাপ কিছুটা কমবে।

ডিএনসিসিতে বছরে গড়ে ৬ হাজার দাফন

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ছয়টি কবরস্থানে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ছয় হাজার লাশ দাফন করা হয়।

সাধারণ কবরের রেজিস্ট্রেশন ফি ৫০০ টাকা। এর সঙ্গে বাঁশ ও চাটাই বাবদ কবরের ধরন অনুযায়ী ২৩৫ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ৪৮৭ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। তবে দুস্থ ও অসহায় ব্যক্তিদের জন্য ১০০ টাকায় নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে।

ডিএনসিসির তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কবরস্থান খাত থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ৫ কোটি ২০ লাখ ৯৬ হাজার ১০০ টাকা।

এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৪ কোটি ৫৭ লাখ ২০ হাজার ৪ টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭ কোটি ২৯ লাখ ৩৭ হাজার ৩৮১ টাকা, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৭ কোটি ১২ লাখ ৬৭ হাজার ৮০০ টাকা এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০ কোটি ৩৬ লাখ ৯ হাজার ৯০০ টাকা রাজস্ব আয় হয়।

বনানীতে ২৫ বছরের কবরের জন্য দেড় কোটি টাকা

ডিএনসিসির কবরস্থানগুলোর মধ্যে কবর সংরক্ষণে সবচেয়ে বেশি অর্থ দিতে হয় বনানীতে।

সেখানে ১৫ বছরের জন্য কবর সংরক্ষণের ফি ১ কোটি টাকা এবং ২৫ বছরের জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে ১৫ বছরের জন্য ৭৫ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ১ কোটি টাকা। উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে যথাক্রমে ৫০ লাখ ও ৭৫ লাখ টাকা এবং উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ৩০ লাখ ও ৫০ লাখ টাকা।

মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ১৫ বছরের জন্য ২০ লাখ এবং ২৫ বছরের জন্য ৩০ লাখ টাকা। রায়েরবাজার বধ্যভূমিসংলগ্ন কবরস্থানে একই মেয়াদের জন্য দিতে হয় ১০ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা।

এ ছাড়া সাধারণ কবর দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করতে চাইলে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে নির্ধারিত সংরক্ষণ ফির তিন গুণ অর্থ পরিশোধের বিধান রয়েছে।

জায়গা সংকটেই বাড়ছে সংরক্ষণ ফি

ডিএনসিসির এক কর্মকর্তা বলেন, গুলশান, বারিধারা ও বনানীর মতো এলাকায় বসবাসকারী অনেক পরিবার স্বজনের কবর দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করতে চান। কিন্তু কবরস্থানে জায়গার সীমাবদ্ধতা থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সবাইকে এই সুযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না।

তার ভাষ্য, কবর সংরক্ষণে মানুষকে নিরুৎসাহিত করার একটি উপায় হিসেবেও ফি বাড়ানো হয়েছে। ফি বাড়ানোর পর দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের আবেদন আগের তুলনায় কমেছে।

ডিএনসিসির আওতাধীন কবরস্থানগুলোর মোট আয়তন প্রায় ১৯২ একর। এর মধ্যে বনানী কবরস্থানে প্রায় ৯ হাজার ৯৬৫টি, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরে ১ হাজার ৭৪টি, উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরে ১ হাজার ৯৯৮টি, উত্তরা ১৪ নম্বর সেক্টরে ১ হাজার ২৬৩টি, রায়েরবাজারে ৭০ হাজার ৫৮৩টি এবং মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ২৪ হাজার ২০৪টি কবর রয়েছে।

প্রতি তিন মাসে ৩৫-৪০টি আবেদন

সূত্র জানায়, দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের জন্য প্রতি তিন মাসে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০টি আবেদন জমা পড়ে। তবে জায়গা খালি থাকা এবং নীতিমালার শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করে আবেদন অনুমোদন দেওয়া হয়।

বিশেষ করে বনানী কবরস্থানে জায়গার সংকট সবচেয়ে বেশি হওয়ায় সেখানে কবর সংরক্ষণের আবেদন কঠোরভাবে যাচাই করা হয়।

কবর সংরক্ষণ ও পাকাকরণসংক্রান্ত নয় সদস্যের একটি কমিটি আবেদন যাচাই-বাছাই করে। জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃত বা বরেণ্য ব্যক্তি, সাবেক রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সাবেক মেয়র, স্বাধীনতা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তি, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা, জাতীয় অধ্যাপকসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কবর সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

বিশেষ অবদান রাখা ব্যক্তি বা বিশেষ বিবেচনার ক্ষেত্রেও নীতিমালা অনুযায়ী অনুমোদন দেওয়া হতে পারে।

মুক্তিযোদ্ধাদের কবর সংরক্ষণে ফি নেই

সাধারণ নাগরিকদের জন্য কবর সংরক্ষণ যেখানে লাখ লাখ টাকার বিষয়, সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রয়েছে বিশেষ সুবিধা।

মুক্তিযোদ্ধাদের কবর মৃত্যুর পর ১০ বছরের জন্য বিনা মূল্যে সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে।

এ ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি অংশ হিসেবে দেখা হয়।

নগর পরিকল্পনায় কবরস্থানের জায়গা কোথায়?

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার কবরস্থান সংকট নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনায় কবরস্থানকে প্রয়োজনীয় নাগরিক অবকাঠামো হিসেবে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ায় সংকট ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকায় কবরের জায়গা অত্যন্ত দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে। এ কারণেই কবর সংরক্ষণের ফি এত বেশি।

তার মতে, কয়েকটি বড় কবরস্থানের ওপর নির্ভরশীল না থেকে পাড়া বা ওয়ার্ডভিত্তিক ছোট ছোট কবরস্থান গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে স্বজনদের কবর জিয়ারত সহজ হবে এবং বড় কবরস্থানের ওপর চাপও কমবে।

তিনি বলেন, কবর মানুষের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই প্রতিটি ওয়ার্ডে জনসংখ্যার অনুপাতে কবরস্থানের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করা দরকার। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি আবাসিক প্রকল্পে কবরস্থানের জন্য নির্দিষ্ট জায়গা রাখার বাধ্যবাধকতা থাকা প্রয়োজন।

শুধু ফি কমালেই সমাধান হবে না

কবর সংরক্ষণের জন্য এত বেশি ফি কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্নের জবাবে আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, জায়গার সংকটের কারণেই কবর সংরক্ষণের ফি বাড়ছে। শুধু ফি কমিয়ে সমস্যার সমাধান করা যাবে না।

বরং ফি কমানো হলে সংরক্ষণের চাহিদা আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই প্রথমে কবরস্থানের সংখ্যা ও আয়তন বাড়ানো প্রয়োজন।

তার মতে, নগর উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনার পর্যায়েই কবরস্থানের জায়গা নিশ্চিত করা হলে ভবিষ্যতে এই সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব।

ইসলামে কবর সংরক্ষণ কতটা জরুরি?

দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিও আলোচনায় আসছে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষণা বিভাগের মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, ইসলামে কবর সংরক্ষণ জায়েজ হলেও এটি শরিয়তের দৃষ্টিতে সবার জন্য অপরিহার্য নয়।

বিশেষ কোনো ব্যক্তি—যেমন বড় আলেম, অলি, ঐতিহাসিক বা জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কবর সংরক্ষণের বৈধতা থাকতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণ না করাই উত্তম বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তার মতে, ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে কবর সংরক্ষণের সুযোগ থাকলে তা করা যেতে পারে। কিন্তু ব্যাপকভাবে দীর্ঘদিন কবর সংরক্ষণ করে মানুষের বসবাস, কৃষিকাজ কিংবা অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনে জায়গার সংকট তৈরি করা সমীচীন নয়।

মৃতের জন্য জায়গা, নাকি জীবিতের জন্যও পরিকল্পনা?

ঢাকার কবরস্থান সংকট মূলত একটি বৃহত্তর নগর ব্যবস্থাপনার সংকটকেই সামনে আনছে। যে শহরে জীবিত মানুষের বসবাসের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে, সেখানে মৃত্যুর পর কয়েক হাত মাটির জন্যও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

একদিকে স্বজনের কবর ধরে রাখার আবেগ, অন্যদিকে সীমিত জমি ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা—দুই বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

কবর সংরক্ষণের ফি কমানোর দাবি থাকলেও বাস্তব সমাধান সম্ভবত শুধু ফি কমানোর মধ্যে নেই। প্রয়োজন নতুন কবরস্থান সৃষ্টি, ওয়ার্ডভিত্তিক কবরস্থান পরিকল্পনা, আবাসিক প্রকল্পে কবরস্থানের জায়গা নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনায় মৃত্যুর পরের এই প্রয়োজনটিকেও নাগরিক অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা।

কারণ, মানুষের জীবন যেমন একটি ঠিকানা দাবি করে, মৃত্যুর পরও প্রিয়জনের শেষ ঠিকানাটুকু ধরে রাখার অধিকার ও আবেগকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা যায় না। ঢাকার বাস্তবতা এখন সেই প্রশ্নই সামনে আনছে—প্রিয়জনের শেষ ঠিকানা কি কেবল সামর্থ্যবানদের জন্যই সংরক্ষিত থাকবে?

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!