ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

menu

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে কাটেনি ধোঁয়াশা, সামনে হাসিনা ইস্যুর কূটনৈতিক জট

দৈনিক আজ ও আগামীকাল ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ২০, ২০২৬, ১০:০৩ এএম

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে কাটেনি ধোঁয়াশা, সামনে হাসিনা ইস্যুর কূটনৈতিক জট

ছবিঃ সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরেই কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছিল। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাব্য সময়, আলোচ্যসূচি ও সফরের প্রস্তুতি নিয়েও প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা এগিয়েছিল। এমনকি চলতি আগস্টের শেষ দিকে সফরটি হতে পারে—এমন সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। তবে দিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক তৎপরতা এবং গত ৫ আগস্ট তার সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে সেই প্রক্রিয়ায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ঢাকার পক্ষ থেকে এ ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। ফলে সম্ভাব্য ভারত সফরের সময়সূচি ও এজেন্ডা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

কূটনৈতিক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা-দিল্লির মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে নতুন ঘোষণা আসতে পারে বলে কূটনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।

১৭ বছরের দূরত্ব ঘুচিয়ে নতুন সম্পর্কের বার্তা

দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও বিএনপির সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে ততটা উষ্ণ ছিল না। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও জটিল পর্যায়ে যায়।

এরপর ২০২৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানায় ভারত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও এ আমন্ত্রণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

ফলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর নয়; দুই দেশের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দূরত্ব কমিয়ে সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে দাঁড় করানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

দুটি আমন্ত্রণ, একটি সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা

তারেক রহমানের ভারত সফরকে ঘিরে বর্তমানে দুটি পৃথক আমন্ত্রণ রয়েছে। প্রথমটি দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণ। দ্বিতীয়টি আগামী সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ।

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হবে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলন। বাংলাদেশ ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য নয়। তবে বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশকে ব্রিকসের আউটরিচ অধিবেশনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। গত ১৪ জুলাই ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণপত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরে ২৩ জুলাই তা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হয় বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

তবে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় ভারত সফর নিয়ে তার কাছে নতুন কোনো আপডেট নেই।

ফলে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের সম্ভাবনা থাকলেও এর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সফর যুক্ত হবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। হাসিনার প্রত্যর্পণ হয়ে উঠছে বড় ইস্যু

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ইতোমধ্যে ভারতকে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। ভারত জানিয়েছে, প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি তারা পর্যালোচনা করছে।

এর মধ্যেই গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি করে। ঢাকার অভিযোগ, ভারতে অবস্থান করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তার বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করছে না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও স্পষ্ট করেছে—প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য একটি ‘উপযুক্ত পরিবেশ’ তৈরি করা প্রয়োজন। শুধু হাসিনা নয়, আলোচনায় হাদি হত্যা মামলাও

তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের আলোচনায় শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসছে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদির হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত পাঠানোর বিষয়টি।

ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতের কাছে ওই মামলার সন্দেহভাজন আসামিদের হস্তান্তরের অনুরোধ করা হয়েছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

ফলে সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে প্রত্যর্পণ ইস্যু রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পানি, বিদ্যুৎ, সীমান্ত ও বাণিজ্যও আলোচনায়

প্রত্যর্পণ ইস্যুর বাইরে দীর্ঘদিনের দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলোও সফরের সম্ভাব্য এজেন্ডায় রয়েছে।

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

আন্তসীমান্ত নদীর পানিবণ্টন
নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানিতে ভারতের সহযোগিতা
সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সীমান্ত হত্যা
বাণিজ্য ভারসাম্য
ট্রানজিট ও যোগাযোগ
জ্বালানি সহযোগিতা
আঞ্চলিক নিরাপত্তা
দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি

বিশেষ করে পানিবণ্টনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিদ্যমান একটি চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। ফলে নতুন করে চুক্তি নবায়ন বা সংশোধনের বিষয়ে আলোচনায় অগ্রগতি আনার চেষ্টা চলছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রত্যর্পণের পাশাপাশি পানিবণ্টন চুক্তিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।

দিল্লির বার্তা—দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক দরকার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দিল্লির আগ্রহও স্পষ্ট হয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী একাধিকবার বলেছেন, দুই দেশের মধ্যে এমন কোনো সমস্যা নেই যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।

গত ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ভারতীয় হাইকমিশনার। সাক্ষাতের পর তিনি দিল্লি যান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বৈঠকের বিষয়ে অবহিত করেন।

পরদিনের আলোচনার প্রসঙ্গ তুলে ধরে দীনেশ ত্রিবেদী মঙ্গলবার বলেন, নরেন্দ্র মোদি দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি আরও জানান, তারেক রহমান ভারত সফরে গেলে তাকে সম্মানজনক অভ্যর্থনা দেওয়া হবে এবং সফরটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে—এমন আশ্বাস দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

দিল্লির এই বার্তাকে কূটনৈতিক মহল থেকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চীনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ

ঢাকা-দিল্লির নতুন সমীকরণের পেছনে শুধু দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ, ট্রানজিট এবং বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের গুরুত্ব অনেক।

একই সময়ে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কও নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফলে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দিল্লি যেমন নিজের কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনায় রাখছে, তেমনি ঢাকা নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিকে গুরুত্ব দিতে চাইছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত ‘ব্যালেন্স ফার্স্ট’ নীতির মধ্যেই এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে পারস্পরিক স্বার্থ ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় ঢাকা।

সফর হলে কী বার্তা যাবে?

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের ভারত সফর হলে এটি দুই দেশের সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। বিএনপির সঙ্গে ভারতের অতীত দূরত্বের জায়গায় বাস্তব স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে ভারতের জন্যও ঢাকার সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে পাশ কাটিয়ে ভারতের পক্ষে এগিয়ে যাওয়া কঠিন।

তবে সফরের আগে শেখ হাসিনাকে ঘিরে সৃষ্ট অস্বস্তি কতটা দূর হয়, সেটিই এখন বড় পরীক্ষা।

শেষ পর্যন্ত কোন পথে ঢাকা-দিল্লি?

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর এখনো বাতিল হয়নি, আবার চূড়ান্তও হয়নি। দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছে। ভারত সফরটি আগস্টের শেষ দিকে হবে কি না, নাকি সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হবে—তা নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ঢাকা যেমন শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ নিজেদের অগ্রাধিকারগুলো সামনে রাখতে চাইছে, দিল্লিও সম্পর্ককে দ্রুত স্বাভাবিক পর্যায়ে নিতে আগ্রহী।

ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর শেষ পর্যন্ত শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর হবে না; এটি হবে শেখ হাসিনা-পরবর্তী ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন সমীকরণ কতটা বাস্তবভিত্তিক ও পারস্পরিক স্বার্থনির্ভর হবে—তার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!