সরকারি কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নতুন জাতীয় বেতন স্কেল বা পে স্কেল নিয়ে অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের ১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো জারি হয়নি প্রজ্ঞাপন। ফলে নতুন বেতন কাঠামো কবে থেকে কার্যকর হবে এবং প্রজ্ঞাপন জারিতে কেন সময় লাগছে—তা নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর নতুন পে স্কেলের বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই ও সমন্বয়ের কাজ চলছে। এসব প্রক্রিয়া শেষ হলে প্রজ্ঞাপনের খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। ভেটিং সম্পন্ন হওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
অনুমোদনের পরও কেন প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি
গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নতুন পে স্কেল অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর দ্রুতই প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে। কিন্তু অনুমোদনের ১৫ দিন পার হলেও এখনো প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়ায় অপেক্ষা বাড়ছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের খুঁটিনাটি বিষয় নির্ধারণে কাজ চলছে। মন্ত্রিসভা মূলত বিভিন্ন গ্রেডে বেতন-ভাতা কতটা বাড়বে, সে বিষয়ে অনুমোদন দিয়েছে। এখন কোন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রে কীভাবে নতুন কাঠামো কার্যকর হবে, তার বিস্তারিত নির্দেশনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
খসড়া প্রজ্ঞাপনে বেতন নির্ধারণ, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা, বাস্তবায়ন পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ও আইনি বিষয়গুলো স্পষ্ট করা হবে। এসব বিষয়ে সমন্বয় ও যাচাই শেষে প্রস্তাবটি আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে।
পাঁচ ধরনের আলাদা নির্দেশনা
জানা গেছে, সরকারি কর্মচারীদের বিভিন্ন শ্রেণি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পাঁচটি আলাদা বিশেষ আদেশ বা এসআরও জারি করা হতে পারে। কারণ শুধু জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়, প্রতিরক্ষা বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়েও পৃথক নির্দেশনা প্রয়োজন হবে।
এসব বিষয় সমন্বয় ও তদারকির দায়িত্বে রয়েছে উচ্চপর্যায়ের সচিব কমিটি। ফলে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারির আগে বিভিন্ন দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বাস্তবায়ন কাঠামো নির্ধারণে সময় লাগছে।
বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্নের সুযোগ নেই: অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে। ফলে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই বলেও তিনি জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, পে স্কেল নিয়ে একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। প্রথমে সচিব কমিটি সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে সুপারিশ করেছে। পরে মন্ত্রিসভা তা অনুমোদন দিয়েছে। এখন দ্রুত সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হবে।
সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা
চলমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখেই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামো ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোন পদে কীভাবে বেতন নির্ধারণ হবে, বিদ্যমান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন কাঠামোয় কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে—এসব বিষয় প্রজ্ঞাপনে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকবে।
২০১৫ সালের পে স্কেলেও দীর্ঘ সময় লেগেছিল
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। ওই সময় মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের প্রায় সাড়ে তিন মাস পর বাস্তবায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়।
এর আগে বেতন কাঠামোর বিভিন্ন বিষয়, আইনগত দিক এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল। সে তুলনায় এবার মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর ১৫ দিন পার হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রজ্ঞাপন জারির আগে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতেই বর্তমান সময় লাগছে।
খসড়া প্রজ্ঞাপনে আইনি বিষয় যাচাইয়ের তাগিদ
দীর্ঘদিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করা সাবেক সচিব এ কে এস এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, প্রজ্ঞাপনের খসড়ায় ব্যবহৃত শব্দ, বাক্য এবং আইনি পরিভাষা যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি পে স্কেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংবিধিবদ্ধ আদেশও পর্যালোচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, যে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারবে না, তাদের উচিত নয় পরবর্তী সরকারের জন্য সেই সিদ্ধান্ত রেখে যাওয়া। তবে পে কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন করতেই হবে। সরকার যদি দুই বা তিন বছরে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়ন করতে চায়, তাহলে সরকারি কর্মচারীদেরও সেই সময় দেওয়া উচিত। কারণ এর কোনো বিকল্প নেই।
‘ওয়ান র্যাংক, ওয়ান পেনশন’ নিয়েও প্রত্যাশা
নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য ‘ওয়ান র্যাংক, ওয়ান পেনশন’ পদ্ধতি চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি সরকার। তবে ২০১৯ সালের আগে অবসর নেওয়া বেসামরিক কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় এই ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
ফলে নতুন পে স্কেলের পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত ‘ওয়ান র্যাংক, ওয়ান পেনশন’ ব্যবস্থা নিয়েও সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে।
প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষায় লাখো সরকারি কর্মচারী
নতুন পে স্কেল অনুমোদনের পর এখন সরকারি কর্মচারীদের মূল আগ্রহ প্রজ্ঞাপন কবে জারি হবে এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে—তা নিয়ে। অর্থ বিভাগের খসড়া প্রজ্ঞাপন প্রস্তুত, আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং পরবর্তী সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারির মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়া শেষ হবে।
সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই দ্রুত শেষ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা তারা পাবেন।

