ঢাকা মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

ঢাকায় মাসে গড়ে ৫০ বেওয়ারিশ লাশ, ৮ মাসে দাফন-সৎকার ৪০০

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬, ১০:৪৩ এএম

ঢাকায় মাসে গড়ে ৫০ বেওয়ারিশ লাশ, ৮ মাসে দাফন-সৎকার ৪০০

ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে প্রায় প্রতিদিনই উদ্ধার হচ্ছে অজ্ঞাতনামা মরদেহ। সড়ক, রেললাইন, ফুটপাত, পার্ক, নদী, খাল ও ঝিলসহ নানা স্থান থেকে এসব মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পরিচয় শনাক্ত হলে স্বজনেরা মর্গ থেকে মরদেহ নিয়ে যান। কিন্তু দীর্ঘ চেষ্টা ও প্রযুক্তির ব্যবহারেও যেসব মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না, সেগুলোই শেষ পর্যন্ত থেকে যায় ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে।

আইনি প্রক্রিয়া শেষে এসব মরদেহ দাফন ও সৎকারের জন্য হস্তান্তর করা হয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে। সংস্থাটির তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র আট মাসে ঢাকায় ৪০০ বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও সৎকার করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৫০টি করে মরদেহের শেষ ঠিকানা হয়েছে কবরস্থান কিংবা শ্মশানঘাট।

আট মাসে ৪০০ বেওয়ারিশ মরদেহ

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে মোট ৪০০টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও সৎকার করা হয়েছে।

মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ৩০টি, ফেব্রুয়ারিতে ৫৯টি, মার্চে ৫২টি, এপ্রিলে ৪৬টি, মে মাসে ৫৬টি, জুনে ৬৭টি, জুলাইয়ে ৪২টি এবং আগস্টে ৪৮টি মরদেহ দাফন ও সৎকার করা হয়।

এর মধ্যে ৭৪টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে জুরাইন কবরস্থানে। সবচেয়ে বেশি ৩২৫টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে। অন্য একটি মরদেহ সৎকার করা হয়েছে পোস্তগোলা শ্মশানঘাটে।

এর আগে ২০২৪ সালে ৫৭০টি এবং ২০২৫ সালে ৬৪৩টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও সৎকার করেছিল আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও বেওয়ারিশ মরদেহের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য বলে সংস্থাটির তথ্য থেকে উঠে আসে।

প্রতিদিনই মিলছে অজ্ঞাত মরদেহ

ডিএমপি সূত্র জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। এসব মরদেহের মধ্যে নারী-পুরুষ উভয়ই রয়েছেন এবং বয়সেও রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য।

তবে অজ্ঞাতনামা হিসেবে উদ্ধার হওয়া প্রত্যেকেই হত্যাকাণ্ডের শিকার—বিষয়টি এমন নয়। সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে মৃত্যু কিংবা অসুস্থতার কারণেও অনেকের মৃত্যু হয়। তাঁদের বড় একটি অংশ ভবঘুরে, মানসিক ভারসাম্যহীন, গৃহহীন অথবা দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা মানুষ।

অনেকের জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধনের তথ্য না থাকায় পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। স্বজনদেরও খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে এসব মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন বা সৎকারের জন্য হস্তান্তর করা হয়।

প্রযুক্তির যুগেও পরিচয় শনাক্তে জটিলতা

অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করতে পুলিশ প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রচলিত পদ্ধতিও ব্যবহার করে। তবে মরদেহ অর্ধগলিত বা বিকৃত হয়ে গেলে আঙুলের ছাপসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়। এতে পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দেওয়া ৪০০ মরদেহের পরিসংখ্যানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তিনি বলেছেন, এত বেশি সংখ্যক মরদেহ বেওয়ারিশ হওয়ার কথা নয় এবং এ বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত জানা নেই।

তিনি জানান, যেসব মরদেহ প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না, সেগুলো ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে শনাক্তের চেষ্টা করা হয়। অর্ধগলিত মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ডিএনএ সংরক্ষণ করা হয়। তবে মর্গে দীর্ঘদিন মরদেহ রাখার সুযোগ সীমিত থাকায় পরে সেগুলো দাফন করতে হয়।

এক দিনে পাঁচ অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার

রাজধানীতে গতকাল সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত এক নারীসহ অজ্ঞাতনামা পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শাহবাগ, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী ও কামরাঙ্গীরচর থানা এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে ভবঘুরে প্রকৃতির এসব মানুষের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

পরিচয় শনাক্ত না হলে আইনি প্রক্রিয়া শেষে এসব মরদেহও বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আদাবরে ছয় টুকরা মরদেহ, পরিচয় মেলেনি

সম্প্রতি রাজধানীর আদাবর ১০ নম্বর সড়কের শেষ মাথায় একটি খাল থেকে ব্যাগ ও বস্তায় থাকা এক তরুণীর ছয় টুকরা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহগুলো ছিল অর্ধগলিত। প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েও গতকাল পর্যন্ত তাঁর পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

পুলিশের ধারণা, অর্ধগলিত হয়ে যাওয়ায় আঙুলের ছাপ নষ্ট হয়ে যাওয়া পরিচয় শনাক্তের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মরদেহের টুকরাগুলো ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, ওই তরুণীর পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেছে।

ভবঘুরে দুই ব্যক্তির মরদেহও শনাক্ত হয়নি

শাহবাগ থানাধীন জাতীয় ঈদগাহের প্রধান ফটকের সামনের ফুটপাত এবং কদম ফোয়ারা মোড় থেকে শনিবার উদ্ধার করা দুই পুরুষের মরদেহেরও পরিচয় শনাক্ত হয়নি। তাঁদের বয়স আনুমানিক ৬৫ ও ৪৫ বছর।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, ওই দুজন ভবঘুরে প্রকৃতির ছিলেন। অসুস্থতার কারণে তাঁদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগে গত ১২ জুলাই শাহবাগ এলাকার পৃথক দুটি স্থান থেকে অজ্ঞাতপরিচয় তিন ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছিল পুলিশ। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় তাঁদের মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম।

পুলিশের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া দাফন নয়

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফনসেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ বলেন, পুলিশের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কোনো মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় না। সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের পর পুলিশ কোনো মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে সংস্থাটির কাছে হস্তান্তর করলে তারা সেটি দাফন বা সৎকারের ব্যবস্থা করে।

পুলিশ ও আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য অনুযায়ী, পরিচয় শনাক্তের জন্য মরদেহ সংরক্ষণের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। তবে মর্গে দীর্ঘদিন মরদেহ সংরক্ষণের সুযোগ সীমিত হওয়ায় একটি পর্যায়ে সেগুলো দাফনের প্রয়োজন হয়।

হত্যাকাণ্ডের শিকারদের পরিচয় শনাক্তে জোর দেওয়ার দাবি

মানবাধিকার ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এমএসএফের মতে, ২০২৫ সালে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহগুলোর অধিকাংশের পরিচয় অজ্ঞাতই থেকে গেছে। সংস্থাটি বলেছে, শুধু মরদেহ উদ্ধার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটনের দাবি, ঢাকায় বেওয়ারিশ লাশের একটি বড় অংশ হত্যাকাণ্ডের শিকার। এসব হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্‌ঘাটন ও বিচার হওয়ার হারও কম বলে তিনি মনে করেন। তাঁর মতে, হত্যার পর মরদেহ গুম করে অপরাধীরা যাতে পার না পায়, সে বিষয়ে রাষ্ট্রকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

পরিচয়হীন মরদেহের সংখ্যা উদ্বেগের

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নতুন নয়। তবে একের পর এক মরদেহের পরিচয় শনাক্ত না হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সেগুলোর বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন বা সৎকার হওয়া মানবিক ও আইনশৃঙ্খলা—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিশেষ করে হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করতে প্রযুক্তি, ডিএনএ সংরক্ষণ, নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্যভান্ডার এবং তদন্ত কার্যক্রমের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে। অন্যদিকে ভবঘুরে, গৃহহীন ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের ক্ষেত্রেও মৃত্যুর পর তাঁদের পরিচয় শনাক্তের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

কারণ একটি অজ্ঞাত মরদেহের পেছনে শুধু একটি মামলা নয়, অনেক সময় অপেক্ষমাণ থাকে একটি পরিবার, একজন স্বজন কিংবা নিখোঁজ হয়ে যাওয়া কোনো মানুষের পরিচয়ের সন্ধান। সেই পরিচয় নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মরদেহটি বেওয়ারিশ হলেও ঘটনাটি সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে অমীমাংসিতই থেকে যায়।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!