ঢাকা মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

দুর্নীতিগ্রস্ত বীমা কোম্পানির সম্পদ বেচে হলেও গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া হবে: অর্থমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬, ১০:১৬ এএম

দুর্নীতিগ্রস্ত বীমা কোম্পানির সম্পদ বেচে হলেও গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়া হবে: অর্থমন্ত্রী

ছবিঃ সংগৃহীত

ব্যাংকিং খাতের মতো দেশের বীমা খাতেও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক অব্যবস্থাপনা চলেছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, বীমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকের পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি করে হলেও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা মেনে নেওয়া হবে না। বীমা খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

সোমবার বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন। আইডিআরএ ভবন উদ্বোধনের দীর্ঘ ১৬ বছর পর এই প্রথম কোনো অর্থমন্ত্রী সেখানে গিয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করলেন।

বীমা খাতে ভয়াবহ চিত্র, ৫৭ শতাংশ দাবি অনাদায়ী

মতবিনিময় সভায় অর্থমন্ত্রী বীমা খাতের বর্তমান পরিস্থিতির একটি চিত্র তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে বীমা গ্রাহকদের প্রায় ৫৭ শতাংশ দাবি অনাদায়ী রয়েছে। অর্থাৎ মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও বিপুলসংখ্যক গ্রাহক তাদের প্রাপ্য অর্থ পাচ্ছেন না।

অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকির সুযোগ নিয়ে কিছু বীমা কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের সুযোগ নিয়েছে। এর ফলে গ্রাহকদের মধ্যে বীমা খাতের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে এবং মেয়াদ পূর্তির পরও অনেক মানুষকে নিজেদের পাওনা টাকার জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের কষ্টের টাকা ফেরত দিতে সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করা হচ্ছে।

গ্রাহকের অর্থ অন্যত্র বিনিয়োগ বা পাচারের অভিযোগ

অর্থমন্ত্রী অভিযোগ করেন, কিছু বীমা কোম্পানি গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংরক্ষণ না করে তা ইচ্ছামতো অন্য খাতে বিনিয়োগ বা পাচার করেছে।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেদের অনিয়ম ও জালিয়াতি আড়াল করতে দুটি পৃথক সফটওয়্যার ব্যবহারের মতো প্রতারণামূলক পদ্ধতিও অনুসরণ করেছে।

তার বক্তব্যে উঠে আসে, এ ধরনের অনিয়মের কারণে শুধু গ্রাহকরাই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন না, পুরো বীমা খাতের ওপর মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

৮২ কোম্পানির মধ্যে ৩৬ জীবন বীমা, সংকটে অন্তত ১০টি

দেশে বর্তমানে ৮২টি বীমা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে ৩৬টি জীবন বীমা কোম্পানি। অর্থমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব জীবন বীমা কোম্পানির অন্তত ১০টির আর্থিক অবস্থা চরম সংকটাপন্ন।

দুর্বল কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়ন, গ্রাহকের দাবি পরিশোধের সক্ষমতা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সরকারের লক্ষ্য হলো দুর্বল ও অনিয়মে জর্জরিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে বীমা খাতকে একটি কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।

নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা

গ্রাহকদের ভোগান্তি কমাতে বীমা কোম্পানিগুলোকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দাবি পরিশোধের বাধ্যবাধকতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো কোম্পানি গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করতে না পারলে প্রয়োজনে ওই কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ করা হবে।

তার মতে, গ্রাহকের অর্থ ফেরত নিশ্চিত করা গেলে বীমা খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

কিছু কোম্পানির সম্পদ বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু

আইডিআরএ ইতোমধ্যে কিছু বীমা কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

এর মাধ্যমে আর্থিকভাবে দুর্বল কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে গ্রাহকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে দাবি পরিশোধে ব্যর্থ, তাদের বিষয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথও উন্মুক্ত করা হচ্ছে।

ব্যাংকিং খাতের আদলে আসছে ‘বীমা রেজল্যুশন’

বীমা খাতে বড় ধরনের সংস্কারের অংশ হিসেবে ব্যাংকিং খাতের আদলে ‘বীমা রেজল্যুশন’ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

এর আওতায় আর্থিকভাবে দুর্বল বীমা প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে, প্রয়োজনে কীভাবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা করা হবে এবং গ্রাহকদের স্বার্থ কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে—এসব বিষয়ে একটি কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।

এ ছাড়া বিদ্যমান বীমা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সব বীমা কোম্পানিকে অটোমেশনের আওতায় আনা হবে

দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়ম কমাতে দেশের প্রতিটি বীমা কোম্পানিকে সম্পূর্ণ অটোমেশন ও অনলাইন লেনদেনের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে।

অর্থমন্ত্রীর মতে, ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হলে লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়বে, তথ্য গোপন বা পরিবর্তনের সুযোগ কমবে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষে কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে।

বিশেষ করে একাধিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে তথ্য গোপন বা আর্থিক অনিয়মের সুযোগ বন্ধ করতে সমন্বিত ও স্বচ্ছ ডিজিটাল ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

আইডিআরএতে দক্ষ জনবল নিয়োগের উদ্যোগ

বীমা খাতের তদারকি আরও কার্যকর করতে আইডিআরএর নিজস্ব দক্ষ জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

দক্ষ ও পর্যাপ্ত জনবল থাকলে বীমা কোম্পানিগুলোর আর্থিক অবস্থা, বিনিয়োগ, গ্রাহকের দাবি, সম্পদ ও দায়সহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সরকারের এসব উদ্যোগের মাধ্যমে একদিকে দুর্বল বীমা কোম্পানিগুলোকে পুনর্গঠন এবং অন্যদিকে অনিয়ম ও জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পথ তৈরি হবে।

গ্রাহকের আস্থা ফেরানোই বড় চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদ শেষে বীমার টাকা না পাওয়া, দাবি নিষ্পত্তিতে বিলম্ব এবং কোম্পানির আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে সাধারণ গ্রাহকদের একটি অংশ বীমা খাতের ওপর আস্থা হারিয়েছেন। ফলে সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্রাহকের পাওনা দ্রুত পরিশোধের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

অর্থমন্ত্রীর কঠোর বার্তা এবং আইডিআরএর সংস্কারমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুর্বল বীমা কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি বাড়বে এবং গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সরকারের ঘোষিত সংস্কার কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হিসেবে উঠে আসছে গ্রাহকের অর্থের নিরাপত্তা, দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি, কোম্পানির জবাবদিহি এবং বীমা খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!