পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ড্রেজার মেশিন জব্দের ঘটনায় মৃত ব্যক্তি ও নিরপরাধ স্থানীয়দের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার অভিযোগ তুলে মহাসড়ক অবরোধ করেছেন বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে তেঁতুলিয়া-পঞ্চগড় জাতীয় মহাসড়কের ভজনপুর বাজার এলাকায় এ অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হয়।
অবরোধের কারণে মহাসড়কে প্রায় দুই ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে ভজনপুর বাজার ও আশপাশের এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
পরে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম আকাশ মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে আশ্বাস দিলে স্থানীয়রা অবরোধ তুলে নেন।
অভিযানে তিন ড্রেজার মেশিন জব্দ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকেলে তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের পোহাতুগছ এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ অভিযান পরিচালনা করা হয়।
তেঁতুলিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম আকাশের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে তেঁতুলিয়া মডেল থানার পুলিশের একটি দল অংশ নেয়। অভিযানকালে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত তিনটি ড্রেজার মেশিন জব্দ করা হয়।
পরে জব্দ করা মেশিনগুলো থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় ওই রাতেই ভজনপুর ইউনিয়নের তহশীলদার মানিক চন্দ্র বর্মন বাদী হয়ে ২২ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা করেন।
‘জড়িতদের বাদ দিয়ে মৃত ও নিরপরাধদের আসামি করা হয়েছে’
মামলা দায়েরের পর স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তাদের অভিযোগ, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে প্রকৃতপক্ষে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথভাবে ব্যবস্থা না নিয়ে স্থানীয় নিরপরাধ মানুষ এবং এমনকি মৃত ব্যক্তিদের নামেও মামলা দেওয়া হয়েছে।
এ অভিযোগের প্রতিবাদে বুধবার দুপুরে এলাকাবাসী ভজনপুর বাজারে তেঁতুলিয়া-পঞ্চগড় জাতীয় মহাসড়ক অবরোধ করেন।
অবরোধকারীরা বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি কিংবা মৃত ব্যক্তির নাম যদি মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ ছিল যান চলাচল
স্থানীয়দের সড়ক অবরোধের কারণে তেঁতুলিয়া-পঞ্চগড় জাতীয় মহাসড়কের ভজনপুর বাজার অংশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মহাসড়কের দুই পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।
অবরোধের কারণে সাধারণ যাত্রী, পরিবহন শ্রমিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও দুর্ভোগে পড়তে হয়। পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলা হয়।
উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এস এম আকাশ মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে আশ্বাস দিলে স্থানীয়রা অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন। এরপর ধীরে ধীরে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
‘অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা চাই’
অবরোধে অংশ নেওয়া স্থানীয়রা বলেন, তারা অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের পক্ষে নন। বরং যারা সরকারি নিয়ম অমান্য করে বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে প্রকৃত অপরাধীদের পরিবর্তে নিরপরাধ ব্যক্তি বা মৃত ব্যক্তিদের মামলায় আসামি করা হলে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। তাই মামলায় কারা কীভাবে আসামি হয়েছেন, তা তদন্ত করে প্রকৃত জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
স্থানীয়দের আরও দাবি, ভবিষ্যতে বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের অভিযান নিয়মিত করতে হবে এবং নদী, আবাদি জমি ও পরিবেশের ক্ষতি হয়—এমন অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
পুলিশের বক্তব্য: মামলা আদালতের বিষয়
তেঁতুলিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) লাইছুর রহমান বলেন, ড্রেজার মেশিন জব্দের ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।
তিনি বলেন, থানায় মামলা হওয়ার পর পুলিশ পর্যায় থেকে তা প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারভুক্ত।
মামলায় মৃত বা নিরপরাধ ব্যক্তিদের নাম থাকার অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
‘কাগজপত্র দেখে বিস্তারিত বলা যাবে’
তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আনোয়ার হোসাইন বলেন, মহাসড়ক অবরোধের খবর পেয়ে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ঘটনাস্থলে গিয়েছেন।
মৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, মামলার কাগজপত্র দেখে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে।
তদন্তের দাবিতে স্থানীয়রা
অবৈধ ড্রেজার মেশিন জব্দের ঘটনায় প্রশাসনের অভিযানকে স্বাগত জানালেও মামলায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, মামলা করার আগে প্রত্যেক আসামির সংশ্লিষ্টতা যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের অভিযোগ কতটা সত্য, মামলায় আসামিদের নাম কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে তারা অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে আদৌ জড়িত কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে।
এদিকে প্রশাসনের অভিযানে জব্দ করা তিনটি ড্রেজার মেশিন থানায় রয়েছে। মামলা ও পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম আদালতের মাধ্যমে এগোবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

