ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

দুই মাস পর শিল্পে গ্যাসের চাপ বাড়ল, স্বস্তি ফিরলেও কাটেনি শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ১০:৩৩ এএম

দুই মাস পর শিল্পে গ্যাসের চাপ বাড়ল, স্বস্তি ফিরলেও কাটেনি শঙ্কা

ছবিঃ সংগৃহীত

প্রায় দুই মাসের তীব্র সংকটের পর দেশের শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বিশেষ করে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে আগের তুলনায় গ্যাসের চাপ বেড়েছে। কোথাও কোথাও সরবরাহ প্রায় স্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়েছে।

গ্যাসের চাপ বাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে কম সক্ষমতায় চলা অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন কার্যক্রমে কিছুটা গতি ফিরতে শুরু করেছে। তবে শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক উন্নতিকে এখনই গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সব শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ সমানভাবে বাড়েনি। কোনো কোনো এলাকায় পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এখনও অনেক কারখানায় প্রয়োজনের তুলনায় গ্যাসের চাপ কম রয়েছে।

ফলে দুই মাসের অচলাবস্থার পর বুধবারের সরবরাহ বৃদ্ধি শিল্প খাতে তাৎক্ষণিক স্বস্তি এনে দিলেও, নিরবচ্ছিন্ন ও পূর্বানুমানযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

গাজীপুরে গ্যাস সরবরাহ ২৬০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলগুলোতে বুধবার গ্যাসের চাপ ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতির খবর পাওয়া গেছে। এতে জেলার বিভিন্ন শিল্পকারখানায় উৎপাদন পরিস্থিতিতে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন পরিস্থিতি জানতে বুধবার গাজীপুরের কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ কেন্দ্র পরিদর্শন করেন জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূঁইয়া। তিনি স্প্যারো ফ্যাশন, ডিবিএল গার্মেন্টস, পল্লী বিদ্যুতের জয়দেবপুর গ্রিড এবং তিতাসের আঞ্চলিক বিপণন কেন্দ্র পরিদর্শন করেন।

এ সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে তিনি গ্যাসের চাপ, বিদ্যুৎ সরবরাহ, লোডশেডিং এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন পরিস্থিতির খোঁজ নেন।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরের শিল্পকারখানায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট। তীব্র সংকটের সময়ে সেখানে সরবরাহ নেমে এসেছিল প্রায় ২৬০ মিলিয়ন ঘনফুটে। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট হয়েছে।

অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় এখনও প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে। তবে সংকটের সবচেয়ে খারাপ সময়ের তুলনায় সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ কারণেই অনেক কারখানায় উৎপাদন পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জেও বেড়েছে গ্যাসের চাপ

গাজীপুরের পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের চাপ আগের তুলনায় বেড়েছে বলে জানিয়েছেন শিল্প মালিকরা। তবে সেখানেও সব কারখানা ও এলাকায় পরিস্থিতি এক নয়।

কিছু এলাকায় গ্যাসের চাপ বাড়ায় কারখানাগুলো প্রায় স্বাভাবিক সক্ষমতায় উৎপাদনে ফিরতে পারছে। আবার কোনো কোনো এলাকায় এখনও প্রয়োজনের তুলনায় চাপ কম থাকায় উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, প্রায় দুই মাস পর কারখানাগুলোতে আগের তুলনায় গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে সব অঞ্চলে একইভাবে সরবরাহ বাড়েনি। দীর্ঘদিন পর সরবরাহ বৃদ্ধিতে শিল্প উদ্যোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান উন্নতি ইতিবাচক হলেও শিল্প খাতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—এই সরবরাহ বৃদ্ধি কতটা স্থায়ী হবে এবং দেশের সব শিল্পাঞ্চলে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাসের চাপ নিশ্চিত করা যাবে কি না।

‘দুই মাসের অচলাবস্থা অনেকটা কেটেছে’

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বুধবার সকাল থেকেই গ্যাস সরবরাহ অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে। সংকট পুরোপুরি কেটে গেছে বলা না গেলেও গত দুই মাস ধরে চলা অচলাবস্থা অনেকটা কেটেছে।

তার মতে, এতে শিল্প উদ্যোক্তারা তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে হঠাৎ করে এ ধরনের জ্বালানি সংকট তৈরি হলে শিল্পকারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

তিনি বলেন, শুধু বর্তমান সংকট সামাল দিলেই হবে না; ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

মহিউদ্দিন রুবেলের ভাষ্য, শিল্পকারখানা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে গ্যাস সরবরাহের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। কারণ জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত হলে শুধু এক দিনের উৎপাদন ব্যাহত হয় না; এর প্রভাব পড়ে উৎপাদন খরচ, শ্রমঘণ্টা, রফতানি, ক্রেতার আস্থা এবং নতুন বিনিয়োগের ওপরও।

মহেশখালীর টার্মিনালের ঘটনায় শুরু তীব্র সংকট

গত ২১ জুলাই মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি ও অগ্নিকাণ্ডের পর দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়। এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে শিল্পাঞ্চলগুলোতে।

গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, নরসিংদী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন শিল্পকারখানা দীর্ঘ সময় ধরে কম গ্যাসের চাপ ও বিদ্যুৎ সংকটে ভুগেছে। এতে গ্যাসনির্ভর নিটিং, ডাইং, টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন স্বাভাবিক সক্ষমতার এক-তৃতীয়াংশে নেমে আসে, আবার কোথাও উৎপাদন অর্ধেকের কাছাকাছি কমে যায়।

বিকেএমইএর তথ্যেও উৎপাদন বিপর্যয়ের চিত্র

বিকেএমইএর সক্রিয় সদস্য কারখানার প্রায় ২০ শতাংশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি একটি সারসংক্ষেপে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাবের চিত্র উঠে এসেছে।

সেখানে দেখা যায়, অংশ নেওয়া কারখানাগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ বিদ্যুৎ সংকটে এবং ৭৫ শতাংশ গ্যাস সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা জানিয়েছে।

যেসব কারখানা গ্যাসের চাপের তথ্য দিয়েছে, তাদের হিসাবে স্বাভাবিক চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহে গড়ে প্রায় ৭৮ শতাংশ ঘাটতি ছিল। একই সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময়ও আগের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেড়েছিল।

এর সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদনে। ওই জরিপ অনুযায়ী, নিটিং উৎপাদন গড়ে প্রায় ৩৮ শতাংশ, তৈরি পোশাক প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ডাইং উৎপাদন প্রায় ৫১ শতাংশ কমেছে।

বাড়তি খরচ, শ্রমঘণ্টা নষ্ট ও শিপমেন্টে বিলম্ব

জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। গ্যাসের ঘাটতি পূরণে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে গিয়ে কারখানাগুলোর ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন সময় নষ্ট হওয়ায় শ্রমঘণ্টার অপচয় এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহে বিলম্বের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

জরিপে প্রায় ৯২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে অতিরিক্ত খরচের কথা জানিয়েছে। একই সংখ্যক প্রতিষ্ঠান শ্রমঘণ্টা নষ্ট হওয়ার কথা জানিয়েছে। প্রায় ৮৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান শিপমেন্ট বিলম্বের কথা জানিয়েছে।

অন্যদিকে প্রায় ৮৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকির কথা জানিয়েছে। প্রায় ৫৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের রফতানি আদেশ কমেছে অথবা বাতিল হয়েছে।

অর্থাৎ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব কারখানার উৎপাদন ইউনিটে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর প্রভাব পড়েছে শ্রম, ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থা ও রফতানি কার্যক্রমেও।

সংকট কমলেও দেশে গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, সংকটের আগে দেশে দৈনিক প্রায় ২৬০ থেকে ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। এর মধ্যে মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে আসত প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি।

সংকটের পর আগস্টে দেশের গড় গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে দৈনিক প্রায় ২২৩ কোটি ঘনফুটে। সাম্প্রতিক সময়ে দুটি টার্মিনাল থেকে এলএনজি সরবরাহ প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুটে ফিরে আসায় মোট সরবরাহও সংকটপূর্ব পর্যায়ের কাছাকাছি এসেছে।

তবে সংকটপূর্ব সরবরাহের কাছাকাছি ফিরে আসা মানেই দেশের সামগ্রিক গ্যাস সংকট শেষ হয়ে যাওয়া নয়। সরকারি হিসাবে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮৬ কোটি ঘনফুট।

সে হিসাবে দৈনিক প্রায় ২৬০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি সরবরাহ থাকলেও চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থেকে যায় প্রায় ১২৫ কোটি ঘনফুট।

শিল্প উদ্যোক্তাদের নজর এখন স্থায়ী সরবরাহে

দুই মাসের সংকটে উৎপাদন কমে যাওয়া, বাড়তি জ্বালানি ব্যয়, শ্রমঘণ্টা নষ্ট এবং শিপমেন্ট বিলম্বের যে ক্ষতি হয়েছে, তা একদিনে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এখন গ্যাসের চাপ বাড়ায় কারখানাগুলো আগের উৎপাদন সক্ষমতায় ফিরতে পারলেও তাদের সামনে রয়েছে জমে থাকা অর্ডার ও সরবরাহের চাপ সামলানোর চ্যালেঞ্জ।

বিশেষ করে রফতানিমুখী কারখানাগুলোর জন্য সময়মতো উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় উৎপাদন ব্যাহত হলে বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের চুক্তি ও শিপমেন্ট ব্যবস্থাপনাতেও চাপ তৈরি হয়।

এ কারণে শিল্প উদ্যোক্তারা বর্তমান সরবরাহ বৃদ্ধিকে স্বস্তির খবর হিসেবে দেখলেও এটিকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছেন না। তাদের প্রত্যাশা, শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাসের চাপ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য করা হবে।

এক দিনের স্বস্তি, সামনে বড় প্রশ্ন

দুই মাসের তীব্র সংকটের পর গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ বাড়ায় আপাতত উৎপাদন খাতে স্বস্তি ফিরেছে। কোথাও উৎপাদন প্রায় স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরলেও সর্বত্র পরিস্থিতি এক নয়।

তাই শিল্প খাতের সামনে এখন মূল প্রশ্ন হলো—এই বাড়তি গ্যাস সরবরাহ কতটা স্থায়ী হবে?

উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, শিল্পের উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রফতানি ও বিনিয়োগের স্বার্থে গ্যাস সরবরাহে সাময়িক উন্নতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদনের জন্য শুধু গ্যাস পাওয়া নয়, কখন এবং কতটা গ্যাস পাওয়া যাবে—সে বিষয়ে নিশ্চিত থাকা শিল্পকারখানার পরিকল্পনার জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!