র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন নতুন বিশেষায়িত ইউনিট ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) গঠন করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশের পর বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) থেকে নতুন নামে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে বাহিনীটি।
এসআরবির প্রধান আহসান হাবীব পলাশ বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন নামে কার্যক্রম শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘এসআরবি নামে গেজেট হয়েছে। আমরা র্যাবের নাম পরিবর্তন করে এসআরবি নাম দিয়ে আজ থেকে সব কার্যক্রম শুরু করেছি।’
এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুই দশক ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসা র্যাবের পরিবর্তে নতুন আইনি কাঠামো ও নামের একটি বিশেষায়িত ইউনিটের যাত্রা শুরু হলো।
নতুন নামে কার্যক্রম, অপরিবর্তিত লোগো
বুধবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের আমন্ত্রণপত্রে নতুন বাহিনীর লোগো ব্যবহার করা হয়। সেখানে র্যাবের পরিবর্তে ‘এসআরবি বাংলাদেশ’ লেখা রয়েছে। বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতেও নতুন নামের লোগো ব্যবহার করতে দেখা গেছে।
তবে নতুন নামে কার্যক্রম শুরু হলেও লোগোর মূল নকশায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। অর্থাৎ বাহিনীর পরিচিত লোগোর নকশা অপরিবর্তিত রেখে শুধু নামের অংশে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
কেন গঠন করা হলো এসআরবি
মঙ্গলবার প্রকাশিত গেজেটে নতুন ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তার কারণও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, দেশের জননিরাপত্তা রক্ষা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখতে পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য একটি আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বিশেষায়িত বাহিনীর ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও গেজেটে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে নতুন কাঠামোয় স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠনের জন্য আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
সংসদে বিল পাস, পরদিনই গেজেট
র্যাব বিলুপ্ত করে পুলিশের অধীনে এসআরবি গঠনের বিল গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয়। এরপর মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন বা গেজেট প্রকাশ করা হয়।
গেজেট প্রকাশের পরই নতুন ইউনিটটি আইনগত কাঠামো পায় এবং তার পরদিন, অর্থাৎ ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে এসআরবি নামে কার্যক্রম শুরু করে।
২০০৪ সালে গঠিত হয়েছিল র্যাব
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় গঠিত এই বাহিনীকে সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, মাদক, সংঘবদ্ধ অপরাধসহ গুরুতর অপরাধ দমনে বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে র্যাবের কার্যক্রম ও বিভিন্ন অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা
গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র র্যাব এবং বাহিনীটির সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর পর থেকে বাহিনীটির কাঠামো, কার্যক্রম, জবাবদিহিতা ও মানবাধিকারসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর সংস্কারের দাবি
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাঠামো ও কার্যক্রম সংস্কারের বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। ওই বছরের ১০ ডিসেম্বর বিএনপি গঠিত পুলিশ প্রশাসন সংস্কারবিষয়ক কমিটি র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানায়।
এর ধারাবাহিকতায় র্যাবের বিদ্যমান কাঠামো ও কর্মপরিধি পুনর্বিন্যাস করে নতুন নামে বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এসআরবির সামনে কী দায়িত্ব
নতুন আইন ও গেজেট অনুযায়ী, এসআরবির মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের জননিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশকে সহায়তা করা, সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখতে বিশেষায়িত সক্ষমতা কাজে লাগানো।
গেজেটে বিশেষভাবে স্বচ্ছতা, কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে নতুন নামে কার্যক্রম শুরুর পাশাপাশি বাহিনীটির ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে এসব কাঠামো কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
র্যাব থেকে এসআরবিতে রূপান্তরের ফলে বাহিনীর নাম ও আইনি কাঠামোয় পরিবর্তন এলেও নতুন ইউনিটের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, বিশেষায়িত অভিযান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এর ভূমিকা কী হবে এবং জবাবদিহিতার ব্যবস্থাগুলো বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে—এসব বিষয় সামনে রেখে এখন থেকে এসআরবির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে।

