নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে বাড়িতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রাখা প্লাস্টিকের ড্রাম থেকে ১৪ দিন বয়সী এক নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় শিশুটির মা ফাতেমা বেগমকে (১৯) পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে ফাতেমা তাঁর সন্তানকে ড্রামের পানিতে ফেলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
সোমবার (১৭ আগস্ট) রাত ১০টার দিকে উপজেলার মীরওয়ারিশপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মজুমদারহাট এলাকার একটি বাড়ি থেকে নবজাতকের মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
নিহত শিশুটি ওই এলাকার বাসিন্দা সৌরভ হোসেনের ছেলে। তাঁর মা ফাতেমা বেগম উপজেলার নরোত্তমপুর ইউনিয়নের শরীফ উল্যার মেয়ে।
জন্মের ১৪ দিনের মাথায় মর্মান্তিক পরিণতি
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের নভেম্বরে সৌরভ হোসেনের সঙ্গে ফাতেমা বেগমের বিয়ে হয়। এরপর গত ৪ আগস্ট তাঁদের ঘরে একটি ছেলেসন্তানের জন্ম হয়। জন্মের পর শিশুটিকে ঘিরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আনন্দের পরিবেশ ছিল।
তবে সোমবার সন্ধ্যার পর হঠাৎ শিশুটিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে শিশুটির বিষয়ে তার মায়ের কাছে জানতে চাইলে ফাতেমা একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
কখনো বললেন মাথায় আঘাত, কখনো ‘জিনে নিয়ে গেছে’
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে ফাতেমা দাবি করেন, কেউ শিশুটির মাথায় আঘাত করে তাকে নিয়ে গেছে। পরে তিনি বলেন, শিশুটিকে ‘জিন’ নিয়ে গেছে।
পরপর ভিন্ন বক্তব্য দেওয়ায় পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ হয়। এরপর তাঁরা বাড়ির আশপাশে শিশুটির খোঁজ শুরু করেন। একপর্যায়ে বাড়িতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রাখা একটি প্লাস্টিকের ড্রামের পানির মধ্যে নবজাতকের মরদেহ দেখতে পান তাঁরা।
ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। পরে বেগমগঞ্জ থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ড্রাম থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মাকে আটক
পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ফাতেমা বেগম তাঁর সন্তানকে ড্রামের পানিতে ফেলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। পুলিশের কাছে তাঁর দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুটি সারাদিন কান্নাকাটি করত এবং এতে তিনি ঘুমাতে পারতেন না। একপর্যায়ে তিনি শিশুটিকে ড্রামের পানিতে ফেলে দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ, শিশুটিকে কীভাবে ড্রামের পানিতে ফেলা হয়েছিল এবং এর পেছনে অন্য কোনো কারণ বা কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এলাকায় শোকের ছায়া
মাত্র ১৪ দিনের শিশুর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে মজুমদারহাট এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ বলেন, ‘মাত্র ১৪ দিনের একটি শিশুর এমন মৃত্যু মেনে নেওয়া খুবই কষ্টের। শিশুটিকে যখন ড্রামের পানিতে পাওয়া যায়, তখন পুরো এলাকায় শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আমরা চাই, ঘটনাটি সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করা হোক এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
ময়নাতদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া
বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামসুজ্জামান বলেন, ‘নবজাতককে পানিতে ফেলে হত্যার অভিযোগে তার মাকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তিনি জানান, নবজাতকের পরিবারের সদস্যদের লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। মরদেহের ময়নাতদন্তসহ প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের অন্যান্য তথ্য পর্যালোচনা করে শিশুটির মৃত্যুর বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

