নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ, অনিয়ম ও দালালনির্ভরতার অভিযোগ উঠেছে। সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত ফি দেওয়ার পরও অতিরিক্ত টাকা না দিলে নামজারি, খতিয়ানসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। অফিসকে ঘিরে পাঁচ থেকে সাতজনের একটি দালালচক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হলো, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহসিলদার) জয়নাল আবেদিনের বিরুদ্ধে সরকারি নিয়োগ ছাড়াই নিজের ছেলে নাইম হোসেনকে অফিসে বসিয়ে কম্পিউটার অপারেটরের কাজ করানোর অভিযোগ উঠেছে। শুধু অভিযোগই নয়, জয়নাল আবেদিন নিজেই তার ছেলে অফিসে কাজ করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
এ ছাড়া এক নারী সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে নামজারির কাজ করে দেওয়ার কথা বলে অতিরিক্ত টাকা চাওয়ার অভিযোগের একটি ভিডিও কথোপকথনও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। ওই ভিডিওর সত্যতাও স্বীকার করেছেন তহসিলদার জয়নাল আবেদিন। তবে তিনি দাবি করেছেন, ওই টাকা তিনি ব্যক্তিগতভাবে নেন না; বরং উপজেলা ভূমি অফিসের বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করে দিতে হয়।
৮ হাজার টাকা দিয়েও কাজ হয়নি, দাবি ৯ হাজারের
সম্প্রতি নিজের জমির নামজারি করতে দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান এক নারী সেবাগ্রহীতা। তার অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে কয়েক দিন অফিসে ঘোরাঘুরি করেও কাজ এগোয়নি। পরে তাকে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে চড়া সুদে ৮ হাজার টাকা সংগ্রহ করে অফিসে নিয়ে আসেন ওই নারী। কিন্তু তার কাছে ৯ হাজার টাকা দাবি করা হয়েছিল বলে তিনি জানান। ফলে ৮ হাজার টাকা দেওয়ার পরও বিষয়টি নিয়ে দেনদরবার শুরু হয়।
এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিওতে ওই নারীকে তহসিলদার জয়নাল আবেদিনের সঙ্গে টাকার বিষয়ে কথা বলতে শোনা যায়। কথোপকথনে ওই নারী নিজের আর্থিক অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে ৯ হাজার টাকার পরিবর্তে ৮ হাজার টাকা নেওয়ার অনুরোধ করেন।
ভিডিওটির বিষয়ে জয়নাল আবেদিনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি এর সত্যতা স্বীকার করেন।
‘আমি নিজের জন্য টাকা নেই না’
ভিডিওটির বিষয়ে তহসিলদার জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘আমি সবাইকে বলি আমাকে কাজ দিয়েন না, আমি বয়স্ক মানুষ। মাফ চাই, আমি নিজের জন্য টাকা নেই না। কাজ না হলে ওই মহিলার টাকা ফিরিয়ে দিবো। এই টাকা উপজেলা ভূমি অফিসকে ভাগ করে দিতে হয়। সবাই ভাগ পায়।’
তার এই বক্তব্যে সরকারি সেবার বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ আরও গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অর্থ নেওয়া হলে সেই অর্থ কার কাছে যায় এবং কীভাবে লেনদেন হয়—তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জয়নাল আবেদিন আরও বলেন, ‘টাকা ছাড়া কাজ নিয়ে গেলে বলে—বিনা পয়সার কাম কিল্লাই আনছেন? মক্কেল পাঠায় দেন।’
কারা টাকা নেন—তহসিলদারের বক্তব্যে নতুন প্রশ্ন
অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হলে সেই টাকা কারা পান—এমন প্রশ্নের জবাবে জয়নাল আবেদিন উপজেলা ভূমি অফিসের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে বলেন, দেওটি তহসিল অফিস ‘মেইনটেইন’ করেন উপজেলা ভূমি অফিসের আনোয়ার।
একইভাবে নাজমুল, ফরহাদসহ অন্যরাও আলাদা আলাদা তহসিল অফিস ‘মেইনটেইন’ করেন বলে দাবি করেন তিনি।
নির্ধারিত টাকা দিতে না পারলে সেবাগ্রহীতাকে উপজেলা ভূমি অফিসে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয় বলেও জানান জয়নাল আবেদিন।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) কত টাকা পান—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার হাত-পা বাঁধা, তবে এটুকু বলি সবাই ভাগ পায়।’
তবে তার বক্তব্যে যাদের নাম এসেছে, তাদের বক্তব্য বা সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আলাদাভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
দালাল সিন্ডিকেটের অভিযোগ
সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে ঘিরে পাঁচ থেকে সাতজনের একটি দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। তাদের দাবি, সরাসরি অফিসে গিয়ে সরকারি নিয়মে সেবা নিতে চাইলে অনেক সময় ফাইল এগোয় না। কিন্তু দালালের মাধ্যমে গেলে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ পাওয়া যায়।
কয়েকজন সেবাগ্রহীতা এ-সংক্রান্ত অভিযোগ করতে গিয়ে মতিউল ইসলাম শামিম, সাহাদাত হোসেন ও অফিস সহকারী মোস্তফার নাম উল্লেখ করেছেন।
তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সেবাগ্রহীতাদের প্রশ্ন, সরকারি অফিসে যদি সাধারণ মানুষকে নির্ধারিত সেবার জন্যও মধ্যস্থতাকারীর ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে ডিজিটাল ভূমিসেবা ও সহজীকরণের উদ্যোগের সুফল কতটা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে?
সরকারি নিয়োগ ছাড়াই অফিসে তহসিলদারের ছেলে
দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো—তহসিলদার জয়নাল আবেদিনের ছেলে নাইম হোসেন কোনো সরকারি নিয়োগ ছাড়াই অফিসে বসে কম্পিউটার অপারেটরের কাজ করছেন।
স্থানীয় সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে নাইমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। তার বিরুদ্ধেও সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিজের ছেলে অফিসে কাজ করার অভিযোগ অস্বীকার করেননি তহসিলদার জয়নাল আবেদিন। তিনি স্বীকার করেছেন, নাইম হোসেন সরকারি নিয়োগ ছাড়াই তার অফিসে কম্পিউটার অপারেটরের কাজ করছেন।
এতে প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি কোনো নিয়োগ বা অনুমোদন ছাড়াই একজন বেসরকারি ব্যক্তি কীভাবে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মতো সংবেদনশীল সরকারি দপ্তরে বসে ভূমি-সংক্রান্ত কাজে যুক্ত হচ্ছেন এবং নাগরিকদের সেবায় অংশ নিচ্ছেন।
বিশেষ করে ভূমির মালিকানা, নামজারি, খতিয়ান ও অন্যান্য নথির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় অননুমোদিত ব্যক্তির দাপ্তরিক কাজে সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রশাসনিকভাবে খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
কোন কোন সেবা দেওয়ার কথা ভূমি অফিসে
ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ভূমিসেবা দেওয়ার কথা। এর মধ্যে রয়েছে ভূমি উন্নয়ন কর গ্রহণ, নামজারি ও মিউটেশন আবেদনের যাচাই-বাছাই ও তদন্ত, বিভিন্ন ধরনের খতিয়ান সংরক্ষণ ও হালনাগাদ, খাসজমি বন্দোবস্তের প্রস্তাব তৈরি এবং জমির সীমানা ও মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধের প্রাথমিক তদন্তসহ নানা কার্যক্রম।
এসব সেবা পেতে সাধারণত নাগরিকদের নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ করতে হয়। ফলে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ সত্য হলে তা সরকারি সেবা প্রদানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
সরকারি ফি বনাম অতিরিক্ত অর্থের অভিযোগ
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ই-নামজারির জন্য সরকারি নির্ধারিত ফি ১ হাজার ১৭০ টাকা। খতিয়ানের অনলাইন বা সার্টিফাইড কপির জন্য ১২০ টাকা, মৌজা ম্যাপের প্রতি শিটের জন্য ৫৪৫ টাকা এবং খতিয়ান সংশোধনের আবেদনের জন্য ২০ টাকা ফি নির্ধারিত রয়েছে।
কিন্তু সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, নির্ধারিত ফি দিয়ে সরাসরি আবেদন করলে দিনের পর দিন অফিসে ঘুরতে হয়। একপর্যায়ে হয়রানি এড়াতে তারা দালালের শরণাপন্ন হতে বাধ্য হন এবং তখন নির্ধারিত ফির বাইরে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দিতে হয়।
এ ধরনের অভিযোগের কারণে সাধারণ ভূমিমালিক, কৃষক ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে জমির নামজারি বা খতিয়ান সংশোধনের মতো প্রয়োজনীয় সেবা বিলম্বিত হলে জমি কেনাবেচা, উত্তরাধিকারসূত্রে মালিকানা হস্তান্তর কিংবা অন্যান্য আইনগত কাজে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে কী বলছে প্রশাসন
দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ঘুষ, দালালনির্ভরতা এবং অননুমোদিতভাবে তহসিলদারের ছেলেকে অফিসে কাজ করানোর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সোনাইমুড়ী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিন বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের এ বক্তব্যের পর এখন প্রশ্ন উঠেছে, অভিযোগগুলো লিখিতভাবে এলে সেগুলো কতটা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হয় এবং তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্তে পরিষ্কার হতে পারে অভিযোগের সত্যতা
দেওটি ইউনিয়ন ভূমি অফিস ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি ফির বাইরে অর্থ আদায়, দালালচক্রের মাধ্যমে সেবা নিয়ন্ত্রণ, ঘুষের টাকা ভাগাভাগির দাবি এবং সরকারি নিয়োগ ছাড়াই তহসিলদারের ছেলেকে অফিসে বসিয়ে কাজ করানো।
এসব অভিযোগের কিছু বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিজেই বক্তব্য দিয়েছেন এবং ছেলে অফিসে কাজ করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা, অর্থের লেনদেনের পরিমাণ, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারী এতে সম্পৃক্ত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে প্রশাসনিক তদন্ত প্রয়োজন।
সেবাগ্রহীতাদের প্রত্যাশা, উপজেলা ও জেলা প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখে ভূমি অফিসে নির্ধারিত ফি ও সেবা প্রদানের নিয়ম দৃশ্যমান করা, দালালনির্ভরতা বন্ধ করা এবং অননুমোদিত ব্যক্তির দাপ্তরিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।

