বাঙালির রসনার অন্যতম পরিচিত মাছ ইলিশ। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা নদী থেকে বঙ্গোপসাগর—দেশের জলজ পরিবেশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই রূপালি মাছ বর্ষা এলেই জেলেদের জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করে। প্রতিবছরের মতো এবারও নদী ও সাগরে নেমেছেন হাজার হাজার জেলে। কোথাও কোথাও জালে ধরা পড়ছে বড় বড় ইলিশ, মিলছে একসঙ্গে কয়েক দশ মণ মাছের চালান। কিন্তু স্থানীয় বাজারে সামগ্রিক সরবরাহ কম থাকায় ঢাকার বাজারে ইলিশের দাম রীতিমতো সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে গেছে।
পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় একটি ট্রলারে একবারে ৪৬ মণ ইলিশ ধরা পড়েছে। কলাপাড়ায় আরেকটি ট্রলারে উঠেছে প্রায় ৮০ মণ ইলিশ। চট্টগ্রাম উপকূলেও জুলাই মাসে প্রায় ৩৫ লাখ ইলিশ ধরা পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যার মোট ওজন দেড় হাজার টনের বেশি। এরপরও রাজধানীর বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দাম কমার বদলে বেড়েই চলেছে।
বর্তমানে ঢাকার বাজারে এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা কেজি দরে। আধা কেজি ওজনের ইলিশের দামও প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা। ফলে মধ্যবিত্তের অনেক পরিবারও নিয়মিত ইলিশ কেনা কমিয়ে দিয়েছে। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে মাছটি এখন অনেকটাই বিশেষ উপলক্ষের খাবারে পরিণত হয়েছে।
কারওয়ান বাজারে ক্রেতার ভিড় কম, দাম শুনেই ফিরছেন অনেকে
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের আড়তে ইলিশের দোকানগুলোতে দেখা গেছে, ছোট ও মাঝারি আকারের মাছের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ তুলনামূলক বেশি। বড় ইলিশের দাম শুনে অনেকেই কিনতে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন।
মাছ বিক্রেতা শুক্কুর আলী বলেন, “বিশ বছর ধরে এই ব্যবসা করছি। এত দাম আগে কখনো দেখিনি। এক কেজির ইলিশ এখন ২৪০০ টাকার নিচে নেই। গত বছর একই মাছ ১৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এবার ৪০০-৫০০ টাকা বেশি। ক্রেতারা দাম শুনেই চলে যান। বিক্রি কমে গেছে অনেক।”
তাঁর দোকানে ছোট আকারের ইলিশের চাহিদা তুলনামূলক বেশি। বিশেষ করে প্রায় ২৫০ গ্রামের মাছ অনেক ক্রেতা কিনছেন। কারণ এক কেজি ওজনের ইলিশ এখন অনেক পরিবারের নিয়মিত খাদ্যতালিকার বাইরে চলে গেছে।
কারওয়ান বাজারে ইলিশ কিনতে আসা আলতাফ হোসেন বলেন, “এ বছর দ্বিতীয়বার এসেছি ইলিশ কিনতে। আগেরবার ১৮০০ টাকায় কিনেছিলাম। এখন ২৪০০ চাইছে। বাজেট নেই। দুটো ৭৫০ গ্রামের মাছ নিলাম। এক কেজির মাছ আর আমার সাধ্যের মধ্যে নেই।”
চাঁদপুরের বড়স্টেশনে কমেছে ইলিশের সরবরাহ
দেশের অন্যতম বড় ইলিশের পাইকারি বাজার চাঁদপুরের বড়স্টেশন মাছঘাটেও সরবরাহ কমেছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, তিন বছর আগে জুলাই মাসে এই ঘাটে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার মণ ইলিশ আসত। গত বছর সেই পরিমাণ নেমে আসে প্রায় ৪০০ মণে। এবার প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৫০ মণ ইলিশ আসছে।
চাঁদপুর মাছ ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আবদুল বারী জমাদার বলেন, “এত কম সরবরাহ আগে কখনো দেখিনি। নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। দূষণ, জাটকা ধরা, ছোট মেশের জাল আর নদীর তলদেশে চর পড়ে যাওয়া—এসব কারণে ইলিশ কমে গেছে। সাগর থেকে যেসব ট্রলার আসে, বেশিরভাগই ২০-৩০ মণের বেশি নিয়ে ফিরতে পারছে না।”
বড় চালান মিললেও প্রতিদিনের চিত্র ভিন্ন
কখনো কখনো জেলেদের জালে বড় চালান ধরা পড়ছে। ভোলার জেলে আলমগীর জানান, পাঁচ বছর পর একসঙ্গে বড় একটি চালান পেয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৪৬ মণ ইলিশ নিলামে প্রায় ৪৮ লাখ টাকা ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে। তবে এমন বড় চালান প্রতিদিন পাওয়া যায় না। অনেক সময় জেলেদের শূন্য হাতেও ফিরতে হয়।
তিনি বলেন, “জ্বালানির দাম বেড়েছে, খরচ বেড়েছে। মাছ কম ধরলে লোকসান।”
চট্টগ্রামের আনোয়ারার নৌকা মালিক দিদারুল ইসলাম জানান, একটি নৌকায় প্রতিদিন প্রায় ৪০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, নৌকা পরিচালনার ব্যয় এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মাছ আহরণের মোট খরচও বেড়েছে।
টানা দুই বছর কমেছে ইলিশ উৎপাদন
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে পৌঁছেছিল। পরের অর্থবছরে উৎপাদন প্রায় ৭ শতাংশ কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে নামে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও প্রায় ১২ শতাংশ কমে ৫ লাখ টনের কাছাকাছি নেমে আসে।
ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, চলতি সময়ে উৎপাদন আরও কমতে পারে। তবে প্রকৃত উৎপাদনের পরিমাণ জানতে সংশ্লিষ্ট সরকারি হিসাব ও মৌসুমভিত্তিক তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
মৎস্য গবেষকদের মতে, ইলিশের ডিম ছাড়ার হার, রেণু-পোনা ও জাটকার টিকে থাকার সঙ্গে নদীর পরিবেশের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। নদীদূষণ, নাব্যতা কমে যাওয়া, খাদ্যশৃঙ্খলে পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও ইলিশের বিচরণ ও প্রজননে প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
কেন কমছে ইলিশের সরবরাহ?
মৎস্যসংশ্লিষ্টদের মতে, ইলিশের সরবরাহ কমার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
নিষিদ্ধ সময়ে জাটকা ও মা ইলিশ আহরণ;
নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া ও তলদেশে চর পড়া;
নদী ও উপকূলীয় পানিদূষণ;
ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার;
ইলিশের প্রজনন ও অভিপ্রয়াণ পথের পরিবেশগত পরিবর্তন;
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব;
জ্বালানি ও পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি।
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ছোট নৌকায় ধরা ইলিশের কেজিপ্রতি মোট খরচ প্রায় ৮১৩ টাকা, মাঝারি নৌকায় ৮৪৬ টাকা এবং বড় ট্রলারে প্রায় ৮২৮ টাকা। উৎপাদন ও আহরণ ব্যয়ের সঙ্গে বাজারের বিভিন্ন স্তরের খরচ যুক্ত হয়ে ভোক্তা পর্যায়ে দাম আরও বাড়ে।
ভারত থেকে ইলিশ এলেও কমছে না বাজারদর
দেশীয় বাজারে সরবরাহের ঘাটতির মধ্যে ভারত থেকেও ইলিশ আমদানি হচ্ছে। বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস—জুলাই ও আগস্টে—৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু আগস্ট মাসেই এসেছে ৩ লাখ ২৩ হাজার কেজির বেশি।
দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব ইলিশের মোট আমদানি মূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকা। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, এলসির মাধ্যমে আমদানি করা ইলিশের ঘোষিত কেজিপ্রতি মূল্য প্রায় ২৫২ টাকা। শুল্ক, পরিবহণ ও অন্যান্য ব্যয় যোগ করে আমদানিকারকের মোট খরচ প্রায় ৫১৪ টাকা পর্যন্ত দাঁড়ায় বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন।
তবে যশোর, বেনাপোলসহ বিভিন্ন বাজারে এসব মাছ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা কেজি পর্যন্ত দরে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কিছু আমদানিকৃত মাছকে স্থানীয় নদীর ইলিশ হিসেবে বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।
যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন বলেন, “ভারত থেকে ইলিশ আমদানির সঠিক কারণ এ মুহূর্তে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব হচ্ছে না। তবে বাজারে এসব মাছ স্থানীয় বলে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। আমরা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছি।”
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মধ্যবিত্তের খাবার থেকে উৎসবের পদ
রাজধানীর পূর্ব রামপুরা বউবাজারের ক্রেতা রেহানা বেগম বলেন, “আগে বছরে অন্তত চার-পাঁচবার ইলিশ কিনতাম। এখন একবারই কিনতে পারি উৎসবে। আধা কেজির মাছ ১৮০০ টাকা। পরিবারে পাঁচজন। এক বেলা খাওয়ার জন্যই অনেক টাকা চলে যায়।”
মগবাজারের ক্রেতা করিম মিয়ার ভাষ্য, ইলিশের বর্তমান দাম অনেক পরিবারের নিয়মিত খাদ্যতালিকাকে প্রভাবিত করছে। ফলে অনেকেই বড় মাছের পরিবর্তে ছোট আকারের ইলিশ কিনছেন অথবা বিকল্প মাছ বেছে নিচ্ছেন।
মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা
ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় আগামী ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন দেশব্যাপী ইলিশ আহরণ, পরিবহণ, মজুত ও বিক্রি নিষিদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ সময়ে মা ইলিশ সংরক্ষণে অভিযান চালানোর পাশাপাশি জেলেদের ভিজিএফ সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “উৎপাদন বাড়াতে সংরক্ষণই একমাত্র পথ। জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষা করতে না পারলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”
সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় জোর বিশেষজ্ঞদের
ইলিশ গবেষক ও মৎস্য বিশেষজ্ঞ ড. আনিসুর রহমান বলেন, “ইলিশের প্রজননক্ষেত্র ও অভিপ্রয়াণ পথ রক্ষা করতে হবে। নদী দূষণ কমাতে হবে। জাটকা ধরা বন্ধে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাজারে আমদানিকৃত ইলিশের সঠিক লেবেলিং নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ক্রেতারা প্রতারিত না হন।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের সংকট মোকাবিলায় শুধু নিষেধাজ্ঞা দিলেই হবে না; নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের সহায়তা, নদীর নাব্যতা রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ জাল বন্ধ, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ইলিশের সংকট শুধু দামের নয়
দেশের নদী ও সাগরের কোথাও কোথাও একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়লেও সেটি সামগ্রিক বাজার সরবরাহের চিত্রকে পুরোপুরি প্রতিফলিত করে না। পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমে গেলে, তার সঙ্গে আহরণ, জ্বালানি, পরিবহণ, বরফ সংরক্ষণ, আড়ত ও খুচরা পর্যায়ের ব্যয় যুক্ত হয়ে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়ে।
ফলে একদিকে জেলেরা পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন, অন্যদিকে ক্রেতারা বাড়তি দামের চাপে ইলিশ কেনা কমিয়ে দিচ্ছেন। উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার এই চ্যালেঞ্জগুলো সমাধান করা না গেলে ভবিষ্যতে দেশের জাতীয় মাছ ইলিশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে আরও চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

