ঢাকা রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

রাজস্ব আদায়ে ভাটা, সিদ্ধান্তের দোলাচলে চাপে ব্যবসায়ীরা

এহসানুর হক কবির

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ০২:৫১ পিএম

রাজস্ব আদায়ে ভাটা, সিদ্ধান্তের দোলাচলে চাপে ব্যবসায়ীরা

ছবিঃ সংগৃহীত

দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে রাজস্ব আদায়ের নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতার পরও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ঘাড়ে এবারও দেওয়া হয়েছে বড় অঙ্কের রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪৭ শতাংশ বাড়িয়ে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে।

বড় এই লক্ষ্য অর্জনে অর্থবছরের শুরু থেকেই কর ফাঁকি রোধ, বকেয়া কর আদায়, করের আওতা সম্প্রসারণ এবং নতুন করদাতা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে করজালের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর। তবে রাজস্ব আদায় বাড়াতে গিয়ে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের নিয়মে পরিবর্তন, প্যাকেজ ভ্যাট চালুর পরিকল্পনা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর নতুন করে ভ্যাটের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভ্যাট আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে রাজস্ব আদায়ের সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

প্রায় তিন মাসের রাজস্ব তথ্য প্রকাশে বিলম্ব

এনবিআরের বিভিন্ন উদ্যোগের পরও রাজস্ব আদায় এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছানোয় চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন মাসের রাজস্ব আদায়ের পূর্ণাঙ্গ তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

এ বিষয়ে এনবিআরের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আয়কর আইনের পরিবর্তন এবং ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়মে পরিবর্তনের কারণে তথ্য সমন্বয়ে কিছুটা সময় লাগছে। বিষয়টি গোপন করার মতো কিছু নয় বলেও দাবি করেন তিনি।

দুই মাসেই ভ্যাট আদায় কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই ও আগস্টে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

গত জুলাইয়ে ভ্যাট থেকে আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৩০১ কোটি টাকা। আগের বছরের একই মাসে এর পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জুলাইয়ে ভ্যাট আদায় কমেছে ২ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা।

অন্যদিকে আগস্টে সাময়িক হিসাবে ভ্যাট আদায় হয়েছে ৮ হাজার ৩৬২ কোটি টাকা। আগের বছরের আগস্টে এ খাত থেকে আদায় হয়েছিল ১১ হাজার ৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ আগস্টেও আদায় কমেছে ২ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা।

দুই মাসের হিসাব মিলিয়ে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট আদায়ে প্রায় ২০ শতাংশ পতন হয়েছে।

শুধু ভ্যাট আদায় নয়, জুলাইয়ে ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সংখ্যাও কমেছে। গত জুনে ৩ লাখ ২৮ হাজার ভ্যাট রিটার্ন জমা পড়লেও জুলাইয়ে তা কমে ৩ লাখ ৬ হাজারে নেমে আসে।

মাসিকের বদলে ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্নে পরিবর্তন

ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও প্রশাসনিক জটিলতা কমাতে চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্রতি মাসের পরিবর্তে তিন মাস পরপর ভ্যাট রিটার্ন জমা ও ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু নতুন ব্যবস্থা চালুর পর প্রথম দুই মাসে ভ্যাট আদায় কমে যাওয়ায় সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর।

এনবিআরের ভ্যাট নীতি শাখা সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

এনবিআর সূত্র বলছে, তিন মাস পরপর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ বহাল রেখে প্রতি মাসে ভ্যাটের অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হতে পারে। এতে একদিকে রাজস্ব আদায় নিয়মিত রাখার পাশাপাশি অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের রিটার্ন দাখিলের প্রশাসনিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা হবে।

‘প্রতি মাসে রিটার্ন দেওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন’

ভ্যাট রিটার্নের নিয়ম পরিবর্তনের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিনের ভাষ্য, প্রতি মাসে ভ্যাট রিটার্ন জমা দেওয়া ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কঠিন। অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক ছোট ব্যবসায়ী এখনো প্রযুক্তিগতভাবে প্রস্তুত নন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তার মতে, অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার পাশাপাশি কাগজপত্র সংক্রান্ত কাজও করতে হয়, যা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি জটিলতা তৈরি করে।

গুলিস্তানের পোশাক ব্যবসায়ী তুহিন ফিরোজীও বলেন, প্রতি মাসে রিটার্ন জমা দিতে ব্যবসার সময় থেকে আলাদা সময় বের করে ভ্যাট অফিসে যেতে হয়। তিন মাস পরপর রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ থাকলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য তুলনামূলক সুবিধা হয় বলেও তিনি মনে করেন।

প্যাকেজ ভ্যাট চালুর পরিকল্পনা

রাজস্ব আদায় বাড়াতে খুচরা দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর আবারও প্যাকেজ ভ্যাট চালুর পরিকল্পনা করছে এনবিআর।

চলতি অর্থবছরের বাজেটকে ঘিরে প্যাকেজ ভ্যাট নিয়ে আলোচনা থাকলেও তখন এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এখন প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণের উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।

এনবিআরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ইউনিয়ন পর্যায়ের দোকান ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য মাসে ৫০০ টাকা, উপজেলা পর্যায়ে ১ হাজার টাকা এবং জেলা সদর ও জেলা পৌর শহর এলাকায় ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ন্যূনতম ভ্যাট নির্ধারণ করা হতে পারে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও এই ভ্যাট পরিশোধের সুযোগ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছে ভ্যাট বিভাগের কর্মকর্তারা বলে জানা গেছে। তালিকা চূড়ান্ত করার পর স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে কোন ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এ ব্যবস্থার আওতায় আসবে, তা নির্ধারণ করা হতে পারে।

ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ

প্যাকেজ ভ্যাটসহ একের পর এক সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিনের অভিযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিস্থিতি আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় আয়কর, ভ্যাটসহ অন্যান্য ব্যয়ের পাশাপাশি নতুন করে প্যাকেজ ভ্যাট আরোপ করা হলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, এনবিআরের সিদ্ধান্তে ঘন ঘন পরিবর্তন ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে এবং এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও আসতে পারে।

ক্ষুদ্র ব্যবসাকে করজালে আনার উদ্যোগ

এনবিআরের পক্ষ থেকে অবশ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগকে রাজস্ব ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানোর অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

করবিদ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে কর ও ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ ইতিবাচক হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে তারা নতুন ব্যবস্থাকে ভয় বা চাপ হিসেবে না দেখেন।

এনবিআরের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের ভিত্তিও বাড়তে পারে।

ভোক্তার ওপর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন

প্যাকেজ ভ্যাট চালু হলে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়বে কি না, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইনের মতে, নতুন ভ্যাট আরোপের অজুহাতে কোনো ব্যবসায়ী পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন কি না, তা নজরদারির মধ্যে রাখতে হবে। একই সঙ্গে ভ্যাট আদায়ের পাশাপাশি ক্রেতাদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় চ্যালেঞ্জ

চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য এনবিআরের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কর ফাঁকি বন্ধ, বকেয়া কর আদায়, করদাতার সংখ্যা বাড়ানো এবং ভ্যাটের আওতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি রাজস্ব প্রশাসনে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এদিকে বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, দেশের জ্বালানি সংকট এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ধীরগতির প্রভাব ব্যক্তি আয় ও রাজস্ব আদায়েও পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

দেশে বর্তমানে টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩১ লাখ। তবে সর্বশেষ করবর্ষে রিটার্ন জমা দিয়েছিলেন ৪৯ লাখ ৫৮ হাজার করদাতা। চলতি করবর্ষের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত রিটার্ন জমার সংখ্যা ছিল সাড়ে ছয় লাখের কিছু কম।

ফলে বিপুলসংখ্যক টিআইএনধারীর তুলনায় রিটার্ন দাখিলের হার বাড়ানো এবং নিয়মিত কর পরিশোধে করদাতাদের উৎসাহিত করা এনবিআরের জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একদিকে বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, অন্যদিকে ব্যবসা-বাণিজ্যে চাপ ও ভ্যাট আদায়ে নিম্নগতি—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে এনবিআরকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমানো, নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং করদাতা ও ভোক্তার স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!