ঢাকা রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

উত্তাল পদ্মায় দুই সপ্তাহ ধরে ফেরি বন্ধ, ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে পারাপার

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১১:০২ এএম

উত্তাল পদ্মায় দুই সপ্তাহ ধরে ফেরি বন্ধ, ঝুঁকি নিয়ে ট্রলারে পারাপার

ছবিঃ সংগৃহীত

তীব্র স্রোত ও নদীর উত্তাল পরিস্থিতির কারণে রাজবাড়ীর ধাওয়াপাড়া ও পাবনার নাজিরগঞ্জ নৌপথে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে ফেরি চলাচল। এতে বিপাকে পড়েছেন এ নৌপথের যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকরা। ফেরি বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিতে হচ্ছে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও স্পিডবোটে।

ফেরি চলাচল বন্ধের সুযোগে বিকল্প এসব নৌযানের ভাড়াও বেড়েছে। ফলে যাত্রীদের একদিকে নদী পারাপারে জীবনের ঝুঁকি নিতে হচ্ছে, অন্যদিকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। দ্রুত ফেরি চলাচল স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন নিয়মিত যাত্রীরা।

দুই ফেরিই বন্ধ

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) সূত্রে জানা যায়, ধাওয়াপাড়া-নাজিরগঞ্জ নৌরুটে ‘ক্যামেলিয়া’ ও ‘কপোতী’ নামে দুটি ফেরি চলাচল করে।

এ নৌপথ দিয়ে প্রতিদিন ধাওয়াপাড়া ঘাট থেকে গড়ে প্রায় ৪০টি যানবাহন পারাপার হয়। নাজিরগঞ্জ ঘাট থেকেও রাজবাড়ীসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার দিকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক যানবাহন চলাচল করে।

যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গত ২৩ জুলাই থেকে ‘কপোতী’ ফেরির চলাচল বন্ধ রয়েছে। এরপর নদীতে তীব্র স্রোত ও উত্তাল পরিস্থিতির কারণে গত ৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা থেকে ‘ক্যামেলিয়া’ ফেরির চলাচলও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ফলে বর্তমানে এ নৌপথে কোনো ফেরিই চলাচল করছে না।

যানবাহনকে ঘুরতে হচ্ছে লালন শাহ সেতু দিয়ে

ফেরি বন্ধ থাকায় ধাওয়াপাড়া-নাজিরগঞ্জ রুট ব্যবহারকারী যানবাহনগুলোকে বিকল্প পথে কুষ্টিয়ার লালন শাহ সেতু ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে।

এতে একদিকে যাতায়াতের দূরত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত সময় ও জ্বালানি খরচ হচ্ছে। বিশেষ করে পণ্যবাহী যানবাহন ও নিয়মিত এ নৌপথ ব্যবহারকারী পরিবহন শ্রমিকদের ভোগান্তি বেড়েছে।

যাত্রীদের অনেকেই পদ্মা নদী পারাপারের জন্য ট্রলার ও স্পিডবোট ব্যবহার করছেন। তবে নদীতে স্রোত বেশি থাকায় এসব নৌযানে পারাপারকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন যাত্রীরা।

ঘাটে পড়ে আছে ‘ক্যামেলিয়া’, চলছে ট্রলার-স্পিডবোট

সরেজমিনে ধাওয়াপাড়া ঘাটে দেখা যায়, পন্টুনের সঙ্গে মোটা রশি দিয়ে বাঁধা রয়েছে ‘ক্যামেলিয়া’ ফেরি। ফেরির চলাচল বন্ধ থাকায় ঘাটের পাশ থেকে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও স্পিডবোটে যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে।

এসব নৌযানে যাত্রীদের পাশাপাশি মোটরসাইকেল ও বিভিন্ন ধরনের পণ্যও পরিবহন করা হচ্ছে।

স্পিডবোটে থাকা কয়েকজন যাত্রীর শরীরে লাইফ জ্যাকেট দেখা গেলেও ট্রলারে থাকা অনেক যাত্রীর শরীরে লাইফ জ্যাকেট দেখা যায়নি। ফলে উত্তাল পদ্মায় ট্রলার পারাপারের সময় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ঘাটে ট্রলারের সামনে কাঠের টেবিল বসিয়ে টিকিট বিক্রি করতে দেখা যায়। ছাপানো টিকিটে ট্রলারের ভাড়া ৮০ টাকা এবং স্পিডবোটের ভাড়া ১৫০ টাকা উল্লেখ রয়েছে। মোটরসাইকেল পারাপারে নেওয়া হচ্ছে ২০০ টাকা।

বেড়েছে ট্রলার ও স্পিডবোটের ভাড়া

স্থানীয় যাত্রীদের ভাষ্য, ফেরি বন্ধ হওয়ার আগে স্বাভাবিক সময়ে ট্রলারে জনপ্রতি ৫০ টাকা এবং স্পিডবোটে ১০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হতো। ফেরি চালু থাকলে একজন যাত্রীর ফেরি ভাড়া ছিল ৩০ টাকা।

বর্তমানে ট্রলারে জনপ্রতি ৮০ টাকা এবং স্পিডবোটে ১৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এর সঙ্গে ট্রলারে ওঠার জন্য আরও পাঁচ টাকা অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে বলে যাত্রীরা জানিয়েছেন।

ফলে ফেরি বন্ধের কারণে শুধু যাতায়াতের ঝুঁকি নয়, বাড়তি খরচের চাপও তৈরি হয়েছে সাধারণ যাত্রীদের ওপর।

উত্তাল নদীতে পারাপারে আতঙ্ক

ট্রলারে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা জানান, পদ্মায় স্রোত বেড়ে যাওয়ায় নদী পারাপারের সময় ঢেউ ও দুলুনির কারণে আতঙ্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বয়স্ক যাত্রীদের নিয়ে পারাপারের সময় ঝুঁকি আরও বেশি মনে হয়।

রবিউল ইসলাম নামে এক যাত্রী বলেন, ফেরি বন্ধ থাকায় পদ্মা পার হওয়ার জন্য এখন ট্রলার ও স্পিডবোটই ভরসা। কিন্তু নদী উত্তাল থাকায় এসব নৌযানে পারাপার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নদী পার হওয়ার সময় সবসময় আতঙ্কে থাকতে হয়। এর ওপর আগের তুলনায় ভাড়াও বেড়েছে। দ্রুত ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হলে যাত্রীদের ভোগান্তি ও ঝুঁকি—দুটিই কমবে।

চালকদের দাবি, স্রোতের কারণে খরচ বেড়েছে

অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার বিষয়ে ট্রলার ও স্পিডবোটচালকদের বক্তব্য, নদীতে স্রোত বেশি থাকায় পারাপারে সময় বেশি লাগছে। একই সঙ্গে ইঞ্জিন চালাতে বেশি জ্বালানি প্রয়োজন হচ্ছে। এ কারণে আগের তুলনায় ভাড়া বাড়ানো হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।

তবে যাত্রীদের কেউ কেউ বলছেন, ফেরি বন্ধ থাকায় বিকল্প নৌযানের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া বৃদ্ধির চাপও তাদেরই বহন করতে হচ্ছে।

দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে ফেরি বন্ধ

বিআইডব্লিউটিসির ধাওয়াপাড়া ফেরিঘাটের সহকারী ব্যবস্থাপক রবিউল ইসলাম বলেন, নদীতে তীব্র স্রোতের কারণে ফেরির ইঞ্জিন ওভারহিট হচ্ছে। এ অবস্থায় ফেরি চালালে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

তিনি বলেন, যাত্রী ও যানবাহনের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, নদীর পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ফেরি চালু করা ঝুঁকিপূর্ণ। তবে কবে নাগাদ ফেরি চলাচল স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানা যায়নি।

দ্রুত ফেরি চালুর দাবি

ধাওয়াপাড়া-নাজিরগঞ্জ নৌপথ দিয়ে নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রীরা দ্রুত ফেরি চালুর দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় শুধু যাত্রীদের ভাড়া ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যা হচ্ছে না, যানবাহনকেও দীর্ঘ পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে।

এতে সময় ও জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে এবং পণ্য পরিবহনেও অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হচ্ছে। নদীর পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপদ সময়ে দ্রুত ফেরি চলাচল শুরু করা গেলে যাত্রী ও পরিবহন খাতের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!