জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি নতুন দায়িত্ব শুরু করেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর দেওয়া বক্তব্যে ড. খলিলুর রহমান জানান, বর্তমান বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সংলাপ, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা তাঁর সভাপতিত্বের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হবে। জাতিসংঘসহ বহুপাক্ষিক শাসনব্যবস্থা বর্তমানে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি একই সঙ্গে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেই নতুন কিছু সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন।
‘জাতিসংঘ অভূতপূর্ব পরীক্ষার মুখে’
শপথ গ্রহণের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসংঘ এবং সামগ্রিক বহুপাক্ষিক শাসনব্যবস্থা এমন এক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার নজির আগে খুব বেশি দেখা যায়নি।
তবে তাঁর মতে, সংকট যতটা গভীর, একই সঙ্গে সমাধানের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি হয়েছে। রাতারাতি বিশ্বের সব সমস্যার ‘জাদুকরী সমাধান’ সম্ভব নয়—এ বাস্তবতা স্বীকার করে তিনি বলেন, এই বাস্তবতা যেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সাধারণ ঐকমত্যে পৌঁছানোর প্রচেষ্টার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
জাতিসংঘের সভাপতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনার ক্ষেত্র আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান।
সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের প্রতিশ্রুতি
দায়িত্ব গ্রহণের পর সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে খোলামেলা ও নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতি।
১৯৮৫ সালে প্রথমবার জাতিসংঘে প্রতিনিধি হিসেবে কাজ শুরু করার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে খলিলুর রহমান বলেন, দীর্ঘ সময়ের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা তাঁকে জাতিসংঘের কার্যক্রম ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করার সুযোগ দিয়েছে।
তাঁর সভাপতিত্বে সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও যোগাযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা তিনি জানান।
রোহিঙ্গা সংকট ও রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীর প্রতি গুরুত্ব
দায়িত্ব নেওয়ার পর খলিলুর রহমান রাষ্ট্রহীন ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর সংকট আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
জাতিসংঘ সনদের মূল বাণী ‘আমরা বিশ্ব জনগণ’-এর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতিসংঘকে শুধু সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। যেসব জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রহীনতা, বাস্তুচ্যুতি ও দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকটের মধ্যে রয়েছে, তাদের সমস্যাও বৈশ্বিক সংলাপের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনের অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেন তিনি। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি তিনি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
জাতিসংঘকে ‘ভবিষ্যতের উপযোগী’ করার তাগিদ
খলিলুর রহমানের নির্বাচনী প্রচারণার অন্যতম মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘আস্থা পুনর্গঠন ও রূপান্তর ব্যবস্থাপনা’। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক বাস্তবতার উপযোগী করে তোলার বিষয়টিকে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
তিনি মনে করেন, ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত কাঠামো দিয়ে বর্তমান বিশ্বের সব বাস্তবতা মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই জাতিসংঘের সংস্কার হতে হবে গঠনমূলক, কার্যকর ও অর্থবহ।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু কাঠামোগত পরিবর্তনের জন্য সংস্কার নয়; বরং আন্তর্জাতিক সংস্থাটিকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও কার্যকর করার লক্ষ্যেই সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কারে গুরুত্ব
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কারও তাঁর সভাপতিত্বের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি। নিরাপত্তা পরিষদের দীর্ঘদিনের আলোচিত সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গের প্রতিনিধিত্ব, কার্যকারিতা এবং বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে আলোচনা চলছে, সেই প্রক্রিয়ায় সাধারণ পরিষদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
খলিলুর রহমান এই সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সংলাপ ও ঐকমত্য তৈরির ওপর জোর দেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনেও থাকবে নজর
জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি সনদের বিধান অনুসরণ করে মসৃণভাবে সম্পন্ন করার বিষয়েও আশ্বাস দিয়েছেন নতুন সভাপতি।
জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রক্রিয়া হওয়ায় এ ক্ষেত্রে সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা রয়েছে। খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, নির্ধারিত নিয়ম ও জাতিসংঘ সনদের কাঠামো অনুসরণ করেই এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা থাকবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও বৈশ্বিক নীতিমালা
বর্তমান বিশ্বের দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিগত বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়েও বৈশ্বিক নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন খলিলুর রহমান।
এআইয়ের দ্রুত বিস্তারের ফলে প্রযুক্তির সুফল, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার ওপর যে নতুন ধরনের প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে, সেগুলো মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত আলোচনা প্রয়োজন বলে তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন।
এর পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় বিশ্বনেতাদের নতুন করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
সব দেশের জন্য নিরপেক্ষ সভাপতি হওয়ার প্রতিশ্রুতি
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা গোষ্ঠীর পক্ষ না নিয়ে সব সদস্য রাষ্ট্রের জন্য নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নির্বাচনী প্রক্রিয়া যেভাবেই সম্পন্ন হয়ে থাকুক না কেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর ভূমিকা হবে সব দেশের সঙ্গে সমানভাবে কাজ করা এবং মতপার্থক্যের মধ্যেও আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্য তৈরির চেষ্টা করা—এমন বার্তাই দিয়েছেন তিনি।
কোনো বহিরাগত প্রভাবের অধীনে নয়
শপথ গ্রহণের সময় ড. খলিলুর রহমান সম্পূর্ণ আনুগত্য, বিচক্ষণতা ও বিবেকের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার করেন। একই সঙ্গে কোনো দেশের সরকার বা অন্য কোনো বহিরাগত প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে দায়িত্ব পালনের কথাও ঘোষণা করেন তিনি।
এতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে তাঁর নিরপেক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
সামনে একাধিক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ
নতুন সভাপতি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন, যখন বিশ্বজুড়ে সংঘাত, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন এবং নতুন প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে নানা ধরনের আন্তর্জাতিক আলোচনা চলছে।
এসব বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে সাধারণ অবস্থানে পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন খলিলুর রহমান।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে তাঁর সভাপতিত্বে রোহিঙ্গা সংকট, জাতিসংঘ সংস্কার, নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, এআইয়ের বৈশ্বিক নীতিমালা, মানবাধিকার ও টেকসই উন্নয়নসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যু আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পাবে বলে তাঁর বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

