যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় সরকারি সহায়তা গ্রহণের বিষয়টি আরও বিস্তৃতভাবে বিবেচনার উদ্যোগ নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন ব্যবস্থায় কোনো অভিবাসী বর্তমানে সরকারি সুবিধা নিচ্ছেন কি না, তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এসব সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার সম্ভাবনাও অভিবাসন কর্মকর্তাদের মূল্যায়নের আওতায় আসতে পারে।
নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার আগেই এর বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে নিউইয়র্কের নেতৃত্বে ২২টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসি। নিউইয়র্ক সিটির নেতৃত্বে একদল শহরও পৃথক মামলা করেছে। ফলে নিয়মটি শেষ পর্যন্ত কীভাবে কার্যকর হবে, তা এখন আদালতের সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভর করছে।
গ্রিন কার্ড যাচাইয়ে কী পরিবর্তন আসছে
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে দীর্ঘদিন ধরেই এমন একটি বিধান রয়েছে, যার আওতায় কোনো অভিবাসী ভবিষ্যতে সরকারের ওপর অতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন কি না, তা বিবেচনা করা যায়। এ ধরনের ব্যক্তিকে অভিবাসন আইনের ভাষায় ‘জনস্বার্থের বোঝা’ হিসেবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
তবে নতুন ব্যবস্থায় এই মূল্যায়নের পরিধি আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আবেদনকারীর বর্তমান আর্থিক অবস্থা, সরকারি সুবিধা গ্রহণের ইতিহাস এবং ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার প্রয়োজন হতে পারে কি না—এসব বিষয় অভিবাসন কর্মকর্তাদের বিবেচনায় আসতে পারে।
অর্থাৎ শুধু বর্তমানে কোনো আবেদনকারী সরকারি সহায়তা নিচ্ছেন কি না, সেটিই একমাত্র বিষয় থাকবে না। আবেদনকারীর আয়, সম্পদ, পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যতে নিজের খরচ নিজে বহন করার সক্ষমতাও মূল্যায়নের অংশ হতে পারে।
কোন কোন সরকারি সুবিধা বিবেচনায় আসতে পারে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন ব্যবস্থায় খাদ্য, চিকিৎসা, আবাসন ও শিশুদের বিভিন্ন সহায়তামূলক কর্মসূচির মতো সুবিধাগুলো বিবেচনার আওতায় আসতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে—
খাদ্য সহায়তা;
চিকিৎসা সহায়তা;
শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি;
আবাসন সহায়তা;
শিশুদের যত্নে সরকারি সহায়তা;
শিশুদের শিক্ষা ও পুষ্টি কর্মসূচি।
এ ছাড়া আবেদনকারীর পরিবারের অন্য সদস্যরা সরকারি সুবিধা গ্রহণ করছেন কি না, সেটিও কিছু ক্ষেত্রে বিবেচনায় আসতে পারে। বিশেষ করে যেসব পরিবারে একজন সদস্য যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং অন্য সদস্য গ্রিন কার্ডের আবেদন করছেন, তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে সরকারি কোনো একটি সুবিধা গ্রহণ করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রিন কার্ডের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে—এমন নয়। আবেদনকারীর সামগ্রিক আর্থিক ও পারিবারিক পরিস্থিতি মূল্যায়নের অংশ হিসেবেই বিষয়গুলো বিবেচিত হওয়ার কথা।
২০১৯ সালের নিয়মের সঙ্গে নতুন উদ্যোগের সম্পর্ক
সরকারি সহায়তার ওপর অভিবাসীদের নির্ভরশীলতার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থায় নতুন নয়। ১৯৯৯ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রশাসন ‘জনস্বার্থের বোঝা’ ধারণাটির একটি সীমিত ব্যাখ্যা কার্যকর করেছিল।
সে সময় মূলত নগদ সরকারি সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসার জন্য দেওয়া সহায়তার মতো বিষয় বিবেচনা করা হতো।
এরপর ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে ২০১৯ সালে এই সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তখন খাদ্য, চিকিৎসা ও আবাসনের মতো নগদ নয়—এমন কিছু সরকারি সুবিধাকেও অভিবাসন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বিবেচনায় আনার চেষ্টা করা হয়েছিল।
তবে আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের পর বাইডেন প্রশাসন ওই নিয়ম বাতিল করে ২০২২ সালে নতুন বিধান কার্যকর করে। এবার ট্রাম্প প্রশাসন আবারও সরকারি সহায়তা বিবেচনার পরিধি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষের ওপর প্রভাবের আশঙ্কা
নতুন নিয়মকে ঘিরে অভিবাসী অধিকার সংগঠনগুলোর পাশাপাশি অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের হিসাব অনুসারে, প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার মানুষ ছয় ধরনের সরকারি সুবিধা থেকে সরে যেতে পারেন অথবা নতুন করে এসব সুবিধা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
এর মধ্যে চিকিৎসা, খাদ্য, শিশুদের স্বাস্থ্য কর্মসূচি এবং কেন্দ্রীয় আবাসন সহায়তার মতো সুবিধা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, গ্রিন কার্ডের আবেদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ভয়ে এমন অনেক পরিবারও সরকারি সহায়তা নেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারে, যারা আইনগতভাবে এসব সুবিধা পাওয়ার যোগ্য।
বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, নতুন মা, ছোট শিশু এবং স্কুলপড়ুয়া শিশুদের খাবার ও পুষ্টি সহায়তার মতো কর্মসূচিতে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে অভিবাসী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো দাবি করছে।
৩৭ লাখ অভিবাসী পরিবারের সদস্য প্রভাবিত হতে পারেন
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত নিয়মের কারণে অভিবাসী পরিবারের প্রায় ৩৭ লাখ সদস্য চিকিৎসা, খাদ্য ও আবাসনসহ বিভিন্ন সরকারি সহায়তা হারাতে পারেন।
গবেষণাটিতে আরও বলা হয়েছে, এর ফলে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের অর্থনীতিতে প্রায় ২ হাজার ৭৪০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ প্রায় ২ লাখ ১২ হাজার কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এগুলো গবেষণাভিত্তিক সম্ভাব্য প্রভাবের হিসাব, বাস্তবে কতজন মানুষ সরকারি সুবিধা গ্রহণ থেকে বিরত থাকবেন বা অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ কত হবে, তা নিয়মটি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং আদালতের সিদ্ধান্ত কী হয়—তার ওপর নির্ভর করবে।
নাগরিক পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রেও উদ্বেগ
নতুন ব্যবস্থার সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো—কিছু ক্ষেত্রে আবেদনকারীর পরিবারের সদস্যদের সরকারি সুবিধা গ্রহণও মূল্যায়নের অংশ হতে পারে।
ফলে এমন পরিবার, যেখানে একজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং অন্যজন অভিবাসী হিসেবে গ্রিন কার্ডের আবেদন করছেন, তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো পরিবারের যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক সন্তান যদি সরকারি স্বাস্থ্যসেবা বা খাদ্য সহায়তা পায়, তাহলে সেই সুবিধা অভিবাসী অভিভাবকের গ্রিন কার্ড আবেদনের মূল্যায়নে কোনোভাবে বিবেচিত হবে কি না—এ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে প্রতিটি সরকারি সুবিধা বা পরিবারের সদস্যের সুবিধা গ্রহণের বিষয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেতিবাচক সিদ্ধান্তের কারণ হবে—এমন সরল ব্যাখ্যা নিয়মটির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আবেদনকারীর সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনার বিষয়টিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রযোজ্য নয়
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন নিয়ম মূলত বৈধ অভিবাসন ও গ্রিন কার্ডের আবেদন যাচাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এটি সরাসরি একইভাবে প্রযোজ্য নয়, কারণ তারা সাধারণত সংশ্লিষ্ট সরকারি সুবিধাগুলোর জন্য যোগ্য নন।
তবে বৈধ অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে এর পরোক্ষ প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। সরকারি সহায়তা পাওয়ার যোগ্য হয়েও ভবিষ্যৎ অভিবাসন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার ভয়ে কেউ যদি সুবিধা গ্রহণ বন্ধ করেন, তাহলে পরিবারগুলোর খাদ্য, স্বাস্থ্য ও আবাসন ব্যয়ে চাপ বাড়তে পারে।
২২ অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসির মামলা
নতুন নিয়ম কার্যকর ঠেকাতে নিউইয়র্কের নেতৃত্বে ২২টি অঙ্গরাজ্য ও ওয়াশিংটন ডিসি আদালতে মামলা করেছে। নিউইয়র্ক সিটির নেতৃত্বে একদল শহরও পৃথকভাবে আইনি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।
অঙ্গরাজ্যগুলোর দাবি, নতুন নিয়মের কারণে যোগ্য অভিবাসীরা সরকারি সহায়তা নেওয়া থেকে বিরত থাকলে অঙ্গরাজ্যগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ হারাতে পারে। মিশ্র নাগরিকত্বের পরিবারগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলেও তারা দাবি করেছে।
অন্যদিকে শহরগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিবাসীরা সরকারি স্বাস্থ্য, খাদ্য ও আবাসন সুবিধা নেওয়া থেকে সরে গেলে এসব সেবার ব্যয় স্থানীয় প্রশাসনের ওপর আরও বেশি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। শ্রমবাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মামলাকারীদের পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে।
আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে নজর
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিউইয়র্কের করা মামলার প্রাথমিক শুনানি ৯ অক্টোবর নির্ধারিত হয়েছে। আদালত থেকে নিয়মটি স্থগিত করা না হলে শুক্রবার থেকে এটি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
ফলে গ্রিন কার্ডের আবেদনকারী, অভিবাসী পরিবার, অঙ্গরাজ্য সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসন—সব পক্ষের নজর এখন আদালতের দিকে। নিয়মটি কার্যকর হলে সরকারি সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি গ্রিন কার্ডের আবেদন মূল্যায়নে কতটা এবং কীভাবে প্রভাব ফেলবে, সেটিও তখন আরও স্পষ্ট হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে ‘জনস্বার্থের বোঝা’ নীতির মাধ্যমে অভিবাসীদের আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নের সুযোগ থাকলেও নতুন উদ্যোগে সরকারি সুবিধা গ্রহণ ও ভবিষ্যৎ নির্ভরতার বিষয়টি আরও বিস্তৃতভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে এর আইনি ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে বিতর্কও বাড়ছে।

