আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির পাঠদান শুরু হওয়ার কথা। নতুন শিক্ষাবর্ষকে সামনে রেখে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) অনুমোদিত বিভিন্ন পাঠ্যবই ইতোমধ্যে প্রকাশ ও সারা দেশের বইয়ের বাজারে সরবরাহ শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই রাজধানীর হাজারীবাগে নামবিহীন একটি ছাপাখানায় অনুমোদিত পাঠ্যবইয়ের নকল সংস্করণ ছাপা ও বাঁধাইয়ের অভিযোগ উঠেছে।
প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি চক্র বেনামি বা অননুমোদিত ছাপাখানা ব্যবহার করে এনসিটিবির অনুমোদিত পাঠ্যবইয়ের নকল সংস্করণ তৈরি করে বাজারজাত করছে। এতে একদিকে বৈধ প্রকাশকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা নকল বই কিনে প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে বলে দাবি তাদের।
সম্প্রতি রাজধানীর হাজারীবাগের ঝাউচর গুদারাঘাট সংলগ্ন পানির ফ্যাক্টরির গলিতে এমন একটি ছাপাখানায় নকল বই ছাপার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার ঘটনাও ঘটেছে বলে প্রকাশনা সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
হাজারীবাগে নকল বই ছাপার অভিযোগ
প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে ঝাউচর গুদারাঘাট সংলগ্ন পানির ফ্যাক্টরির গলিতে একটি নামবিহীন ছাপাখানায় এনসিটিবির অনুমোদিত পাঠ্যবই ছাপা ও বাঁধাইয়ের কাজ চলছিল বলে খবর পাওয়া যায়। তারা ওই ছাপাখানার মালিক হিসেবে মানিক মিয়া নামে এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছেন।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নকল বই ছাপা ও বাঁধাইয়ের অভিযোগ পাওয়ার পর হাজারীবাগ থানার এসআই আশরাফসহ বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সেখানে উপস্থিত হন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
তাদের ভাষ্য, ঘটনাস্থলে বিপুল পরিমাণ ছাপার ফর্মা এবং বাঁধাইয়ের জন্য প্রস্তুত বইয়ের কাভার পাওয়া যায়। এসব ফর্মার মধ্যে অক্ষরপত্র প্রকাশনীর ‘বাংলা ব্যাকরণ ও নির্মিতি’ এবং হাসান বুক হাউজের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানসহ বিভিন্ন অনুমোদিত বইয়ের ফর্মা ছিল বলে তারা দাবি করেন।
তবে এসব বই কী পরিমাণে ছাপা হয়েছিল, কতগুলো বই বাজারজাত করা হয়েছে কিংবা ঘটনাস্থল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কতটি বই বা ফর্মা জব্দ করা হয়েছে—সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
জব্দ কার্যক্রমে বাধার অভিযোগ
প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, পুলিশ ঘটনাস্থলে যাওয়ার পর বই ও ছাপার ফর্মার জব্দ তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হলে ফয়সাল ও মাসুদ রানা নামে দুজনের নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি দল সেখানে উপস্থিত হয়।
তাদের দাবি, ওই ব্যক্তিরা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে মারমুখী অবস্থান নেন। এমনকি নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরে পুলিশ ও প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের আরও অভিযোগ, মাসুদ রানা ও তার সহযোগীরা পুলিশকে বই জব্দে বাধা দেন এবং হাসান বুক হাউজের দুজন প্রতিনিধির ওপর হামলা চালান। তাদের বাধার কারণে পুলিশ জব্দ কার্যক্রম শেষ না করেই ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন মাসুদ রানা।
‘অনুমোদিত বই ছাপার ঘটনা ঘটেনি’
অভিযোগের বিষয়ে মাসুদ রানা বলেন, হাজারীবাগে কোনো নামবিহীন প্রেসে অনুমোদিত পাঠ্যবই ছাপার ঘটনা ঘটেনি। তার দাবি, একটি বাইন্ডিং দোকানকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিল। খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান।
মাসুদের ভাষ্য, সেখানে গিয়ে তিনি হট্টগোল দেখতে পান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে এবং দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি মীমাংসা করা হয়।
তিনি বলেন, “এখানে কোনো প্রেস বা বই নিয়ে ঝামেলা ছিল না। একটা ভ্যানের মালামাল ও বাইন্ডিং নিয়ে কথা-কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি হয়েছিল। আমাদের কর্মীরা ফোন দেওয়ায় আমরা সেখানে যাই। গিয়ে দেখি হট্টগোল হচ্ছে। পরে পুলিশসহ দুই পক্ষের সমন্বয়ে বিষয়টি মীমাংসা হয়।”
পুলিশকে বই জব্দে বাধা দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি।
মাসুদ বলেন, “পুলিশকে আমরা বাধা দিয়েছি, এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। সেখানে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। আমরা এমন কোনো পাওয়ারফুল এমপি-মন্ত্রীও নই যে এতজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধা দেব।”
হাসান বুক হাউজের প্রতিনিধিদের ওপর হামলা এবং অনুমোদিত বইয়ের নকল সংস্করণ বাঁধাইয়ের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও দাবি করেন তিনি।
রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও পাল্টাপাল্টি দাবি
প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মাসুদ রানা ও তার এক সহযোগী আগের সরকারের সময়ও একই ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন এবং বর্তমানে তারা নিজেদের বিএনপির কর্মী হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।
তবে মাসুদ রানা এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, বিএনপির নেতাকর্মীদের সুনাম ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে এমন অভিযোগ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “উনারা অনেক কিছু স্বপ্ন দেখেন, অনেক কিছু বলেন। আওয়ামী লীগের ১৭ বছরে আওয়ামী লীগের লোকজনকে দিয়ে তারা বিভিন্ন ঘটনা ঘটিয়েছে। এখন বিএনপির লোকজনের সুনাম নষ্ট করার জন্য এ ধরনের কথা বলা হচ্ছে। এটা ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে।”
পুলিশের বক্তব্য কী
হাজারীবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ১৫ সেপ্টেম্বর অনুমোদিত পাঠ্যবই নকল করার অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের একটি টিম ঘটনাস্থলে গিয়েছিল।
তার ভাষ্য, ঘটনাস্থলে কয়েকটি প্রকাশনীর বই পাওয়া যায়। তবে সেখানে থাকা দুই পক্ষের মধ্যে পরে সমঝোতা হওয়ায় পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চলে আসে।
ওসি বলেন, “পুলিশ সেখানে যাওয়ার পর বাদীপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা হয়। দুপক্ষ মিউচুয়ালি বিষয়টি মীমাংসা করে নেওয়ায় পুলিশ সেখান থেকে চলে আসে।”
তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থলে কয়েকটি প্রকাশনীর বই ছিল। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
নকল বইয়ের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুমোদিত পাঠ্যবইয়ের নকল সংস্করণ বাজারে ছড়িয়ে পড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন শিক্ষার্থী ও বৈধ প্রকাশকরা। অনুমোদিত বই মনে করে শিক্ষার্থীরা নকল সংস্করণ কিনলে তারা প্রকৃত বইয়ের পরিবর্তে নিম্নমানের বা অনুমোদনবহির্ভূত সংস্করণ পেতে পারেন।
প্রকাশকদের অভিযোগ, বৈধভাবে বই প্রকাশের ক্ষেত্রে মুদ্রণ, সম্পাদনা, কাগজ, বাঁধাই, পরিবহন ও বিপণনসহ নানা খরচ বহন করতে হয়। পাশাপাশি সরকারি বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট রাজস্বও দিতে হয়। অন্যদিকে নকল বই প্রস্তুতকারীরা অনুমোদিত বইয়ের কাঠামো ও বিষয়বস্তু অনুকরণ করে তুলনামূলক কম খরচে বই তৈরি করতে পারে। ফলে বৈধ প্রকাশকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন।
তাদের দাবি, নকল বইয়ের ব্যবসা বন্ধ করা না গেলে শুধু প্রকাশনা খাত নয়, শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রকাশকদের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি
প্রকাশনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এনসিটিবির অনুমোদিত বইয়ের নকল ঠেকাতে অনুমোদিত প্রকাশক, বই বিক্রেতা, মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন।
তাদের মতে, নকল বইয়ের উৎস চিহ্নিত করার পাশাপাশি কোথায় এসব বই ছাপা হচ্ছে, কারা ছাপার সঙ্গে জড়িত এবং কোন পথে সেগুলো বাজারে যাচ্ছে—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অবৈধ ছাপাখানায় অনুমোদিত পাঠ্যবই ছাপার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন প্রকাশকরা।
হাজারীবাগের ওই নামবিহীন ছাপাখানার মালিক হিসেবে প্রকাশনা সংশ্লিষ্টরা যে মানিক মিয়ার নাম উল্লেখ করেছেন, তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে মুঠোফোনে বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার নিজস্ব বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
সামনে উচ্চমাধ্যমিকের নতুন শিক্ষাবর্ষ
আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির পাঠদান শুরুর কথা থাকায় এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন শিক্ষাবর্ষের বই সংগ্রহের তৎপরতা শুরু হয়েছে। এমন সময়ে অনুমোদিত পাঠ্যবইয়ের নকল সংস্করণ বাজারে ঢুকে পড়ার অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকাশকদের প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীদের স্বার্থে অনুমোদিত বইয়ের নকল সংস্করণ উৎপাদন ও বাজারজাতের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নকল বইয়ের উৎস ও এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে—এমনটাই দাবি তাদের।

