ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

৩০ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলায় পৌঁছাবে শতভাগ পাঠ্যবই

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ১১:১৯ এএম

৩০ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলায় পৌঁছাবে শতভাগ পাঠ্যবই

ছবিঃ সংগৃহীত

২০২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই দেশের প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থীর হাতে পরিমার্জিত ও মানসম্মত পাঠ্যবই পৌঁছে দিতে চায় সরকার। এ লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় শতভাগ বই সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি সূত্র জানিয়েছে, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার ছাপাখানায় প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, ইবতেদায়ী, মাধ্যমিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তরের বই মুদ্রণের কাজ চলছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই ছাপানো ও সরবরাহ শেষ করার পাশাপাশি এবার বইয়ের কাগজ, ছাপার মান ও বাঁধাইয়ের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি করা হচ্ছে।

এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির পাশাপাশি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে মোট ৫৩টি মনিটরিং টিম মাঠে কাজ করছে। এনসিটিবির দাবি, মানদণ্ড পূরণ না করায় ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রেসের প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ছাপানো ফর্মা এবং ২৭ হাজার নিম্নমানের বই বাতিল ও বিনষ্ট করা হয়েছে।

৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব উপজেলায় বই পৌঁছানোর লক্ষ্য

এনসিটিবির উৎপাদন ও বিতরণ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বই আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাক-প্রাথমিক স্তরের বইয়ের মুদ্রণ ইতোমধ্যে প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

এনসিটিবির বিতরণ শাখার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশের কয়েকটি উপজেলায় এরই মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের বই সরবরাহ শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য স্তরের বইও সংশ্লিষ্ট উপজেলায় পাঠানো হবে।

তবে ইংরেজি ভার্সন ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ বই জেলা পর্যায়ে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে এনসিটিবি।

৩০ কোটি ৭১ লাখের বেশি বই ছাপানোর পরিকল্পনা

এনসিটিবির ২২ সেপ্টেম্বরের উৎপাদন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে প্রাথমিক, ইবতেদায়ী, মাধ্যমিক, দাখিল, ভোকেশনাল ও কারিগরি স্তর মিলিয়ে মোট ৩০ কোটি ৭১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি পাঠ্যবই ছাপানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

এর মধ্যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বইও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

এবার গত বছরের তুলনায় প্রায় এক মাস আগে বই ছাপানোর কাজ শুরু হয়েছে। দেশের বিভিন্ন ছাপাখানায় বর্তমানে এসব বইয়ের মুদ্রণ কার্যক্রম পুরোদমে চলছে।

কোন স্তরে কত বই ছাপা হয়েছে

এনসিটিবির সর্বশেষ উৎপাদন চিত্র অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিক স্তরে মোট ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ৬৪০টি বই ছাপানোর লক্ষ্যের বিপরীতে ইতোমধ্যে ৪২ লাখ ৬৬ হাজার ২৫৩টি, অর্থাৎ ৭৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে।

প্রাথমিক স্তরে মোট ৭ কোটি ৬০ লাখ ৯৭ হাজার ৯৬টি বইয়ের মধ্যে ২ কোটি ৮০ লাখ ৭৮ হাজার ৯৯৬টি, অর্থাৎ ৩৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ বই মুদ্রণ শেষ হয়েছে।

অন্যদিকে মাধ্যমিক স্তরে মোট ২২ কোটি ১১ লাখ ৮২ হাজার ৫৯২টি বইয়ের মধ্যে ১ কোটি ৫২ লাখ ৬৪ হাজার ৪০০টি, অর্থাৎ ৭ শতাংশ বই ছাপা হয়েছে।

মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের সংখ্যা বেশি হওয়ায় এ পর্যায়ের মুদ্রণ কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে চলবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

৯১ প্রেসে চলছে মুদ্রণ

এনসিটিবি জানিয়েছে, সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ মোট ১১৩টি ছাপাখানার মধ্যে বর্তমানে ৯১টি প্রেসে পাঠ্যবই মুদ্রণের কাজ চলছে।

মুদ্রণ কার্যক্রম যাতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ব্যাহত না হয়, সে জন্য বড় ছাপাখানাগুলোতে জেনারেটর ব্যাকআপ রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব প্রতিষ্ঠানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কাগজ ও ছাপার মান যাচাইয়ে ল্যাব টেস্ট

নতুন পাঠ্যবইয়ের কাগজের গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবার মুদ্রণের পাশাপাশি ল্যাব পরীক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এনসিটিবির তথ্যমতে, বইয়ের কাগজের উজ্জ্বলতা ৮৫ শতাংশসহ নির্ধারিত মান নিশ্চিত করতে প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) এজেন্সির মাধ্যমে পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রেস থেকে র‌্যান্ডম ভিত্তিতে কাগজের নমুনা সংগ্রহ করে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদে (বিসিএসআইআর) পরীক্ষা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি নয়টি প্রেসের কাগজের নমুনা বিসিএসআইআরে পরীক্ষা করা হয়েছে। এনসিটিবির দাবি, পরীক্ষিত সব নমুনাই নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেছে।

নিম্নমানের সাড়ে ৪ লাখ ফর্মা ও ২৭ হাজার বই বাতিল

মান নিয়ন্ত্রণে এবার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে এনসিটিবি। সংস্থাটির হিসাবে, নির্ধারিত মান পূরণ না করায় বিভিন্ন প্রেসে ছাপানো প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ফর্মা এবং ২৭ হাজার নিম্নমানের বই ইতোমধ্যে বাতিল ও বিনষ্ট করা হয়েছে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান প্রফেসর মোহাম্মাদ গোলাম ফখরুল মাওলা রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, বইয়ের মানের বিষয়ে এবার সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শতভাগ মানসম্মত ও নিখুঁত পাঠ্যবই উপজেলায় পৌঁছাতে মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি কাজ করছে।

৫৩ মনিটরিং টিমের নজরদারি

বই মুদ্রণ ও সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়ায় নজরদারি বাড়াতে মোট ৫৩টি মনিটরিং টিম মাঠে কাজ করছে বলে জানিয়েছে এনসিটিবি।

এর মধ্যে এনসিটিবির নিজস্ব ৩৩টি মনিটরিং টিম এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৭টি টিম ছাপাখানাগুলোতে নজরদারি করছে। পাশাপাশি এনসিটিবির সচিব ও সদস্যদের নেতৃত্বে ৫টি বিশেষ টিম মাঠপর্যায়ে সরাসরি কাজ করছে।

মনিটরিং কর্মকর্তারা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন প্রেসে অবস্থান করে মুদ্রণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করছেন বলে এনসিটিবি জানিয়েছে।

বই গ্রহণের সময়ও মান যাচাই

এবার শুধু ছাপাখানায় বইয়ের মান যাচাই করেই দায়িত্ব শেষ করতে চায় না এনসিটিবি। মাঠপর্যায়ে বই গ্রহণের সময়ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সরাসরি মান যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যানের ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে প্রেস ও মাঠপর্যায়ে অসাধু চক্রের আঁতাতের সুযোগ থাকলেও এবার বই গ্রহণের সময় জেলা ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের ওপর সরাসরি মান যাচাইয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

রিসিভ করার পরও বইয়ের মান নিয়ে কোনো ধরনের বিচ্যুতি পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট গ্রহীতা কর্মকর্তাকেও শাস্তির আওতায় আনার কথা জানিয়েছে এনসিটিবি।

‘নিম্নমানের বই বরদাশত করা হবে না’

শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বাসসকে বলেন, উপজেলা পর্যায়ে বই সরবরাহের ক্ষেত্রে নিম্নমানের কাগজের বই কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না।

তিনি বলেন, বাজারদর যাচাই করে এবার যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে কম মূল্যের অজুহাতে কোনো মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের বই তৈরির সুযোগ না পায়। নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত বই সরবরাহে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বা কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

বছরের প্রথম দিনেই পুরো সেট বই দেওয়ার লক্ষ্য

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) প্রফেসর মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বাসসকে বলেন, শিক্ষার্থীদের হাতে যথাসময়ে বই পৌঁছে দিতে রোডম্যাপ অনুযায়ী কাজ চলছে। প্রেস মালিকদের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে বই সরবরাহ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তার ভাষ্য, মাঠে নিয়োজিত মনিটরিং টিমগুলো প্রতিদিন প্রেসে অবস্থান করে মুদ্রণ কার্যক্রম তদারকি করছে। মূল লক্ষ্য হচ্ছে—নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীরা যেন নতুন শ্রেণির পুরো সেট বই হাতে পায়।

সময়ের আগেই বই পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ

প্রায় ৩১ কোটি কপি বই ছাপানো, মান যাচাই, পরিবহন ও দেশের সব উপজেলায় পৌঁছে দেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি বড় ধরনের সমন্বয়ের বিষয়। বিশেষ করে মাধ্যমিকসহ বড় পরিসরের বইয়ের মুদ্রণ এখনো চলমান থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপাদন শেষ করার পাশাপাশি পরিবহন ও মাঠপর্যায়ে গ্রহণের কাজও সমান্তরালে এগিয়ে নিতে হবে।

এনসিটিবি বলছে, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে বই পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ চলছে। একই সঙ্গে নিম্নমানের বই যাতে কোনোভাবেই শিক্ষার্থীদের হাতে না যায়, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

ফলে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীদের হাতে মানসম্মত ও পরিমার্জিত পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে এখন মুদ্রণ থেকে বিতরণ—প্রতিটি ধাপেই সময় ও মান—দুই বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!