সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া বলে দাবি করা মরিয়ম খাতুনের হাতে লেখা কয়েকটি চিঠিতে স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, ভালোবাসা, বিশ্বাসভঙ্গ ও মানসিক কষ্টের নানা কথা উঠে এসেছে। চিঠিগুলোতে সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে হতাশার পাশাপাশি নিজেকে প্রতারিত ও দাবার গুটি হিসেবে মনে হওয়ার অনুভূতিও প্রকাশ করেছেন লেখক।
চিঠির ভাষ্য অনুযায়ী, গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে সম্পর্ককে ঘিরে একদিকে গভীর ভালোবাসা ও বিশ্বাসের কথা থাকলেও অন্যদিকে প্রতারণা, আস্থাভঙ্গ এবং সম্পর্কের অনিশ্চয়তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে এসব চিঠিতে থাকা বক্তব্যের সত্যতা ও প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। চিঠিগুলো আসলেই মরিয়ম খাতুনের লেখা কি না এবং এগুলো কোন পরিস্থিতিতে লেখা হয়েছিল, তা তদন্তের বিষয়।

‘তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলের সেনাপতি’
চিঠির একটি অংশে সম্পর্ককে যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করে নিজের হতাশার কথা লিখেছেন লেখক। সেখানে বলা হয়েছে—
‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, কিন্তু জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবোই বা কেমনে যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে দেখি তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলের সেনাপতি।’
আরেকটি জায়গায় লেখা হয়েছে, ‘আমি হেরেছি—তুমি জিতেছো’। এসব বক্তব্যে সম্পর্কের মধ্যে বিশ্বাস ও প্রত্যাশা ভেঙে যাওয়ার গভীর হতাশার প্রতিফলন রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

‘অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ’
চিঠির আরেকটি পাতায় নিজের অবস্থান ও ভালোবাসার টানাপোড়েনের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে লেখক লিখেছেন—
‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী—কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ-এর। আর আমি ছিলাম বোকা...!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ...!!! কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের কারণ... ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়... ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!’
এই অংশে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পূর্ণ অধিকারের আকাঙ্ক্ষা এবং অন্য কারও সঙ্গে ভালোবাসা ভাগ করে নেওয়ার প্রতি অনীহার কথা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

‘আমিই ছিলাম তোমার গেমসের দাবার এক গুটি’
চিঠির আরেকটি অংশে বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে লেখা—
‘সে বলেছিল—আজ থেকে আমরা বন্ধু—চলো একটা গেমস খেলি। আমিও সরল মনে বিশ্বাস করে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু কে জানতো—আমিই ছিলাম তোমার গেমসের দাবার এক গুটি।’
এই বক্তব্যে সম্পর্কের শুরুতে বিশ্বাস ও সরলতার কথা উল্লেখ করে পরবর্তী সময়ে নিজেকে ব্যবহৃত বা প্রতারিত মনে হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন লেখক।
‘ততটা সস্তা আমি নই’
চিঠির বিভিন্ন অংশে আত্মসম্মান ও নিজের অবস্থান নিয়েও দৃঢ় বক্তব্য রয়েছে। ‘ততটা সস্তা আমি নই’—এমন বাক্যের মাধ্যমে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও নিজের মর্যাদা ধরে রাখার প্রত্যয়ের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
চিঠিগুলোর ভাষায় একই সঙ্গে ভালোবাসা, অভিমান, ক্ষোভ, হতাশা ও আত্মমর্যাদাবোধের বিষয়গুলো উঠে এসেছে।
সংসদীয় প্যাডে লেখা চিঠিতে ক্ষোভ
জাতীয় সংসদের প্যাডে লেখা বলে উল্লেখ করা আরেকটি পাতায় সম্পর্কের পরিণতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে—
‘আমি হেরেছি—তুমি জিতেছো—কারণ, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো। আমি, শৃঙ্গের শেষ বাড়িয়ে ও হাসতে হাসতে মুখে হাসি রেখেছি—দেখে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’
এই বক্তব্যে বিশ্বাসভঙ্গের পরিণতি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে ‘ধ্বংস’ শব্দটি কোন অর্থে এবং কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হয়েছে, তা চিঠির বাইরে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

মৃত্যুর ঘটনার তদন্তে চিঠিগুলোর গুরুত্ব কতটা?
মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মরিয়মের বাবা বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
ঘটনার পর সংসদ সদস্য ও তার প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। মরিয়মের মরদেহ রাজধানীর ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এই অবস্থায় বাসা থেকে উদ্ধার হওয়া বলে দাবি করা হাতে লেখা চিঠিগুলো তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য দেয় কি না, তা নির্ভর করবে চিঠির সত্যতা, লেখার সময়কাল, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং অন্যান্য আলামতের সঙ্গে এর সামঞ্জস্যের ওপর।
মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং কারও বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

