স্কুলে যাওয়ার বয়সে কারও হাতে উঠছে চাপাতি, কেউ জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাইয়ে, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতার ভিডিও ছড়িয়ে দেখাচ্ছে ‘দাপট’। টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার প্রতিযোগিতা, বড় ভাইদের অনুসরণ, মাদক, অনিয়ন্ত্রিত আড্ডা, এলাকার আধিপত্য বিস্তার এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব—বিভিন্ন কারণে কিশোরদের একটি অংশ ধীরে ধীরে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।
এর বিপরীতে একই বয়সী অনেক কিশোর-কিশোরী আবার এসব অপরাধের শিকারও হচ্ছে। ফলে কিশোর অপরাধের পাশাপাশি কিশোরদের নিরাপত্তা নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে।
আইফোনের জন্য প্রাণ গেল স্কুলছাত্র অপ্রতিমের
কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যু কিশোর অপরাধের ভয়াবহতার একটি মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে।
সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতিম গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল। কিন্তু এরপর আর বাড়ি ফেরেনি। দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজির পর প্রায় ২১ ঘণ্টা পরে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর পুলিশ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। তাদের মধ্যে একজনের বয়স ১৫ বছর বলে জানিয়েছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করার সময় অপ্রতিম বাধা দিলে তার ওপর হামলা চালানো হয়। পরে তাকে হত্যা করে মরদেহ নির্জন স্থানে ফেলে রাখা হয়।
অপ্রতিমের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি নয়; একই সঙ্গে কিশোর বয়সে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এবং কিশোরদের অপরাধের শিকার হওয়ার বাস্তবতাও সামনে এনেছে।
ছিনতাই থেকে আধিপত্য—বদলে যাচ্ছে কিশোর অপরাধের ধরন
সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, কিশোরদের একটি অংশ ছোটখাটো মারামারি বা বখাটেপনা থেকে ধীরে ধীরে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র বহন এবং সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
রাজধানীর পল্লবীতে কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এক সাংবাদিকের বাসায় হামলা ও গুলির ঘটনায় ওই গ্রুপের এক সদস্যকে গ্রেফতারের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
কেরানীগঞ্জে মো. ফরহাদ হোসেন (২৫) নামে এক যুবককে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার ঘটনায় পুলিশ জানিয়েছে, তিনি মোহাম্মদপুর-রায়েরবাজার এলাকার কিশোর গ্যাং ‘পাটালী গ্রুপের’ সদস্য ছিলেন।
এ ছাড়া গত ১৮ সেপ্টেম্বর যশোরে নারীদের হয়রানির প্রতিবাদ করায় এক তরুণীকে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত করার অভিযোগ ওঠে একদল তরুণের বিরুদ্ধে।
জুলাইয়ে রাজশাহীতে এক রিকশাচালককে মারধর ও টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ছয়জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। নওগাঁয় কিশোর গ্যাংয়ে যোগ দিতে রাজি না হওয়ায় ভয় দেখিয়ে গুলি করার অভিযোগে দুজনকে গ্রেফতারের ঘটনাও ঘটেছে।
এসব ঘটনা কিশোরদের একটি অংশের মধ্যে সহিংসতা ও অপরাধপ্রবণতার বিস্তার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
‘আড্ডা’ থেকে অপরাধের পথে
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরীর মতে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, খেলাধুলা ও সময় কাটানো কিশোর বয়সের স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সেই বন্ধুত্ব যদি এলাকার আধিপত্য, বড় ভাইয়ের নির্দেশ, মাদক, অস্ত্র কিংবা অপরাধী দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তখন তা অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, মারামারি ও যৌন হয়রানির মতো অপরাধের সংশ্লিষ্টতার তথ্য এসেছে।
তার মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এই প্রবণতাকে কখনো কখনো দৃশ্যমান করে তুলছে। অপরাধ বা মারামারির ভিডিও ধারণ করে টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে কেউ কেউ সহিংসতাকে জনপ্রিয়তা বা ‘দাপট’ দেখানোর উপায় হিসেবে উপস্থাপন করছে।
স্মার্টফোন কি অপরাধের নতুন দরজা?
শিক্ষাবিদদের মতে, স্মার্টফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিজে অপরাধের কারণ নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন শিশু-কিশোররা অনলাইনে কী দেখছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, কোন গ্রুপ বা প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছে এবং কী ধরনের কনটেন্টে প্রভাবিত হচ্ছে—এসব বিষয়ে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজর থাকে না।
অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতারণা, হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও নিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং এবং বিভিন্ন ধরনের অনলাইন অপরাধের ঝুঁকিতেও কিশোররা পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সন্তানকে স্মার্টফোন দেওয়া বা নিষেধ করাই সমাধান নয়। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে বয়স উপযোগী নির্দেশনা, পারিবারিক যোগাযোগ এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা প্রয়োজন।
‘প্রযুক্তি যেন সন্তানকে ব্যবহার না করে’
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, কিশোরদের একতরফাভাবে দোষারোপ করলে সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করা যাবে না। পরিবারকেও বিষয়টি বুঝতে হবে এবং প্রয়োজন হলে কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনতে হবে।
তার ভাষায়, নতুন মধ্যবিত্ত সমাজের অভিভাবকদের শুধু সচেতন করলেই হবে না, কাউন্সেলিংও দরকার। একটি সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। প্রযুক্তির যুগে সন্তানরা যেন প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে পারে, প্রযুক্তি যেন তাদের ব্যবহার না করে—সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, কোনো শিশু মোটরসাইকেলে ঘুরছে বা বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে—এ ধরনের বিষয়কে কেন্দ্র করে শুধু শিশুকেই দায়ী করা ঠিক নয়। বরং কেন সে এমন পরিবেশে যাচ্ছে এবং পরিবার কীভাবে তাকে নিরাপদ রাখতে পারে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
স্কুলের দায়িত্বও কম নয়
কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকার কথাও সামনে এসেছে। শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হকের মতে, একজন শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাসে যাচ্ছে কি না বা পরীক্ষায় কত নম্বর পাচ্ছে—এ দুটির মধ্যেই শিক্ষকের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়।
শিক্ষার্থীর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন এসেছে কি না, নতুন কোনো বন্ধুবৃত্তে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে কি না, স্কুলে মারামারি বা ভয় দেখানোর ঘটনায় যুক্ত হচ্ছে কি না—এসব বিষয়েও শিক্ষকদের নজর রাখা প্রয়োজন।
তার মতে, স্কুলে কাউন্সেলিং, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ বাড়ানো দরকার। কারণ এসব সুযোগ কমে গেলে কিশোরদের অবসর সময়ের একটি অংশ অনলাইন কিংবা অনিয়ন্ত্রিত আড্ডায় চলে যেতে পারে।
শুধু শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীকে আগেই শনাক্ত করে তাকে স্বাভাবিক সামাজিক ও শিক্ষাজীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
সন্তানের আচরণে পরিবর্তন দেখলে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ
অভিভাবকদের জন্যও কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সন্তানের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অস্বাভাবিকভাবে গোপনীয়তা বাড়ানো, নতুন ও অপরিচিত বন্ধুবৃত্ত তৈরি, রাত করে বাড়ি ফেরা, অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন, পড়াশোনায় অনীহা কিংবা অনলাইনে অস্বাভাবিক সময় কাটানো—এসব পরিবর্তনকে অবহেলা না করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে নজরদারির নামে অতিরিক্ত শাসন বা কেবল ফোন কেড়ে নেওয়াকে সমাধান হিসেবে দেখছেন না তারা। বরং সন্তান যেন কোনো সমস্যায় পড়লে ভয় না পেয়ে বাবা-মায়ের কাছে বিষয়টি বলতে পারে, সে ধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অভিভাবক-শিক্ষক সম্পর্কও জরুরি
শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের যেমন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন, তেমনি শিক্ষকদের সঙ্গেও শিক্ষার্থীর ভালো যোগাযোগ থাকা দরকার।
তার মতে, শিশুর পড়াশোনার অগ্রগতি, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ, নৈতিকতা ও মূল্যবোধ গঠন—সব ক্ষেত্রেই পরিবার ও বিদ্যালয়ের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের আচরণগত পরিবর্তনের দিকে নজর রাখতে হবে।
শুধু অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ
কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান চললেও বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গ্রেফতার করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরীর মতে, কিশোরটি কেন অপরাধে জড়াচ্ছে, কারা তাকে ব্যবহার করছে, মাদক বা অস্ত্র কোথা থেকে আসছে—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
অন্যদিকে শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বলেন, কিশোরদের ব্যবহার করে যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে, তাদের শনাক্ত করাও জরুরি। পাশাপাশি খেলাধুলা, সংস্কৃতি, কাউন্সেলিং এবং নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ তৈরির সুযোগ বাড়াতে হবে।
কিশোরদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে স্পষ্ট, কিশোর অপরাধ একটি একক পরিবারের সমস্যা নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় সামাজিক নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান—সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
একদিকে অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের আইনি কাঠামোর মধ্যে এনে সংশোধন ও পুনর্বাসনের সুযোগ তৈরি করতে হবে; অন্যদিকে যারা কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
কারণ কিশোর বয়স ভবিষ্যৎ গড়ার সময়। এই বয়সে একজন শিশুর হাতে বই, খেলাধুলার সরঞ্জাম ও সৃজনশীলতার সুযোগ থাকবে, নাকি অস্ত্র, মাদক ও অপরাধের হাতছানি—তা অনেকাংশেই নির্ভর করে পরিবার, বিদ্যালয় ও সমাজ তার জন্য কী ধরনের পরিবেশ তৈরি করতে পারছে তার ওপর।
কুমিল্লার অপ্রতিমের মতো আর কোনো শিশুকে যেন অপরাধের বলি হতে না হয় এবং কোনো কিশোর যেন অপরাধী চক্রের হাতিয়ার হয়ে না ওঠে—এ জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, পারিবারিক বন্ধন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নজরদারি, মানসিক সহায়তা এবং আইন প্রয়োগের পাশাপাশি নিরাপদ সামাজিক পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ জরুরি।

