রাজধানীর কোনো এলাকায় তারা ‘বড় ভাইয়ের’ অনুসারী, কোথাও মাদক কারবারের বাহক, আবার কোথাও চাঁদাবাজি ও দখলবাজির সামনের সারির কর্মী। বয়স কম হওয়ায় গ্রেফতার হলেও অনেক ক্ষেত্রেই শিশু আইন অনুযায়ী বিশেষ সুরক্ষা পায় তারা। ধারালো অস্ত্র, এমনকি আগ্নেয়াস্ত্রসহ আটক হয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে গেলেও জামিন বা মুক্তির পর আবারও ফিরে আসে পুরোনো এলাকায়। বদলে যায় শুধু গ্যাংয়ের নাম কিংবা রাজনৈতিক আনুগত্য; বদলায় না অপরাধের ধরন। বরং সময়ের সঙ্গে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে তারা। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠছে—কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টানবে কে?
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানায় বর্তমানে অন্তত ১১৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। সবচেয়ে বেশি ৩২টি গ্যাং রয়েছে মিরপুর বিভাগের সাত থানায়, যার মধ্যে শুধু পল্লবী থানাতেই রয়েছে ১৪টি। তেজগাঁও বিভাগের ছয় থানায় রয়েছে ২৬টি গ্যাং, যার মধ্যে মোহাম্মদপুরেই সক্রিয় ১৬টি। এছাড়া রমনা বিভাগে ৬টি, লালবাগে ১০টি, ওয়ারীতে ১৩টি, মতিঝিলে ১০টি, গুলশানে ১১টি এবং উত্তরা বিভাগে ১০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে।
তবে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হিসাবে সক্রিয় গ্যাংয়ের সংখ্যা ১০০-এর নিচে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তালিকা তৈরির পদ্ধতি ও সংজ্ঞাগত পার্থক্যের কারণে এ ভিন্নতা দেখা যায়। অনেক গ্যাং ভেঙে নতুন নামে সংগঠিত হয়, আবার একই সদস্য একাধিক গ্রুপের সঙ্গেও যুক্ত থাকে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, প্রতিটি গ্যাংয়ে সাধারণত ৭ থেকে ২০ জন সদস্য থাকে, যাদের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, ভাড়াটে হামলা, জমি দখল, অস্ত্রের মহড়া থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে এসব কিশোর। দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি কোনো কোনো চক্রের হাতে আগ্নেয়াস্ত্রও পাওয়া যাচ্ছে।
পালাবদলের সঙ্গে বদলেছে ‘বড় ভাই’
সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংগুলোর নেতৃত্ব, আনুগত্য ও পৃষ্ঠপোষকতায় পরিবর্তন এসেছে। আগে স্থানীয় কাউন্সিলর, ছাত্রসংগঠনের নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত অনেক গ্রুপ এখন নতুন নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছে। কেউ দলবদল করেছে, কেউ নতুন নেতৃত্বের অধীনে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে।
ক্ষমতার পরিবর্তনের সুযোগে কোথাও পুরোনো গ্যাং নতুন নামে ফিরেছে, কোথাও আবার ভেঙে তৈরি হয়েছে নতুন চক্র। বাজার, বাসস্ট্যান্ড, ফুটপাত, পার্কিং, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, ময়লা ব্যবস্থাপনা, ছোট টেন্ডার এবং জমি দখলের মতো খাতে আধিপত্য বজায় রাখতে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো, হামলা, চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনেও তাদের কাজে লাগানো হচ্ছে।
মোহাম্মদপুরে এলেক্স গ্রুপ, ইমন গ্রুপ, শুটার আনোয়ার গ্রুপ, কব্জি কাটা গ্রুপ, আকাশ গ্রুপ, ‘দ্য কিং অব লও ঠেলা’ ও ডায়মন্ড গ্রুপসহ বিভিন্ন নামে কিশোর গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে।
‘অপরাধী হয়ে জন্মায় না, তৈরি করা হয়’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বলেন, সমাজে ‘মাসল পাওয়ার’-নির্ভর একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এলাকা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে। তার ভাষায়, ‘কোনও কিশোর জন্মগতভাবে অপরাধী নয়; সামাজিক, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাকে অপরাধে জড়িয়ে ফেলা হয়।’
তিনি বলেন, শুরুতে কিশোরদের দিয়ে মাদক বহন, তথ্য সংগ্রহ, এলাকায় মহড়া, চাঁদা আদায় বা প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানোর মতো কাজ করানো হয়। পরে বড় অপরাধীদের তত্ত্বাবধানে তারা গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। দ্রুত অর্থ, অস্ত্র, মোটরসাইকেল ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সান্নিধ্য পাওয়ার আকর্ষণও তাদের অপরাধে টেনে নেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এখন শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নেই; সারা দেশেই এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে। তার মতে, শুধু গ্যাং সদস্যদের গ্রেফতার করলেই হবে না; তাদের অর্থদাতা, মাদক ব্যবসায়ী, পৃষ্ঠপোষক ও গডফাদারদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। একইসঙ্গে পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
গ্রেফতারই কি সমাধান?
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, মোহাম্মদপুরে ভাসমান মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আশপাশের জেলা-উপজেলা থেকে অনেকে এসে অপরাধ করে আবার চলে যায়। জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক অপরাধী চক্রেও কিশোরদের সম্পৃক্ততা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘শুধু গ্রেফতার করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, স্থানীয় সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে অভিভাবকদেরও সচেতন করা হচ্ছে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও উত্তরার গ্যাংগুলোকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সদস্যদের গ্রেফতার করা হলেও অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় অনেককে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। কিন্তু সংশোধনের সুযোগ পেয়েও অনেকে ফিরে এসে আবার একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
তার মতে, বিদ্যমান আইন ও পুনর্বাসন ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মসূচি ও মিছিলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের ব্যবহার বন্ধ করাও জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোর গ্যাং দমনে শুধু অভিযান বা গ্রেফতার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত কৌশল—গ্যাং সদস্য ও পৃষ্ঠপোষকদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি, অর্থ ও মাদকের উৎস শনাক্ত, দ্রুত বিচার, কার্যকর পুনর্বাসন এবং ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের আওতায় ফিরিয়ে আনা। অন্যথায় কিছুদিন নীরবতার পর নতুন নাম ও নতুন ‘বড় ভাইয়ের’ নেতৃত্বে একই কিশোররা আবারও অপরাধের জগতে ফিরে আসবে।

