শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানোন্নয়ন, নিয়মিত পড়াশোনায় মনোযোগী করা এবং মাদক, বাল্যবিবাহ ও মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত আসক্তি থেকে দূরে রাখতে নওগাঁর পোরশায় নিতপুর দারুস সুন্নাহ সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় মা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার সকালে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আয়োজিত এ সমাবেশে প্রায় ৩০০ জন মা ও অভিভাবক অংশ নেন। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার অগ্রগতি, আচরণ, বন্ধু নির্বাচন এবং পারিবারিক পরিবেশ নিয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন করার লক্ষ্যে এ আয়োজন করা হয়।
শিক্ষার্থীদের প্রতি নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান
নিতপুর দারুস সুন্নাহ সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার আয়োজনে অনুষ্ঠিত মা সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. আব্দুল বাশির।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা সহকারী মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন নিতপুর দারুস সুন্নাহ সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সভাপতি রফিকুল ইসলাম গামা এবং উপাধ্যক্ষ মো. সাগর আলী।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, একজন সন্তানের বেড়ে ওঠা, নৈতিক শিক্ষা ও মানসিক বিকাশে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মা সন্তানের দৈনন্দিন জীবন, পড়াশোনা, বন্ধু ও চলাফেরার বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখলে অনেক সামাজিক সমস্যা শুরুতেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তারা অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, সন্তান কখন কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে এবং অবসর সময়ে কী করছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ নেওয়া প্রয়োজন। শুধু সন্তান বাসায় ফিরেছে কি না, সেটি জানাই যথেষ্ট নয়; তার মানসিক পরিবর্তন ও আচরণেও নজর রাখতে হবে।
মাদক ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সচেতনতার তাগিদ
সমাবেশে মাদকাসক্তি প্রতিরোধের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, মাদক একটি পরিবার ও সমাজকে নানা দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই সন্তানদের মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে ছোটবেলা থেকেই সচেতন করতে হবে।
একই সঙ্গে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়েও আলোচনা করা হয়। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং উপযুক্ত বয়সের আগে বিয়ের ঝুঁকি থেকে তাদের রক্ষা করতে অভিভাবকদের সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, কোনো শিক্ষার্থী পড়াশোনায় অনিয়মিত হলে বা আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন দেখা দিলে সেটিকে অবহেলা না করে কারণ খুঁজে বের করতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
মোবাইল ফোন ব্যবহারে অভিভাবকের নজরদারি
বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোবাইল ফোন ব্যবহারের প্রবণতা নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, শিক্ষার প্রয়োজনে প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হলেও অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ব্যবহার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ঘুম, সামাজিক যোগাযোগ ও দৈনন্দিন আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তাই সন্তানকে পুরোপুরি প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন না করে মোবাইল ব্যবহারের সময়, উদ্দেশ্য ও অনলাইন কার্যক্রম সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতনভাবে নজরদারি করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
মা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব
সমাবেশে বক্তারা বলেন, শিক্ষার্থীর ভালো ফলাফল ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। শিক্ষক ও অভিভাবকের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং সমন্বয় থাকা জরুরি।
শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, পরীক্ষার ফলাফল, পড়াশোনার অগ্রগতি কিংবা আচরণগত পরিবর্তন—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে শিক্ষকদের নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে সমস্যা দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব।
তারা বলেন, একজন শিক্ষার্থীকে সুশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষক এবং সমাজ—তিন পক্ষের সম্মিলিত ভূমিকা প্রয়োজন।
বক্তব্য রাখেন শিক্ষক ও অতিথিরা
মা সমাবেশে বক্তব্য দেন সহকারী অধ্যাপক মো. নাইমুল ইসলাম, সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) মো. শরিফুল ইসলামসহ মাদ্রাসার শিক্ষকরা। তারা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিতি, পড়াশোনায় মনোযোগ এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়ে অভিভাবকদের সহযোগিতা কামনা করেন।
বক্তারা সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন। সন্তান কোনো সমস্যায় পড়লে যাতে ভয় বা সংকোচ ছাড়াই মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারে, সে ধরনের পারিবারিক পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানানো হয়।
প্রায় ৩০০ মা ও অভিভাবকের অংশগ্রহণ
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং অভিভাবকদের আরও সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যেই এ মা সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। এতে মাদ্রাসার শিক্ষক, সাংবাদিক, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং প্রায় ৩০০ মা ও অভিভাবক অংশ নেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নিতপুর দারুস সুন্নাহ সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার আরবি বিভাগের প্রভাষক মো. বাবুল আকতার।
সমাবেশ শেষে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনা, নৈতিক মূল্যবোধ গঠন এবং মাদক, বাল্যবিবাহ ও অনিয়ন্ত্রিত মোবাইল ব্যবহার থেকে দূরে রাখতে শিক্ষক-অভিভাবকদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।

