দেশে এলপিজির সরবরাহে বড় ধরনের সংকট নেই বলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দাবি করলেও রাজধানীর বাজারে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে ১২ কেজির সিলিন্ডার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করলেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায়।
অর্থাৎ নির্ধারিত দামের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি ১২ কেজির সিলিন্ডারে ক্রেতাকে অতিরিক্ত ৩১৫ থেকে ৫১৫ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। শুধু বাড়তি দামই নয়, অনেক ক্রেতার অভিযোগ—বেশি টাকা দিতে রাজি থাকার পরও প্রয়োজনের সময় সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, তারা নিজেরাই কোম্পানি বা ডিলার পর্যায় থেকে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনছেন। ফলে বিইআরসির নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে তাদের লোকসান হবে। ব্যবসায়ীদের সংগঠনও বলছে, কয়েকটি কোম্পানি চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ দিতে না পারায় রেশনিং করে সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
১ হাজার ৫৮৫ টাকার সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ১০০ টাকায়
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি এলপিজি বিক্রয়কেন্দ্রে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে বাড়তি দামের মুখে পড়েন বেসরকারি চাকরিজীবী মোহাম্মদ অয়ন। তিনি জানান, এর আগে একই ধরনের সিলিন্ডার ১ হাজার ৬৫০ টাকায় কিনলেও এবার দোকানে গিয়ে দাম জানতে পারেন ১ হাজার ৯৫০ টাকা।
অয়ন বলেন, তিনি দোকানিকে ১ হাজার ৭৫০ টাকা রাখার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু দোকানি জানান, বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় ১ হাজার ৯৫০ টাকার নিচে দেওয়া সম্ভব নয়। দোকানে আরও কয়েকজন ক্রেতা অপেক্ষা করছিলেন এবং তিনি সিলিন্ডারটি না নিলে অন্য ক্রেতা নিয়ে যাবেন—এমন পরিস্থিতির কথাও তাকে জানানো হয়।
ফলে প্রয়োজনের কারণে নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়েই সিলিন্ডার কিনতে হয় তাকে।
ছোট ব্যবসায়ীরাও চাপে
এলপিজির বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে ছোট ব্যবসাগুলোতেও। রাজধানীর এক চা দোকানি আরিফ জানান, মঙ্গলবার সকালে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তাকে ১ হাজার ৯৫০ টাকা দিতে হয়েছে।
তার দাবি, বাজারে পর্যাপ্ত সিলিন্ডার না থাকায় বাধ্য হয়ে বেশি দাম দিতে হচ্ছে। অথচ চায়ের দাম বাড়িয়ে এই অতিরিক্ত খরচ সমন্বয় করার সুযোগও নেই।
আরিফ বলেন, ‘আমাদেরও চলতে কষ্ট হচ্ছে। চায়ের দাম বাড়াতে পারছি না। দাম বাড়ালে ক্রেতারা আপত্তি করেন। পাঁচ টাকা রং চা ও ১০ টাকা দুধ চায়ের দামে কীভাবে ব্যবসা করব।’
অন্যান্য সাইজের সিলিন্ডারেও বাড়তি দাম
বাজারে শুধু ১২ কেজির সিলিন্ডার নয়, অন্যান্য সাইজের এলপিজিও নির্ধারিত দামের তুলনায় বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সেপ্টেম্বরের জন্য বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডার প্রায় ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
এ ছাড়া ৩৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা এবং ৪৫ কেজির সিলিন্ডার প্রায় সাড়ে ৬ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে বাজারের তথ্য থেকে জানা গেছে।
বাড়তি দাম দিয়েও মিলছে না সিলিন্ডার
বাজার পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে সরবরাহের ক্ষেত্রে। একদিকে বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে এলপিজির সামগ্রিক সংকট নেই; অন্যদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা দিয়েও অনেক সময় প্রয়োজনীয় সিলিন্ডার সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।
একজন ক্রেতার ভাষ্য, তিনি একাধিক ডিলারের কাছে গিয়েও সিলিন্ডার পাননি। তার ভাষায়, যে ডিলারের কাছেই যাচ্ছেন, সেখানেই বলা হচ্ছে সিলিন্ডার নেই। রান্নার কাজে এলপিজির বিকল্প না থাকায় শেষ পর্যন্ত বেশি দাম দিয়েই কিনতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় ভোক্তাদের প্রশ্ন, যদি বাজারে প্রকৃতপক্ষে এলপিজির সংকট না থাকে, তাহলে নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না কেন? আর যদি সরবরাহে ঘাটতি না থাকে, তাহলে খুচরা বাজারে দাম এতটা বেড়ে যাওয়ার কারণই বা কী?
বেশি দামে কেনার দাবি বিক্রেতাদের
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে তারা নিজেরাও বেশি দামে সিলিন্ডার কিনছেন। তাদের দাবি, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার সংগ্রহ করতে তাদের ১ হাজার ৬৫০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।
একজন বিক্রেতা বলেন, ‘আমরা ১ হাজার ৬৫০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনছি, অথচ সরকার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। বিইআরসির নির্ধারিত দামের সঙ্গে কোম্পানির দামেরও পার্থক্য রয়েছে। ফলে ওই দামে সিলিন্ডার বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।’
তার দাবি, ক্রয়মূল্যের সঙ্গে পরিবহন ও অন্যান্য ব্যবসায়িক খরচ যুক্ত হওয়ায় নির্ধারিত দামে বিক্রি করলে তাদের লোকসান গুনতে হবে। এ কারণেই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
পাঁচ থেকে আট দিন অপেক্ষার অভিযোগ ব্যবসায়ীদের
এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন এলপি গ্যাস ট্রেডার্স কোঅপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের পক্ষ থেকেও সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যার কথা বলা হয়েছে।
সংগঠনটির ট্রেজারার আবু তাহের খোরশেদ বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পাঁচ, সাত এমনকি আট দিন অপেক্ষা করে রেশনিংয়ের মাধ্যমে এলপিজি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কিছু কোম্পানির কাছে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় তারা বিক্রিও বন্ধ করে দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি জানান, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা হলেও এখনো কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
আমদানি হচ্ছে বিপুল পরিমাণ এলপিজি
বাজারে সরবরাহ ঘাটতির অভিযোগের মধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আমদানি-সংক্রান্ত তথ্য ভিন্ন একটি চিত্র সামনে আনছে।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। সেপ্টেম্বরেও প্রায় কাছাকাছি পরিমাণ এলপিজি আমদানি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে জানা গেছে।
ফলে প্রশ্ন উঠছে, দেশে বিপুল পরিমাণ এলপিজি আমদানি হওয়ার পরও খুচরা বাজারে কেন নির্ধারিত দামের চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে? একই সঙ্গে বাড়তি দাম দেওয়ার পরও কেন কোনো কোনো এলাকায় চাহিদামতো সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না—সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
কোথায় হচ্ছে সমস্যা, তা চিহ্নিত করার তাগিদ
এলপিজির মূল্য ও সরবরাহ পরিস্থিতিতে এই অসঙ্গতির পেছনে কোথায় সমস্যা হচ্ছে, তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, এলপিজির বাজার তদারকির জন্য সরকারের একাধিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সাধারণ মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্ধারিত হিসাব অনুযায়ী বাজারে দাম কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তাদের।
তার মতে, সরবরাহ ব্যবস্থার কোনো স্তরে সমস্যা তৈরি হচ্ছে কি না, আমদানির পরবর্তী পর্যায়ে মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হচ্ছে, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে দামের ব্যবধান কেন তৈরি হচ্ছে—এসব বিষয় পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
ভোক্তার ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ
এলপিজি এখন রাজধানীসহ দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবারের রান্নার প্রধান জ্বালানির একটি। ফলে সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে প্রতিমাসে সিলিন্ডার কিনতে হলে তা সরাসরি পরিবারের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার এবং ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এই অতিরিক্ত ব্যয় আরও চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে বাজারে পণ্য থাকলেও নির্ধারিত দামে না পাওয়া এবং বেশি দাম দিয়েও কখনো সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বাজারে আমদানির পরিমাণ, কোম্পানির সরবরাহ, ডিলার পর্যায়ের মূল্য, পরিবহন ব্যয় এবং খুচরা পর্যায়ের বিক্রয়মূল্য—প্রতিটি ধাপ পর্যালোচনা করে সমস্যার উৎস চিহ্নিত করা গেলে নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ অবস্থায় ভোক্তাদের স্বার্থে বিইআরসির নির্ধারিত দাম কার্যকর হচ্ছে কি না, বাজারে প্রকৃত সরবরাহ পরিস্থিতি কী এবং আমদানি করা এলপিজি কোন পর্যায়ে কী দামে যাচ্ছে—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার সমন্বিত নজরদারি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

