তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মূল্য সমন্বয় এবং ব্যবসায়ীদের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাজধানীর ইস্কাটনে বিয়াম মিলনায়তনে এ শুনানি শুরু হয়েছে। শুনানিতে এলপিজি আমদানিকারকেরা বর্তমান কমিশন দুই থেকে আড়াই গুণ পর্যন্ত এবং পরিবেশকেরা তিন গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। এসব প্রস্তাব অনুমোদিত হলে এলপিজি বাজারের মূল্য কাঠামোতে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
বিইআরসিতে জমা দেওয়া আবেদন অনুযায়ী, ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারে আমদানিকারক ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কমিশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। পাশাপাশি পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতারাও তাঁদের কমিশন বাড়ানোর আবেদন জানিয়েছেন। তবে এসব প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; গণশুনানি ও সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
১২ কেজি সিলিন্ডারে কমিশন বাড়াতে কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব
বিইআরসিতে জমা দেওয়া আবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারে কমিশন ১৯১ টাকা। এই কমিশন বাড়িয়ে বিভিন্ন হারে নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে চারটি প্রতিষ্ঠান।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ওমেরা এলপিজি সিলিন্ডারপ্রতি কমিশন ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার আবেদন জানিয়েছে।
অর্থাৎ, প্রতিষ্ঠানভেদে বর্তমান কমিশনের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ওমেরার প্রস্তাব কার্যকর হলে ১২ কেজি সিলিন্ডারে কমিশন ১৯১ টাকা থেকে বেড়ে ৪৭৮ টাকা হবে।
তবে সব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব এক নয়। ফলে কমিশন বাড়ানোর বিষয়ে বিইআরসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে কোন প্রতিষ্ঠান কতটা সুবিধা পাবে, তা নির্ভর করবে শুনানিতে উপস্থাপিত যুক্তি, ব্যয়সংক্রান্ত তথ্য এবং কমিশনের মূল্যায়নের ওপর।
পরিবেশকদের কমিশন ৫০ থেকে ১৫০ টাকা করার দাবি
এলপিজি পরিবেশকেরাও তাঁদের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁদের আবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে সিলিন্ডারপ্রতি ৫০ টাকা কমিশন পাওয়া গেলেও তা বাড়িয়ে ১৫০ টাকা করার দাবি জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, খুচরা বিক্রেতারা বর্তমান ৪৫ টাকা কমিশন বাড়িয়ে ৭০ টাকা নির্ধারণের আবেদন করেছেন।
অর্থাৎ, পরিবেশকেরা কমিশন তিন গুণ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। খুচরা বিক্রেতাদের ক্ষেত্রেও কমিশন বৃদ্ধির আবেদন করা হয়েছে। তাঁদের যুক্তি ও ব্যয়ের হিসাব গণশুনানিতে পর্যালোচনার বিষয় হতে পারে।
এলপিজি সরবরাহব্যবস্থায় আমদানিকারক বা বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে পরিবেশক এবং সেখান থেকে খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে ভোক্তার কাছে সিলিন্ডার পৌঁছায়। এই পুরো ব্যবস্থায় কমিশন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যয়। তাই কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনার সময় সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় ও ভোক্তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব—দুই বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
এলপিজির দাম বাড়বে কি?
কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব সামনে আসায় ভোক্তাদের মধ্যে এলপিজির দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তবে কমিশন বৃদ্ধির আবেদন করা হয়েছে বলেই সিলিন্ডারের দাম বাড়বে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
এলপিজির মূল্য নির্ধারণে আমদানি ব্যয়, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, পরিবহন ও বিপণন ব্যয়, কমিশনসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। বিইআরসির গণশুনানিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব অনুমোদিত হলে তার আর্থিক প্রভাব কীভাবে মূল্য কাঠামোয় প্রতিফলিত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কমিশন বাড়লেও ভোক্তার জন্য নির্ধারিত দাম অপরিবর্তিত থাকবে কি না, কিংবা মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে কি না—তা বিইআরসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
দেশে এলপিজি আমদানি ও সরবরাহের চিত্র
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলপিজি আমদানির ব্যবসায় নিবন্ধিত কোম্পানি রয়েছে ৩০টি। এর মধ্যে ছয়টি কোম্পানি নিয়মিত আমদানি করে। এ ছাড়া আমদানিকারকদের কাছ থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে নিজস্ব প্ল্যান্টে সিলিন্ডারজাত করার কাজে যুক্ত রয়েছে ১২টি প্রতিষ্ঠান।
দেশের বাসাবাড়ি, রেস্তোরাঁ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এলপিজি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। পাইপলাইনের গ্যাসের বাইরে থাকা অনেক পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য সিলিন্ডারজাত এলপিজি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি। এ কারণে এলপিজির দাম ও সরবরাহব্যবস্থায় পরিবর্তন হলে তা সরাসরি ভোক্তাদের ব্যয়ে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর জন্য সিলিন্ডারের দাম গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে তাই ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষা, ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক ব্যয় এবং বাজারে প্রতিযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
গণশুনানিতে বিইআরসির সিদ্ধান্তের অপেক্ষা
এলপিজির মূল্য সমন্বয় এবং কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাব নিয়ে শুরু হওয়া গণশুনানিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করা হবে। আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের প্রস্তাবের পাশাপাশি ভোক্তাদের স্বার্থ এবং বাজার পরিস্থিতিও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
এখন দেখার বিষয়, বিইআরসি কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাবগুলো কতটা গ্রহণ করে এবং এলপিজির মূল্য নির্ধারণে কী সিদ্ধান্ত নেয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত প্রস্তাবিত কমিশনকে কার্যকর হার হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

