দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে বিপজ্জনক রাসায়নিক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যবাহী ৩১৮টি কনটেইনার। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি কনটেইনার জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের শেড ও ইয়ার্ডে পড়ে থাকা এসব কনটেইনার ঘিরে বাড়ছে অগ্নিকাণ্ড, রাসায়নিক নিঃসরণ ও সম্ভাব্য বিস্ফোরণের আশঙ্কা। একই সঙ্গে মূল্যবান ইয়ার্ডের জায়গা দখল করে থাকায় ব্যাহত হচ্ছে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম।
কনটেইনারগুলো সরিয়ে নিতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একাধিকবার কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে। তবে দীর্ঘদিনেও সেগুলোর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কনটেইনারগুলো সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিধি অনুসরণ করে এসব পণ্য নিলাম বা ধ্বংস করার কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিষ্পত্তির জন্য ৩১৮টি বিপজ্জনক পণ্যবাহী কনটেইনার কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে কনটেইনারগুলো এখনো বন্দরের অভ্যন্তরেই রয়েছে। ফলে এগুলোর নিরাপদ ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত নিষ্পত্তি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।
দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় বাড়ছে নিরাপত্তাঝুঁকি
চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানার জন্য বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করা হয়। এসব পণ্যের মধ্যে দাহ্য, ক্ষয়কারী, বিষাক্ত ও বিস্ফোরণঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকও থাকতে পারে। আমদানি করা পণ্যের ছাড়করণ, মালিকানা, আইনি জটিলতা কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সমস্যার কারণে কিছু কনটেইনার দীর্ঘদিন বন্দরে পড়ে থাকে।
বিপজ্জনক পণ্যবাহী কনটেইনারের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের এই জটিলতা বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। পণ্যের ধরন, রাসায়নিকের বৈশিষ্ট্য, সংরক্ষণপদ্ধতি এবং কনটেইনারের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে কনটেইনারের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা ভেতরে থাকা রাসায়নিকের সংরক্ষণব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
বন্দরের মতো জনবহুল ও ব্যস্ত স্থানে বিপজ্জনক পণ্য দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে শুধু সংশ্লিষ্ট কনটেইনার নয়, আশপাশের অন্যান্য পণ্য, শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বন্দরের অবকাঠামোও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে পণ্য ওঠানো-নামানো, কনটেইনার পরিবহন ও জাহাজের কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে ৩১৮টি কনটেইনারের সবগুলোতেই একই ধরনের রাসায়নিক রয়েছে কি না, কিংবা কোন কনটেইনারে কী পরিমাণ ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ আছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি। তাই প্রতিটি কনটেইনারের পণ্যের ধরন ও ঝুঁকির মাত্রা যাচাই করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বৈরুত বিস্ফোরণ ও সীতাকুণ্ডের ঘটনা বাড়াচ্ছে উদ্বেগ
বিপজ্জনক রাসায়নিকের নিরাপদ সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগের বড় উদাহরণ ২০২০ সালের ৪ আগস্ট লেবাননের বৈরুত বন্দরের ভয়াবহ বিস্ফোরণ। বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের বিস্ফোরণে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন বন্দরে বিপজ্জনক রাসায়নিক সংরক্ষণ, তদারকি ও নিষ্পত্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
বাংলাদেশেও বিপজ্জনক রাসায়নিক ও দাহ্য পণ্য ঘিরে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে। চট্টগ্রাম বন্দরে ২০১৫ সালে রাসায়নিক বিস্ফোরণে চার শ্রমিক আহত হন। ২০২২ সালে ব্যাটারিবাহী একটি কনটেইনারে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটে।
একই বছরের ৪ জুন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ডের পর হাইড্রোজেন পার-অক্সাইডবাহী কনটেইনারে বিস্ফোরণ ঘটে। ওই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ৫০ জনের প্রাণহানি হয় এবং বহু মানুষ আহত হন। ঘটনাটি বিপজ্জনক রাসায়নিকের সঠিক সংরক্ষণ, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতির গুরুত্ব সামনে নিয়ে আসে।
যদিও এসব ঘটনার পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট পণ্যের ধরন এক নয়, তবু বিপজ্জনক রাসায়নিক ব্যবস্থাপনায় অবহেলা বা দীর্ঘসূত্রতার সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে এগুলো সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকা কনটেইনারগুলোর ক্ষেত্রেও তাই ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং দ্রুত নিষ্পত্তি জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বন্দরের মূল্যবান জায়গা দখল করে আছে কনটেইনার
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক কনটেইনার এখানে খালাস, সংরক্ষণ ও পরিবহন করা হয়। বন্দরের ইয়ার্ড ও শেডের জায়গা সীমিত হওয়ায় দ্রুত পণ্য খালাস এবং কনটেইনার সরিয়ে নেওয়া স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এ অবস্থায় বছরের পর বছর ধরে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা বিপজ্জনক কনটেইনার বন্দরের সক্ষমতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। এসব কনটেইনারের কারণে ব্যবহারযোগ্য জায়গা আটকে থাকলে অন্য পণ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় জটিলতা দেখা দিতে পারে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে জায়গা এমনিতেই অপ্রতুল। এর ওপর দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ও বিপজ্জনক কনটেইনারগুলো বন্দরের মূল্যবান জায়গা দখল করে আছে। এসব কনটেইনারে থাকা দাহ্য পদার্থ ও রাসায়নিক সরানো না হলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই কনটেইনারগুলো সরিয়ে বন্দরকে ঝুঁকিমুক্ত করা প্রয়োজন।
তাঁর বক্তব্যে বন্দরের নিরাপত্তা ও কার্যক্রমের স্বাভাবিক গতি বজায় রাখতে দ্রুত নিষ্পত্তির গুরুত্ব উঠে এসেছে। তবে কনটেইনারগুলো সরানোর পাশাপাশি কোথায় এবং কীভাবে বিপজ্জনক পণ্য নিরাপদে সংরক্ষণ, পুনর্ব্যবহার বা ধ্বংস করা হবে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
৩১৮ কনটেইনার কাস্টমসকে হস্তান্তর
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে অনেক রাসায়নিক পণ্যবাহী কনটেইনার রয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩১৮টি কনটেইনার কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাস্টমস পর্যায়ক্রমে এসব কনটেইনারের নিলাম ও ধ্বংসের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্য অনুযায়ী, কনটেইনারগুলো নিষ্পত্তির দায়িত্ব এখন কাস্টমসের হাতে। তবে কনটেইনার হস্তান্তর সম্পন্ন হলেও সেগুলো বন্দরের অভ্যন্তরে অবস্থান করায় জায়গা দখল ও নিরাপত্তার প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা কনটেইনারের ক্ষেত্রে শুধু প্রশাসনিক হস্তান্তর যথেষ্ট নয়; পণ্যের প্রকৃতি অনুযায়ী চূড়ান্ত নিষ্পত্তি সম্পন্ন করাও জরুরি। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়, প্রয়োজনীয় কারিগরি মূল্যায়ন এবং নিরাপদ পরিবহন বা ধ্বংসের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
দরপত্রের মাধ্যমে সরানোর উদ্যোগ
চট্টগ্রাম কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন জানিয়েছেন, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কনটেইনারগুলো সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ক্রয়সংক্রান্ত নীতিমালার প্রযোজ্য ধারা ও বিধি অনুসরণ করে দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা কনটেইনারগুলোর নিষ্পত্তির পথ তৈরি হতে পারে। তবে কার্যক্রমটি কখন শুরু হবে, কত দিনের মধ্যে সব কনটেইনার সরানো সম্ভব হবে এবং কোন ধরনের পণ্য নিলাম বা ধ্বংস করা হবে—এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়নি।
বিপজ্জনক রাসায়নিকের ক্ষেত্রে নিলাম বা ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পণ্যের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য, নিরাপত্তাঝুঁকি, সংরক্ষণের অবস্থা এবং প্রযোজ্য পরিবেশগত বিধিবিধান বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। সব পণ্য সাধারণ পণ্যের মতো নিলাম করা যায় না; কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ তত্ত্বাবধানে নিরাপদ নিষ্পত্তির প্রয়োজন হতে পারে।
দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি
চট্টগ্রাম বন্দরে বিপজ্জনক পণ্যবাহী কনটেইনারের দীর্ঘমেয়াদি জট কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। প্রথমত, ৩১৮টি কনটেইনারের পণ্যভিত্তিক তালিকা, ঝুঁকির মাত্রা, সংরক্ষণের অবস্থা এবং আইনি জটিলতা পর্যালোচনা করে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা প্রয়োজন। জরাজীর্ণ বা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কনটেইনারগুলোর ক্ষেত্রে দ্রুত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
দ্বিতীয়ত, কাস্টমস, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব ও সময়সীমা স্পষ্ট করা দরকার। একই সঙ্গে আমদানিকারকের পরিচয়, পণ্যের মালিকানা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রসংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, ভবিষ্যতে বিপজ্জনক পণ্যবাহী কনটেইনার দীর্ঘদিন বন্দরে পড়ে থাকা ঠেকাতে নির্দিষ্ট সময় পর্যালোচনা, নিয়মিত ঝুঁকি নিরীক্ষা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা কার্যকর করা প্রয়োজন। এতে বন্দরের জায়গার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সামগ্রিক বন্দর কার্যক্রমের নিরাপত্তা বাড়ানো সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকা ৩১৮টি বিপজ্জনক পণ্যবাহী কনটেইনার শুধু জায়গা দখলের সমস্যা নয়; এটি নিরাপত্তা, পরিবেশ ও বন্দর ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও জড়িত। আন্তঃমন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাস্টমস কর্তৃপক্ষ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিলেও এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কত দ্রুত, কী পদ্ধতিতে এবং কতটা নিরাপদভাবে কনটেইনারগুলো সরানো সম্ভব হয়। অতীতের ভয়াবহ দুর্ঘটনাগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে এ কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা এড়ানো জরুরি।

