যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা নিয়ে প্রবেশের পর আইন লঙ্ঘন, অপরাধে জড়িত হওয়া, জালিয়াতি কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টির অভিযোগে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অপরাধ, জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের মতো বিভিন্ন কারণে তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে। প্রশাসনের দাবি, আগের যেকোনো প্রশাসনের তুলনায় দ্রুতগতিতে এই বিপুলসংখ্যক ভিসা বাতিলের ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) আল জাজিরাকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, দেশের সীমান্ত সুরক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষার লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আইন লঙ্ঘনকারী ও নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারেন—এমন বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতেও ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে দপ্তরটি।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা নীতি ও অভিবাসন ব্যবস্থায় কঠোরতা আরও বাড়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। একই সঙ্গে ভিসা আবেদনকারীদের নিরাপত্তা যাচাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়াও জোরদার করা হয়েছে।
অপরাধ ও অভিবাসন আইন লঙ্ঘনে বাতিল হচ্ছে ভিসা
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, বাতিল হওয়া ভিসার বড় অংশের ক্ষেত্রে অপরাধ, জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, অভিবাসন আইন লঙ্ঘন, জালিয়াতি এবং আবেদনে ভুল তথ্য দেওয়ার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া কিছু বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে, যার ভিত্তিতে তাঁদের আর ভিসা পাওয়ার যোগ্য বলে বিবেচনা করা হয়নি। এসব তথ্য যাচাইয়ের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে দপ্তরটি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ভিসা নিয়ে দেশটিতে অবস্থান করার অর্থ এই নয় যে, কোনো বিদেশি নাগরিক দেশটির আইন লঙ্ঘন করেও সেখানে থাকার সুযোগ পাবেন। ভিসার শর্ত ভঙ্গ, অপরাধে জড়িত হওয়া কিংবা নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট জানান, ভিসা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে আইন ভাঙা, জালিয়াতি করা কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করা বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কোন অপরাধে কত ভিসা বাতিল? মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ভিসার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ভিসার ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে হামলা ও এ ধরনের অপরাধের অভিযোগ ছিল। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর কারণে বাতিল হয়েছে ২২ শতাংশ ভিসা। চুরির ঘটনায় ৭ শতাংশ এবং মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার বা বিতরণের কারণে আরও ৭ শতাংশ ভিসা বাতিল করা হয়েছে।
এসব পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন শুধু জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিষয় নয়, বরং জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে—এমন অপরাধের ক্ষেত্রেও ভিসা বাতিলের পদক্ষেপ নিয়েছে।
তবে এসব পরিসংখ্যানের প্রতিটি ক্ষেত্রে অভিযোগের প্রকৃতি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে গৃহীত আইনি পদক্ষেপ এবং ভিসা বাতিলের নির্দিষ্ট কারণ এক নয়। তাই ভিসা বাতিলের অর্থ সব ক্ষেত্রে একই ধরনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হওয়া নয়; সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের ভিত্তি নির্ভর করে ব্যক্তিগত ঘটনা ও প্রযোজ্য আইনের ওপর।
‘বার্থ ট্যুরিজম’-এর অভিযোগেও চার হাজারের বেশি ভিসা বাতিল
যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দিয়ে শিশুর জন্য মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে ভ্রমণের অভিযোগেও ব্যবস্থা নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ ধরনের ভ্রমণকে সাধারণত ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বলা হয়।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, বার্থ ট্যুরিজমে জড়িত থাকা কিংবা এ ধরনের কাজে সহায়তা করার অভিযোগে চার হাজারের বেশি ভিসা বাতিল করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে দেশটির অভিবাসন ও রাজনৈতিক বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং ভিসার অপব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় এ ধরনের ভ্রমণের উদ্দেশ্য যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে শুধু যুক্তরাষ্ট্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার বিষয়টি এবং ভিসা আবেদনে প্রতারণা বা ভ্রমণের উদ্দেশ্য গোপন করার অভিযোগ এক নয়। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় ভিসা বাতিলের কারণ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট তথ্য, প্রমাণ এবং প্রযোজ্য আইনের ওপর। আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিল
যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা বাতিলের সংখ্যা চলতি বছর একাধিকবার আলোচনায় এসেছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে বাতিল হওয়া ভিসার সংখ্যা ১ লাখ ৭৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এর আগে জানুয়ারিতে এক লাখের বেশি ভিসা বাতিলের তথ্য জানিয়েছিল দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর। সর্বশেষ হিসাবে সংখ্যাটি তিন লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ায় ভিসা বাতিলের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এ পদক্ষেপকে সীমান্ত সুরক্ষা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং অভিবাসন আইন কার্যকরের অংশ হিসেবে তুলে ধরছে।
প্রশাসনের নীতিতে বিদেশি নাগরিকদের ভিসা দেওয়ার পরও তাঁদের কার্যক্রম ও আইন মেনে চলার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থাৎ, ভিসা পাওয়ার সময় যোগ্য বিবেচিত হলেও পরবর্তী সময়ে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে কিংবা ভিসার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করা হতে পারে।
এতে যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা, চাকরি, ব্যবসা কিংবা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে যাওয়া বিদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসার শর্ত মেনে চলার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ভিসা যাচাইয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নজরদারি
ভিসা বাতিলের পাশাপাশি আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াও কঠোর করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত যাচাই জোরদার করার বিষয়টি সামনে এসেছে।
প্রশাসনের লক্ষ্য, আবেদনকারীর পরিচয়, ভ্রমণের উদ্দেশ্য, অতীত কর্মকাণ্ড এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত ঝুঁকি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা। এর মাধ্যমে ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকানো এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারির পরিধি বাড়ানো নিয়ে অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, এ ধরনের পর্যবেক্ষণ ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সমালোচকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের ব্যাখ্যা সব সময় সহজ নয়। কোনো বক্তব্য বা অনলাইন কার্যক্রমকে নিরাপত্তাঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রেক্ষাপট ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন জরুরি।
তাঁরা আরও আশঙ্কা করছেন, অতিরিক্ত নজরদারির কারণে অভিবাসী ও বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ভীতি তৈরি হতে পারে এবং তাঁদের আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণের আওতায় আনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসাপ্রত্যাশীদের জন্য কী বার্তা?
ট্রাম্প প্রশাসনের সর্বশেষ পদক্ষেপ বিদেশি নাগরিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে—যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার পাশাপাশি দেশটির আইন ও ভিসার শর্ত মেনে চলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে ভিসার আবেদন করার সময় সঠিক তথ্য দেওয়া, ভ্রমণের প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন না করা এবং অবস্থানকালে অনুমোদিত কার্যক্রমের বাইরে না যাওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
শিক্ষার্থী, কর্মী, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের নিজ নিজ ভিসার শর্ত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা উচিত। কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়া, অভিবাসনসংক্রান্ত শর্ত লঙ্ঘন কিংবা আবেদনে প্রতারণামূলক তথ্য দেওয়ার কারণে ভিসা বাতিলসহ অন্যান্য আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তবে তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিলের অর্থ এই নয় যে, সব বিদেশি নাগরিকের ভিসা একই কারণে বাতিল হচ্ছে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সব আবেদনকারীর ওপর একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। প্রত্যেক আবেদনকারী ও ভিসাধারীর পরিস্থিতি পৃথকভাবে বিবেচিত হয়।
নিরাপত্তা জোরদার, তবে অধিকার রক্ষার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, অপরাধ দমন, সীমান্ত সুরক্ষা এবং অভিবাসন আইন কার্যকর করতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। অন্যদিকে, অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।
ভিসা বাতিলের মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরন, সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, তিন লাখের বেশি ভিসা বাতিলের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে কঠোরতার একটি বড় উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। ট্রাম্প প্রশাসন এ ধরনের পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়ায় ভবিষ্যতে ভিসা যাচাই, নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং অভিবাসন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে আরও কঠোরতা দেখা যেতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা ও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর।

