ঢাকা রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

রাজস্ব আদায়ে এনবিআরের ‘থ্রি-আর’ কৌশল, লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬, ০৬:১৬ পিএম

রাজস্ব আদায়ে এনবিআরের ‘থ্রি-আর’ কৌশল, লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা

ছবিঃ সংগৃহীত

কর প্রশাসনে বিনিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার, করদাতা সেবার মানোন্নয়ন এবং স্বেচ্ছায় কর পরিপালন বাড়ানোর মাধ্যমে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

রাজস্ব আদায়ের এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সংস্থাটি ‘থ্রি-আর’ বা তিনটি মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব কৌশল সাজিয়েছে। এগুলো হলো—রিকভারি (পুনরুদ্ধার), রেস্টোরেশন (পুনর্বহাল) এবং রিকনস্ট্রাকশন (পুনর্গঠন)।

গত মাসে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এনবিআরের উপস্থাপিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসব পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। বৈঠকে সরকারি ব্যয়ের চাহিদা পূরণে এনবিআরের সক্ষমতা, কর-জিডিপি অনুপাতের ব্যবধান কমানো, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং এনবিআরের সাংগঠনিক কাঠামো ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হয়।

তিন ‘আর’-এর ওপর ভিত্তি করে রাজস্ব কৌশল

এনবিআরের পরিকল্পনায় রিকভারি কৌশলের আওতায় রাজস্ব আদায়ে গড়ে ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে নিয়মিত রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি বকেয়া ও কর ফাঁকির অর্থ উদ্ধারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।

রেস্টোরেশন কৌশলের মূল লক্ষ্য হলো করের আওতা সম্প্রসারণ এবং ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব পরিবেশ তৈরি করা। নতুন করদাতা শনাক্ত, কর পরিপালন বাড়ানো এবং করদাতা সেবার মান উন্নয়নের মাধ্যমে এই কৌশল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্যদিকে রিকনস্ট্রাকশন কৌশলের আওতায় রাজস্ব প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়ানো, প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং স্বেচ্ছায় কর পরিপালনের পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে রাজস্ব আহরণের গতি বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তিন অনুবিভাগে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্য

চলতি অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে আয়কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও কাস্টমস—এই তিন প্রধান অনুবিভাগ থেকে রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী—

আয়কর অনুবিভাগ: ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা
ভ্যাট অনুবিভাগ: ২ লাখ ২৩ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা
কাস্টমস অনুবিভাগ: ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা

এনবিআরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনে সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে চলতি অর্থবছরে নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করছে সংস্থাটি।

আয়করে কর ফাঁকি উদ্ধার ও আওতা বাড়ানোর পরিকল্পনা

আয়কর খাতে নিয়মিত প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কর ফাঁকি দেওয়া অর্থ উদ্ধার, উৎসে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর পরিপালন জোরদার এবং করসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে আয়কর ও ভ্রমণ কর বাবদ ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা আদায় হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে নিয়মিত ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে এ খাত থেকে অতিরিক্ত ১৪ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা আদায়ের প্রত্যাশা করছে এনবিআর।

এ ছাড়া কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল, আয়কর গোয়েন্দা বিভাগ, আইআইসি এবং কর সার্কেলের মাধ্যমে কর ফাঁকি দেওয়া অর্থ উদ্ধার করে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

নিরীক্ষা ও আয়কর আইনের ২১২ ধারায় পুনরায় মামলা খোলার মাধ্যমে সৃষ্ট করসংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করে আরও ১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিলম্বে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ দিয়ে করদাতাদের স্বেচ্ছায় কর পরিপালনে উৎসাহিত করার মাধ্যমে আরও ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

করহার ও বিনিয়োগ রেয়াতে পরিবর্তনের পরিকল্পনা

নীতিগত পদক্ষেপের অংশ হিসেবে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করহার পরিবর্তন করে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত প্রগতিশীল করহার চালুর মাধ্যমে অতিরিক্ত ৩ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ রেয়াতের সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নির্ধারণের মাধ্যমে আরও ১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।

সব ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের করদাতাদের জন্য টার্নওভার কর চালুর মাধ্যমে আরও ১ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী করদাতাদের আয়কর রিটার্নের সঙ্গে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ও হিসাবের বিবরণী জমা বাধ্যতামূলক করে আরও ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

উৎসে কর ও আবাসন খাতে নজর

ব্যবসা-থেকে-ব্যবসা বা বিজনেস-টু-বিজনেস মডেলে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে উৎসে কর আদায়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত ৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

আবাসন খাতেও কর আদায় বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ডেভেলপারদের হিসাবরক্ষণে আইএফআরএস-১৫ চালুর মাধ্যমে আরও ৪ হাজার কোটি টাকা এবং জমি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য মূলধনি সম্পদ বিক্রি থেকে অর্জিত মুনাফার ওপর নিয়মিত করহার প্রয়োগ করে আরও ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের প্রত্যাশা করছে এনবিআর।

ভ্যাটে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য

ভ্যাট অনুবিভাগও নিয়মিত প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা নিয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভ্যাট থেকে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৯ কোটি টাকা আদায় হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে নিয়মিত ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অতিরিক্ত ১৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা আদায়ের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া উন্নয়ন বাজেট বা এডিপির বাস্তবায়ন বাড়ার ফলে অতিরিক্ত ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বিড়ি, সিগারেটসহ তামাক খাত থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

অবৈধ সিগারেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা জোরদার করে আরও ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভ্যাট আদায় বাড়াতে নিরীক্ষা, বকেয়া রাজস্ব আদায়, ভ্যাট নিবন্ধনের আওতা সম্প্রসারণ এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওপর নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

ভ্যাট মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্য

রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে চলমান ভ্যাটসংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বিচারাধীন মামলার ৫০ শতাংশ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মধ্যে অনিষ্পন্ন মামলার অন্তত ৯৫ শতাংশ নিষ্পত্তির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কাস্টমসে ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য

চলতি অর্থবছরে কাস্টমস অনুবিভাগের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৪০ কোটি টাকা।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাস্টমস খাতে আদায় হয়েছিল ১ লাখ ১১ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে নিয়মিত প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে অতিরিক্ত ১১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা এবং বাজেটের বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে আরও ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বকেয়া রাজস্ব আদায়, গোয়েন্দা তৎপরতা ও প্রতিরোধমূলক অভিযান, পণ্য খালাস-পরবর্তী নিরীক্ষা, নিলাম, আমদানিপণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস ও মূল্য নির্ধারণ, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ এবং স্থগিত রাজস্ব আদায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে জোর

কাস্টমস রাজস্ব বাড়ানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার বন্ধ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ খাতে অনিয়ম শনাক্ত করে রাজস্ব আদায় এবং আমদানিপণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস ও মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, পণ্য খালাস-পরবর্তী নিরীক্ষা থেকে ৫০০ কোটি টাকা, নিলাম থেকে ৫০০ কোটি টাকা, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ করে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা এবং স্থগিত রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে ১৪০ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

আমদানিপণ্যের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস ও মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনাও রয়েছে। তবে সরবরাহ করা নথিতে এ খাতের অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রার অঙ্কে অস্পষ্টতা থাকায় নির্দিষ্ট অঙ্ক এখানে উল্লেখ করা হয়নি।

প্রযুক্তি ও দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব

এনবিআরের রাজস্ব কৌশলে শুধু কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ানো নয়, কর প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দক্ষ জনবল তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন, করদাতাদের জন্য সহজ সেবা এবং স্বচ্ছতা বাড়ানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে কর পরিপালন বাড়াতে চায় সংস্থাটি।

এনবিআরের পরিকল্পনায় করদাতাদের সঙ্গে প্রশাসনের যোগাযোগ সহজ করা, স্বেচ্ছায় কর প্রদানের পরিবেশ তৈরি এবং কর ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা বাড়ানোর বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে।

সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে এনবিআরের ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’—এই তিন কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে একদিকে বকেয়া ও ফাঁকি দেওয়া রাজস্ব উদ্ধার, অন্যদিকে করের আওতা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এখন নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে এনবিআরের প্রশাসনিক সক্ষমতা, করদাতাদের পরিপালন এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম কতটা কার্যকর হয়, তার ওপরই রাজস্ব আহরণের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!