অস্তিত্বহীন একটি প্রতিষ্ঠানের নামে সিগারেটের ফিল্টার তৈরির কাঁচামাল ‘সেলুলোজ অ্যাসিটেট টো’ আমদানির ঘটনা শনাক্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)। চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে দুই কনটেইনারে আসা ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি অ্যাসিটেট টো-এর একটি চালান আটকে দিয়ে আমদানি পর্যায়ে ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করেছে সংস্থাটি।
সিআইসির প্রাথমিক হিসাব বলছে, একই পরিমাণ কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহার করা হলে এর সঙ্গে প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংশ্লিষ্ট হতে পারত। উচ্চ সেগমেন্টের সিগারেট হিসেবে হিসাব করা হলে সম্ভাব্য রাজস্বের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
তবে এই হিসাব সম্ভাব্য রাজস্বের পরিমাণ নির্দেশ করে। জব্দ বা আটকে দেওয়া কাঁচামাল বাস্তবে সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত ও যাচাইয়ের বিষয় বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
অস্তিত্বহীন ‘ইউনিক ট্রেডার্স’
সিআইসি সূত্রে জানা গেছে, সিগারেটের ফিল্টার তৈরিতে ব্যবহৃত সেলুলোজ অ্যাসিটেট টো একটি আমদানিনির্ভর কাঁচামাল। সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মাধ্যমে এ পণ্যের আমদানি বাড়ায় এর প্রকৃত ব্যবহার, আমদানির পর সরবরাহ এবং ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সম্পর্কে তথ্য বিশ্লেষণ শুরু করে সিআইসি।
এই বিশ্লেষণের সময় ‘ইউনিক ট্রেডার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের আমদানি কার্যক্রম নজরে আসে। প্রতিষ্ঠানটি কোথায় এবং কার কাছে আমদানি করা অ্যাসিটেট টো সরবরাহ করছে, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগে তথ্য চাওয়া হয়।
জবাবে ভ্যাট বিভাগ সিআইসিকে জানায়, ইউনিক ট্রেডার্সের নিবন্ধিত ঠিকানায় কোনো প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত অনলাইন বা অফলাইনে ভ্যাট রিটার্ন এবং সংশ্লিষ্ট দলিলও দাখিল করছে না।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটিকে অস্তিত্বহীন হিসেবে চিহ্নিত করে সিআইসি।
দুই কনটেইনারে ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি অ্যাসিটেট টো
সিআইসির যাচাইয়ে দেখা যায়, ইউনিক ট্রেডার্স চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস দিয়ে গত ১৮ আগস্টের সি-১২০৪৭১০ নম্বর বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে দুই কনটেইনারে মোট ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি সেলুলোজ অ্যাসিটেট টো আমদানি করে।
আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর চালানটির খালাস স্থগিত করা হয়। সিআইসির তথ্য অনুযায়ী, চালানটির সঙ্গে আমদানি পর্যায়ে প্রায় ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব জড়িত ছিল।
পরবর্তীতে ওই রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইসি।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের দৃষ্টিতে ঘটনাটির গুরুত্ব শুধু একটি চালান আটকে দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব, পণ্যের প্রকৃত ব্যবহারকারী এবং আমদানির পর এর সম্ভাব্য সরবরাহ চেইন নিয়ে আরও বড় ধরনের রাজস্ব ঝুঁকির বিষয়ও সামনে এসেছে।
এক চালানেই সম্ভাব্য ৩২৪ কোটি টাকার রাজস্ব
সিআইসির বিশ্লেষণে অ্যাসিটেট টোর সম্ভাব্য ব্যবহার ও এর মাধ্যমে উৎপাদনযোগ্য সিগারেটের পরিমাণও হিসাব করা হয়েছে।
দুটি সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মূসক-৪.৩ ফরমে উল্লেখিত উপকরণ-উৎপাদ সহগ বিশ্লেষণ করে সিআইসি দেখতে পেয়েছে, এক কেজি অ্যাসিটেট টো থেকে প্রায় ৮ হাজার ৯৩৭ শলাকা সিগারেট উৎপাদন করা সম্ভব।
সে হিসাবে ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি অ্যাসিটেট টো থেকে প্রায় ৪৩ কোটি ২ লাখ ৫৪ হাজার শলাকা সিগারেট উৎপাদন করা সম্ভব বলে হিসাব করেছে সংস্থাটি।
১০ শলাকার এক প্যাকেট হিসেবে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ ২৫ হাজার প্যাকেট।
সিআইসির প্রাথমিক হিসাবে, মিডিয়াম সেগমেন্টের সিগারেটের প্রতি প্যাকেটের খুচরা মূল্য ৯২ টাকা এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে মূসক ও সম্পূরক শুল্কসহ প্রযোজ্য রাজস্বের হার প্রায় ৮২ শতাংশ ধরে হিসাব করলে এর সঙ্গে প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংশ্লিষ্ট হতে পারে।
হাই সেগমেন্টে সম্ভাব্য রাজস্ব ৫৬৪ কোটি টাকা
অন্যদিকে একই পরিমাণ সিগারেট হাই সেগমেন্টের হিসেবে প্রতি প্যাকেট ১৬০ টাকা খুচরা মূল্যে উৎপাদন করা হলে সংশ্লিষ্ট রাজস্বের পরিমাণ প্রায় ৫৬৪ কোটি টাকা হতে পারে বলে প্রাথমিক হিসাব দিয়েছে সিআইসি।
তবে সিআইসির এই হিসাব সম্ভাব্য রাজস্বের পরিমাণ। আমদানি করা কাঁচামালটি আসলে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে আদৌ সিগারেট উৎপাদন হয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা।
এক অর্থবছরে আমদানি ৩ লাখ ৬২ হাজার কেজির বেশি
সিআইসির তথ্য বিশ্লেষণে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউনিক ট্রেডার্স মোট ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৩৭ কেজি অ্যাসিটেট টো আমদানি করেছে।
এক কেজি অ্যাসিটেট টো থেকে প্রায় ৮ হাজার ৯৩৭ শলাকা সিগারেট উৎপাদনের হিসাব বিবেচনায় নিলে এই পরিমাণ কাঁচামালের ব্যবহার ও সরবরাহ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এত বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল কোথায় গেছে, কার কাছে সরবরাহ করা হয়েছে, কোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এটি ব্যবহার করেছে এবং আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান কীভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে সিআইসি।
আরও চার প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন
অ্যাসিটেট টো আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একই ধরনের আরও চারটি প্রতিষ্ঠানের সন্ধান পেয়েছে সিআইসি।
সংশ্লিষ্ট ভ্যাট বিভাগগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধিত ঠিকানায় প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রম পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন ও প্রয়োজনীয় দলিলও দাখিল করছে না বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের নামে আমদানি করা পণ্যের প্রকৃত ব্যবহার ও সরবরাহ নিয়েও সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
নামমাত্র প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে রাজস্ব ঝুঁকির আশঙ্কা
সিআইসির প্রাথমিক অনুসন্ধানে আশঙ্কা করা হচ্ছে, কিছু প্রতিষ্ঠান নামমাত্র নিবন্ধন নিয়ে উচ্চ রাজস্ব সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানি করে থাকতে পারে। পরবর্তী সময়ে এসব পণ্য প্রকৃত ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে সরবরাহ বা হস্তান্তরের মাধ্যমে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষ করে অ্যাসিটেট টোর মতো এমন একটি কাঁচামাল, যা সিগারেট উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, সেটির আমদানিকারক, ব্যবহারকারী ও সরবরাহ চেইনের তথ্য যাচাইকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে রাজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত—এমন সিদ্ধান্ত তদন্ত শেষ হওয়ার আগে চূড়ান্তভাবে বলা যাচ্ছে না।
আমদানির পর সরবরাহ চেইনে নজর
সিআইসির অনুসন্ধানের পর অ্যাসিটেট টোর আমদানি ও সরবরাহের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেটগুলোকে সরবরাহ চেইন যাচাইয়ের নির্দেশনা দিয়েছে এনবিআর।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের কাছে এখন শুধু আমদানিকারকের অস্তিত্ব যাচাই করাই নয়, বরং আমদানির পর পণ্যটি কার কাছে যাচ্ছে, কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, কী পরিমাণ বিক্রি বা হস্তান্তর হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন কীভাবে সম্পন্ন হচ্ছে—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ জন্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সম্ভাব্য ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত পুরো সরবরাহ চেইন অনুসরণ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তদন্তে বেরিয়ে আসতে পারে আরও তথ্য
সিআইসি জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি, ভ্যাট রিটার্ন, পণ্যের ব্যবহার, সরবরাহ, আর্থিক লেনদেন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম যাচাই করা হচ্ছে।
প্রকৃত আমদানিকারক ও ব্যবহারকারী কারা, অস্তিত্বহীন বা নামমাত্র প্রতিষ্ঠানের নামে কেন পণ্য আমদানি করা হয়েছে এবং আমদানির পর এসব পণ্য কোথায় গেছে—তদন্তে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
রাজস্ব গোয়েন্দাদের এই অনুসন্ধান সফলভাবে এগোলে অ্যাসিটেট টো আমদানিকে ঘিরে সম্ভাব্য অনিয়মের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে এর সরবরাহ ও ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির তথ্য সামনে আসতে পারে।
একটি চালান থেকে ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা আমদানি পর্যায়ের রাজস্ব সুরক্ষার পাশাপাশি সম্ভাব্য শত শত কোটি টাকার স্থানীয় রাজস্ব ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ায় ঘটনাটি এনবিআরের রাজস্ব নজরদারিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

