সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন। শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই এখন গড়ে উঠেছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন সেলুন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ঝকঝকে চেয়ার, নানা ধরনের প্রসাধনী ও আধুনিক যন্ত্রপাতিতে সাজানো এসব সেলুনে চুল-দাড়ি কাটার খরচও তুলনামূলক বেশি।
তবে আধুনিক সেলুনের এই চাকচিক্যের ভিড়েও হারিয়ে যায়নি গ্রামীণ বাংলার পুরোনো নাপিত পেশা। শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার নাওডোবা বাজারে এখনো কয়েকজন নাপিত ফুটপাতের ওপর ছোট্ট টুল, আয়না ও হাতেগোনা কয়েকটি সাধারণ সরঞ্জাম নিয়ে চালিয়ে যাচ্ছেন বাপ-দাদার পেশা। মাত্র ২০ থেকে ৫০ টাকায় চুল-দাড়ি কাটার সুযোগ থাকায় নিম্ন আয়ের মানুষ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এখনো তাদের কাছে আসেন।
ফুটপাতেই সাজানো ‘সেলুন’
সরেজমিনে দেখা যায়, নাওডোবা বাজারের ব্যস্ত সড়কের পাশে ফুটপাতের ওপর বসে আছেন কয়েকজন নাপিত। কারও সামনে ছোট আয়না, পাশে প্রয়োজনীয় কাঁচি, ক্ষুর ও অন্যান্য সরঞ্জাম। নেই কোনো বড় সাইনবোর্ড, নেই সাজসজ্জার আয়োজন। খোলা আকাশের নিচেই চলছে তাদের কাজ।
কখনো গ্রাহককে ছোট্ট টুলে বসিয়ে, আবার কখনো দাঁড় করিয়েই চুল ও দাড়ি কেটে দিচ্ছেন তারা। ব্যস্ত সড়কের কোলাহল, পথচারীদের চলাচল আর যানবাহনের শব্দ—সবকিছুর মধ্যেই বছরের পর বছর ধরে এভাবেই চলছে তাদের জীবিকা।
আধুনিক সেলুনের মতো আরামদায়ক পরিবেশ না থাকলেও কম খরচে দ্রুত সেবা পাওয়ায় এসব নাপিতের কাছে গ্রাহকের আনাগোনা এখনো কমেনি।
২০ টাকায় দাড়ি, ৫০-৬০ টাকায় চুল
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নাওডোবা বাজারের ফুটপাতের নাপিতদের কাছে দাড়ি কাটতে সাধারণত ২০ টাকা এবং চুল কাটতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। কাজের ধরন ও সেবার ওপর ভিত্তি করে কোথাও কোথাও পারিশ্রমিকে সামান্য পার্থক্য থাকতে পারে।
অন্যদিকে আধুনিক সেলুনে চুল কাটতে অনেক ক্ষেত্রে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা বা তারও বেশি খরচ হয়। ফলে স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী, দিনমজুর, কৃষক, বয়স্ক ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষের কাছে ফুটপাতের এই সেবা এখনো সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে টিকে আছে।
‘বাপ-দাদার আমল থেকেই এ কাজ করছি’
নাপিত সুনীল চন্দ্র সেন বলেন, ‘বাপ-দাদার আমল থেকেই ফুটপাতে বসে চুল-দাড়ি কাটছি। দাড়ি কাটতে ২০ টাকা, চুল কাটতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা করে নিই। কম টাকার কারণে এখনো মানুষ আমাদের কাছে আসে।’
তিনি আরও বলেন, এই পেশা থেকে আয় খুব বেশি নয়। সরকারি কোনো সহায়তা বা বিশেষ সুযোগ-সুবিধা না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন।
তার ভাষায়, পুরোনো এই পেশার সঙ্গে অনেক পরিবারের জীবিকা ও ঐতিহ্য জড়িয়ে থাকলেও আয় কম হওয়ায় নতুন প্রজন্ম এ পেশায় আগ্রহী হচ্ছে না।
শুধু সাশ্রয়ী নয়, জড়িয়ে আছে স্মৃতিও
নাওডোবা বাজারের স্থানীয় বাসিন্দা রহিম ও করিম বলেন, ফুটপাতের এসব নাপিতের কাছে মানুষ শুধু কম খরচে চুল-দাড়ি কাটতে আসেন না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরোনো দিনের স্মৃতিও।
তাদের মতে, একসময় গ্রামের বাজার, হাট কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পাশে এভাবেই নাপিতরা বসতেন। স্থানীয় মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের কাছে গিয়ে চুল-দাড়ি কাটতেন। সেই পুরোনো দৃশ্য এখন অনেকটাই বিলুপ্তির পথে।
আধুনিক সেলুনের সংখ্যা বাড়লেও সুযোগ পেলেই অনেক মানুষ পুরোনো পরিচিত নাপিতের কাছে ফিরে আসেন। বিশেষ করে বয়স্ক ও দীর্ঘদিনের পরিচিত গ্রাহকদের অনেকেই এখনো এই সেবাকে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ
নাওডোবা বাজারের এই নাপিতদের জীবনে ঐতিহ্য থাকলেও পেশাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা। কম পারিশ্রমিক, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিকভাবে পেশাটির প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ কমে যাওয়ায় ধীরে ধীরে নাপিত পেশায় লোকসংখ্যা কমছে।
বর্তমানে অনেক তরুণ তুলনামূলক বেশি আয়ের আশায় অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। কেউ শ্রমিকের কাজ করছেন, কেউ ছোট ব্যবসা করছেন, আবার কেউ শহরে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিচ্ছেন।
ফলে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে যে পেশাটি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল, সেটি ধরে রাখার মানুষও ক্রমে কমে যাচ্ছে।
হারিয়ে যাওয়ার পথে গ্রামীণ ঐতিহ্য
একসময় গ্রামের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল নাপিত পেশা। চুল-দাড়ি কাটার পাশাপাশি গ্রামীণ সমাজে তাদের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্কও গড়ে উঠত। বাজার ও পাড়া-মহল্লায় নাপিতের নির্দিষ্ট জায়গা ছিল।
কিন্তু আধুনিকায়নের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক সেলুন, নতুন প্রযুক্তি ও উন্নত সেবাব্যবস্থার কারণে ঐতিহ্যবাহী ফুটপাতের নাপিত পেশা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
নাওডোবার ফুটপাতের নাপিতদের চিত্র তাই শুধু একটি পেশার গল্প নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতি, মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন এবং হারিয়ে যেতে বসা একটি ঐতিহ্যেরও প্রতিচ্ছবি।
সহায়তা চান নাপিতরা
স্থানীয়দের দাবি, ঐতিহ্যবাহী এই পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষদের প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ বা সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলে তারা আধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করে আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারবেন।
পাশাপাশি বাজার এলাকায় নির্দিষ্ট ও নিরাপদ জায়গা করে দেওয়া হলে ফুটপাত দখলের অভিযোগ ছাড়াই তারা পেশা চালিয়ে যেতে পারবেন। এতে একদিকে যেমন তাদের জীবিকার নিরাপত্তা বাড়বে, অন্যদিকে পুরোনো এই পেশাটিও টিকে থাকার সুযোগ পাবে।
স্থানীয়দের মতে, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে পেশাটিকে আধুনিকায়ন করা গেলে নাপিতদের আয় বাড়ানো সম্ভব। এতে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও এই পেশার প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
নাওডোবা বাজারের ফুটপাতের ছোট্ট আয়না, টুল আর কাঁচির শব্দ তাই এখনো মনে করিয়ে দেয়—আধুনিকতার প্রবল স্রোতের মধ্যেও গ্রামীণ বাংলার কিছু পুরোনো পেশা মানুষের প্রয়োজন, স্মৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে টিকে আছে। তবে যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে এই দৃশ্যও হয়তো একদিন শুধু স্মৃতির পাতায় জায়গা করে নেবে।

