বারান্দার রেলিংয়ে একটি কাক বসে আছে। বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। তার কালো পালকগুলো জলের ভারে এমনভাবে শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে, যেন রাতের আকাশ থেকে ছিঁড়ে আসা কোনো ক্লান্ত মেঘখণ্ড আশ্রয় নিয়েছে এই রেলিংয়ে। মাঝেমধ্যে সে ডানা ঝাঁকায়। কিন্তু তাতেও ভেজা শেষ হয় না। নতুন বৃষ্টির ফোঁটা এসে আবারও তাকে ভিজিয়ে দেয়। অথচ তার চোখে নেই কোনো অভিযোগ, নেই কোনো অস্থিরতা। মনে হয়, সে বৃষ্টিকে দেখছে না—দেখছে সময়েরও বহু পুরোনো কোনো স্মৃতি, যা শুধু প্রকৃতিই মনে রাখতে পারে।
আমি তাকিয়ে আছি সেই কাকটির দিকে। তার পেছনে বিস্তৃত এক অনিন্দ্য সুন্দর সবুজ পৃথিবী। বর্ষার জলে ধুয়ে গেছে গাছের প্রতিটি পাতা, মুছে গেছে ধুলোর ধূসরতা। প্রকৃতি যেন ফিরে পেয়েছে তার আদিম রূপ। দূরের পাহাড় মেঘের পাতলা ওড়নায় মুখ লুকিয়েছে। বাতাসে ভাসছে ভেজা মাটির সেই চিরচেনা সোঁদা গন্ধ—যে গন্ধ মানুষের স্মৃতিরও অনেক পুরোনো, জল আর মাটির প্রাচীন বন্ধনের নীরব সাক্ষ্য।
বর্ষা প্রকৃতির সবচেয়ে বড় শিল্পী। অন্য ঋতু রঙ দিয়ে ছবি আঁকে, বর্ষা আঁকে জল দিয়ে। পাতার ডগায় রেখে যায় আলোর স্বচ্ছ বিন্দু, নদীর বুকে তোলে রূপালি কম্পন, আর মানুষের হৃদয়ে জাগিয়ে দেয় এক অকারণ বিষণ্ন আনন্দ—যে আনন্দের ভাষা শুধু বৃষ্টিই জানে।
কিন্তু এই সৌন্দর্য আমরা ক`জন দেখি?
চট্টগ্রাম, ঢাকা কিংবা দেশের বড় শহরগুলোতে বর্ষার প্রথম পরিচয় এখন আর সবুজ নয়; জলাবদ্ধতা। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাস্তা নদীতে পরিণত হয়, ড্রেন উপচে পড়ে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকে নগরজীবন। অফিসফেরত মানুষ হাঁটুসমান পানি ঠেলে বাড়ি ফেরে, অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকে রাস্তায়, স্কুলগামী শিশুর জুতো ডুবে যায় কাদায়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়ে বৃষ্টির পানি।
বৃষ্টি তখন আর কবিতা নয়; হয়ে ওঠে দুর্ভোগের আরেক নাম।
এ এক নির্মম বৈপরীত্য। যে বর্ষা বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে অসংখ্য শ্রেষ্ঠ কবিতা, গান ও গল্প, সেই বর্ষাই আজ শহুরে মানুষের কাছে প্রায় আতঙ্কের প্রতিশব্দ।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—
"আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে
জীবনেরে করিব দান।"সেই ঝরো ঝরো বৃষ্টিতে তিনি শুনেছিলেন জীবনের সঙ্গীত। নজরুলের কাছে বর্ষা ছিল বিদ্রোহী উচ্ছ্বাস—"রিমঝিম রিমঝিম বরষা নামে।" জীবনানন্দ দাশের বর্ষা ছিল সময়ের ধীর পতন, আর জসীমউদ্দীনের বর্ষা ছিল নদী, নৌকা, ভাটিয়ালি আর গ্রামবাংলার নিখাদ জীবন।
সেই বর্ষা মানুষের কষ্টের সঙ্গী ছিল, কিন্তু সৌন্দর্যের শত্রু ছিল না।
আজকের শহুরে বর্ষা যেন সেই সৌন্দর্যকে আড়াল করে রেখেছে অব্যবস্থাপনা ও দুর্ভোগের ঘন পর্দার আড়ালে।
তবু প্রকৃতি তার কাজ থামায় না।
মানুষ অভিযোগ করে, কিন্তু গাছেরা করে না। পাহাড় প্রতিবাদ করে না। নদী হিসাব চায় না। বর্ষা প্রতি বছরই ফিরে আসে পৃথিবীকে নতুন করে ধুয়ে দিতে। যেন একজন মা অভিমানী সন্তানের মুখ ধুয়ে দিচ্ছেন—সে সন্তান বুঝুক বা না-ই বুঝুক।
ভেজা কাকটির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হলো, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সবচেয়ে বড় পার্থক্য এখানেই। আমরা বৃষ্টিকে দেখি আমাদের অসুবিধার আয়নায়। কাকটি দেখে শুধু বৃষ্টিকেই। তার কোনো অভিযোগ নেই। সে জানে, ভিজে যাওয়া যেমন জীবনের অংশ, তেমনি একদিন শুকিয়েও যাওয়া।
হঠাৎ কাকটি উড়ে গেল। তার ডানার ঝাপটায় কয়েক ফোঁটা জল বাতাসে ছিটকে উঠল। মনে হলো, আকাশ যেন নিজের কয়েকটি অশ্রুবিন্দু পৃথিবীর হাতে তুলে দিল।
আমরা উন্নয়নের নামে শহরকে কংক্রিটের বনে পরিণত করেছি। খাল ভরাট করেছি, জলাভূমি গ্রাস করেছি, পাহাড় কেটেছি, প্রাকৃতিক জলধারা বন্ধ করেছি। তারপর যখন বর্ষা তার স্বাভাবিক নিয়মে ফিরে আসে, তখন তাকেই দায়ী করি।
অথচ অপরাধী বর্ষা নয়।
অপরাধ আমাদের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দূরদৃষ্টির অভাব এবং প্রকৃতিবিমুখ উন্নয়ন দর্শনের।
বর্ষা আমাদের শেখায়—জল কখনো শত্রু নয়। তাকে পথ না দিলে সে নিজের পথ নিজেই তৈরি করে নেয়। জলকে শত্রুতে রূপান্তর করেছি আমরা নিজেরাই।
জানালার ওপারে আবার বৃষ্টি নামছে। আকাশ আরও গাঢ় হচ্ছে। দূরের সবুজ আরও গভীর সবুজে রূপ নিচ্ছে। মনে হচ্ছে পৃথিবী যেন নিজেকে ধুয়ে নতুন করে লিখছে।
আর আমি ভাবছি—সৌন্দর্য কখনো হারিয়ে যায় না। হারিয়ে যায় শুধু তাকে দেখার অবসর, মনোযোগ আর অনুভব করার ক্ষমতা।
ভেজা কাকটি যেন সেই হারিয়ে যাওয়া অবসরটুকুই ফিরিয়ে দিল।
বর্ষা তাই কেবল একটি ঋতুর নাম নয়; এটি আমাদের আত্মপরীক্ষার আয়না। সে প্রশ্ন করে—আমরা কি শুধু জলাবদ্ধতা দেখব, নাকি জলধারার সৌন্দর্যও? শুধু দুর্ভোগ দেখব, নাকি প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের শিক্ষা গ্রহণ করব?
হয়তো এ কারণেই বাংলা সাহিত্যে বর্ষা বারবার ফিরে আসে নতুন কবিতা হয়ে, নতুন গান হয়ে, নতুন দীর্ঘশ্বাস হয়ে। কারণ বর্ষা জানে—মানুষের শহর যতই কংক্রিটে ঢেকে যাক, মানুষের হৃদয়ের গভীরে এখনও একটি সবুজ জানালা খোলা আছে। সেই জানালার রেলিংয়ে আজও একটি ভেজা কাক নীরবে বসে থাকে, আর পৃথিবী প্রতিটি বর্ষায় নতুন করে আমাদের আলিঙ্গন করার অপেক্ষায় থাকে।
হয়তো সেই আলিঙ্গন গ্রহণ করলেই আমরা আবার ফিরে পাব শহরের হারানো সৌন্দর্য, প্রকৃতির সঙ্গে হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক এবং বৃষ্টিকে দেখার নতুন দৃষ্টি।

