দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহাসিক কান্তজিউ মন্দির পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন। মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে স্ত্রী ডিয়ান ডাওকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দেশের অন্যতম প্রাচীন ও নান্দনিক টেরাকোটা স্থাপত্যের এই নিদর্শন ঘুরে দেখেন।
কান্তজিউ মন্দিরে পৌঁছালে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্যরা ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও তাঁর স্ত্রীকে স্বাগত জানান। এ সময় স্থানীয়দের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদূতকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। পরে তিনি মন্দির প্রাঙ্গণে প্রদীপ প্রজ্বালন করেন এবং আরতি অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
টেরাকোটার কারুকাজে মুগ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রদূত
পরিদর্শনকালে ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন কান্তজিউ মন্দিরের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। মন্দিরের দেয়ালজুড়ে থাকা সূক্ষ্ম ও নান্দনিক টেরাকোটার ফলক, কারুকাজ এবং স্থাপত্যশৈলী গভীর আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।
এ সময় সংশ্লিষ্টরা মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে কান্তজিউ মন্দিরের ইতিহাস, নির্মাণশৈলী, প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব এবং বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক সম্পর্কে অবহিত করেন।
মন্দিরের বিভিন্ন স্থাপত্য নিদর্শন ও টেরাকোটার কারুকাজ দেখে প্রশংসা করেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। ঐতিহাসিক এই স্থাপনার শিল্পনৈপুণ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও তিনি ঘুরে দেখেন।
কান্তজিউ মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার কান্তনগর এলাকায় অবস্থিত কান্তজিউ মন্দির বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। টেরাকোটার অপূর্ব কারুকাজের জন্য মন্দিরটি দেশ-বিদেশে বিশেষভাবে পরিচিত।
মন্দিরের দেয়াল ও বিভিন্ন অংশে পোড়ামাটির ফলকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নানা ধরনের নকশা, পৌরাণিক কাহিনি, তৎকালীন সামাজিক জীবন ও বিভিন্ন চিত্র। ফলে এটি শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়, বাংলাদেশের ইতিহাস, স্থাপত্য ও লোকজ সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে দিনাজপুরের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর প্রতি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আগ্রহের বিষয়টিও সামনে এসেছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
নয়াবাদ ঐতিহাসিক মসজিদও পরিদর্শন
কান্তজিউ মন্দির পরিদর্শনের পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন নয়াবাদ ঐতিহাসিক মসজিদ পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি মসজিদের প্রাচীন স্থাপত্য, নির্মাণশৈলী ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চান।
সংশ্লিষ্টরা তাকে নয়াবাদ মসজিদের ইতিহাস ও প্রাচীন কারুকার্য সম্পর্কে অবহিত করেন। মসজিদের স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখে তিনি প্রশংসা করেন।
একই সফরে হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনা কান্তজিউ মন্দির এবং মুসলিম ঐতিহ্যের নয়াবাদ মসজিদ পরিদর্শন বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি চিত্র তুলে ধরে।
উপস্থিত ছিলেন প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কান্তজিউ মন্দির ও নয়াবাদ মসজিদ পরিদর্শনের সময় উপস্থিত ছিলেন দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ মঞ্জুরুল ইসলাম, দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক রফিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক ড. আহমেদ আবদুল্লাহ, কাহারোল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোকলেদা খাতুন মীম এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইশতিয়াক আহমেদ।
এ ছাড়া কাহারোল সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মনিরুজ্জামান, দিনাজপুর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম নবী দুলাল এবং রাজ দেবোত্তর এস্টেটের এজেন্ট রঞ্জিত সিংসসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্ব
স্থানীয়দের মতে, কান্তজিউ মন্দির ও নয়াবাদ মসজিদ দিনাজপুরের পর্যটন ও প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক ও দর্শনার্থীরা এসব ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখতে আসেন।
তাদের মতে, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ, পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং দেশ-বিদেশে এসব স্থাপনার ইতিহাস ও গুরুত্ব তুলে ধরতে পারলে দিনাজপুরের পর্যটন সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এ সফর ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি দিনাজপুরের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও পরিচিত করার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

