দিনাজপুরের বীরগঞ্জে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দীর্ঘ প্রায় এক যুগ ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণ হয়ে থাকা সিংড়া-রসুলপুর বালিয়া নদীর ওপর নবনির্মিত মৈত্রী সেতু উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রায় ২ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে পুনর্নির্মিত সেতুটি চালু হওয়ায় উপজেলার ভোগনগর ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হয়েছে। একই সঙ্গে দুই ইউনিয়নের লাখ লাখ মানুষের উপজেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ, কৃষিপণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় উপজেলার জাতীয় উদ্যান সিংড়া শালবন সংলগ্ন বৌদির মোড় বাজারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মৈত্রী সেতুটির উদ্বোধন করেন দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য আলহাজ মো. মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমা খাতুন।
প্রায় এক যুগ পর চালু হলো সেতু
স্থানীয় সূত্র ও এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, সিংড়া-রসুলপুর বালিয়া নদীর ওপর নির্মিত সেতুটি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দীর্ঘ ১২ থেকে ১৩ বছর ধরে ভোগনগর ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। সেতুটির ওপর দিয়ে স্বাভাবিক যান চলাচল বন্ধ থাকায় স্থানীয়দের বিকল্প ও দীর্ঘ পথ ব্যবহার করে উপজেলা শহরসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যেতে হতো।
এতে সময় ও পরিবহন ব্যয় দুটোই বেড়ে যায়। বিশেষ করে কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, রোগী ও সাধারণ যাত্রীদের জন্য এটি বড় ধরনের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর সরকারের অর্থায়নে ক্ষতিগ্রস্ত সেতুটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নে প্রায় ২ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।

কমবে যাতায়াতের দূরত্ব ও সময়
সেতুটি পুনরায় চালু হওয়ায় ভোগনগর ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের মানুষের উপজেলা সদর ও আশপাশের এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হয়েছে। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে সেতুটি চালু হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে।
এলজিইডির বীরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির বলেন, বন্যায় সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর প্রায় ১২ থেকে ১৩ বছর ধরে দুই ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক মানুষ চরম দুর্ভোগে ছিলেন। সরকারের উদ্যোগে প্রায় ২ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুটি পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকটের অবসান হয়েছে।
তিনি বলেন, সেতুটি চালু হওয়ায় উপজেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন কমবে। এতে সময় ও যাতায়াত ব্যয়ও সাশ্রয় হবে।
কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যে বাড়বে গতি
বীরগঞ্জের ভোগনগর ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের মানুষের জীবিকার সঙ্গে কৃষি ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। দীর্ঘদিন সেতুটি অচল থাকায় কৃষকদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করতে অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হতো।
সেতুটি চালু হওয়ায় এখন কৃষিপণ্য দ্রুত উপজেলা শহরসহ বিভিন্ন বাজারে নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা। এতে কৃষকরা সময়মতো পণ্য বাজারজাত করতে পারবেন এবং পরিবহন ব্যয়ও কমবে।
একই সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সেতুটিকে ঘিরে দুই ইউনিয়নের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবায়ও সুফল
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে স্থানীয় শিক্ষার্থী ও রোগীরাও উপকৃত হবেন। দীর্ঘদিন সেতুটি অচল থাকায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিকল্প পথে চলাচল করতে হতো। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও রোগীদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা অন্যান্য চিকিৎসাকেন্দ্রে নিতে অতিরিক্ত সময় লাগত।
মৈত্রী সেতু চালু হওয়ায় এসব ক্ষেত্রে মানুষের দুর্ভোগ কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে জরুরি রোগী পরিবহন ও দৈনন্দিন যাতায়াতে সেতুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যারা ছিলেন
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির উপদেষ্টা, ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি ও চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক এবং সাবেক ভিপি ও আসন্ন উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মো. রেজওয়ানুল ইসলাম রিজু।
এ ছাড়া বীরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সদস্য বাবু সুভাষ দাস, বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সুজালপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী শওকত জুলিয়াস জুয়েল, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক শাজাহান সিরাজ শিপন, উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব ও মরিচা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী তানভীর চৌধুরী, ভোগনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাজিউর রহমান রাজু, মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোপাল চন্দ্র দেবশর্মা, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে দুই ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধি, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান
স্থানীয়দের কাছে মৈত্রী সেতুটি শুধু একটি যোগাযোগ অবকাঠামো নয়; এটি দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে দুই ইউনিয়নের মানুষের যোগাযোগ সহজ করার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দীর্ঘ প্রায় এক যুগ পর সেতুটি পুনরায় চালু হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আনন্দ ও স্বস্তি দেখা গেছে।
সেতুটির মাধ্যমে ভোগনগর ও মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের মানুষের উপজেলা শহরের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হওয়ার পাশাপাশি কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসাক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
দীর্ঘদিনের ভোগান্তির পর প্রায় ২ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে পুনর্নির্মিত মৈত্রী সেতুর উদ্বোধন তাই বীরগঞ্জের দুই ইউনিয়নের মানুষের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

