দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জনবহুল বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিককে আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। এ সংকটের টেকসই সমাধানে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিকল্প নেই।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন মিয়ানমারে জাতীয় পুনর্মিলনবিষয়ক জাপান সরকারের বিশেষ দূত ও নিপ্পন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইয়োহেই সাসাকাওয়া। এ সময় রোহিঙ্গা সংকট, তাদের প্রত্যাবাসন, মিয়ানমারের পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের অন্যতম বড় সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমনিতেই একটি জনবহুল দেশ। এর মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে তাদের খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতা করে আসছে। তবে এভাবে অনির্দিষ্টকাল বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দিয়ে রাখা বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাপানের বিশেষ দূতকে তার অবস্থান থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
প্রত্যাবাসনে জাপানের সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের পাশে থাকার জন্য জাপান সরকারকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে গেলে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে। প্রত্যাবাসনের পর তাদের পুনর্বাসনেও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, মিয়ানমারে জাতীয় পুনর্মিলন ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় জাপানের ভূমিকা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পথকে আরও সহজ করতে পারে।
মিয়ানমারের পরিস্থিতি জটিল, সময় লাগবে প্রত্যাবাসনে
বৈঠকে ইয়োহেই সাসাকাওয়া বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের ওপর যে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত। রোহিঙ্গাদের সহায়তায় জাপান সরকারের বিভিন্ন অনুদান ও মানবিক সহযোগিতার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
বিশেষ দূত জানান, রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে। মিয়ানমার সরকার সংকট সমাধানে আন্তরিক বলে তিনি মনে করেন। তবে রাখাইন প্রদেশের বর্তমান জটিল পরিস্থিতির কারণে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি আনতে সময় লাগছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন, নিজের অবস্থান থেকে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন।
দ্বিপক্ষীয় উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে শুধু বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের দ্বিপক্ষীয় প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর না করে বহুপক্ষীয় উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের কার্যকর ও টেকসই সমাধান কঠিন। বিশেষ করে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরি, রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার পর তাদের পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের প্রস্তুতি
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসনে আগ্রহী এবং এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। তবে প্রত্যাবাসন অবশ্যই নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ হতে হবে।
তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে গিয়ে যেন নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে, সে পরিবেশ মিয়ানমারকেই নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের পর তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য মানবিক সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনকেন্দ্রের প্রস্তাব
সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে একটি ভ্যাকসিন উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনে সহযোগিতা করার জন্য জাপানের বিশেষ দূত ইয়োহেই সাসাকাওয়াকে আহ্বান জানান।
বিশেষ দূত বিষয়টি নিয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আশ্বাস দেন। বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে ভ্যাকসিন উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য খাতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণে আগ্রহ
বৈঠকে বাংলাদেশে জাপানের বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ জাপানের বিনিয়োগ পেতে আগ্রহী এবং দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।
দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে অর্থনৈতিক সহযোগিতায় আরও বিস্তৃত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিল্প, বিনিয়োগ ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক খাতে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা প্রধানমন্ত্রী তুলে ধরেন।
মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আগ্রহ
সাক্ষাতে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও উন্নত করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গা সংকটের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
বৈঠকের শুরুতে ইয়োহেই সাসাকাওয়া প্রধানমন্ত্রীকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান এবং বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, প্রায় ৫০ বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্য নিরসনে কাজ করছেন। মিয়ানমারে জাতীয় পুনর্মিলনবিষয়ক জাপান সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে তার ভূমিকার বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন তিনি।
বৈঠকে যারা উপস্থিত ছিলেন
সাক্ষাতে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন।
দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য মানবিক সংকটের পাশাপাশি অর্থনীতি, অবকাঠামো, পরিবেশ ও সামাজিক ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তাই নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করাকেই সংকট সমাধানের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ।

