ঢাকা রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

রোহিঙ্গা সংকটের ৯ বছর: ক্যাম্পে প্রজন্ম বদলালেও অনিশ্চিত প্রত্যাবাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: আগস্ট ২৫, ২০২৬, ১০:৩৬ এএম

রোহিঙ্গা সংকটের ৯ বছর: ক্যাম্পে প্রজন্ম বদলালেও অনিশ্চিত প্রত্যাবাসন

ছবিঃ সংগৃহীত

রাখাইনে জ্বলতে থাকা ঘরবাড়ি, স্বজনের লাশ আর ভয়াবহ নির্যাতনের স্মৃতি পেছনে ফেলে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের যে ঢল নেমেছিল, তার নয় বছর পূর্ণ হলো আজ মঙ্গলবার। মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দিয়ে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু দীর্ঘ নয় বছরেও সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি। নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় এখনো কক্সবাজার ও ভাসানচরের শরণার্থীশিবিরে দিন কাটছে লাখো রোহিঙ্গার।

২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান ও ব্যাপক সহিংসতার মুখে কয়েক মাসের মধ্যে সাড়ে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। সীমান্তবর্তী কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে দ্রুত গড়ে ওঠে বিশাল শরণার্থীশিবির। সময়ের সঙ্গে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতিতে পরিণত হয়।

তবে সংকট থামেনি সীমান্ত পার হওয়ার পরও। ২০২৪ সালে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হলে আবারও বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ফলে আগে থেকেই চাপের মুখে থাকা ক্যাম্পগুলোতে জনসংখ্যা, খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়।

১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভার

বর্তমানে কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ ৬৮ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছেন। এর বাইরে নোয়াখালীর ভাসানচরে রয়েছেন আরও ৩৩ হাজারের বেশি। ফলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ ছাড়িয়েছে।

শুধু নতুন করে আসা রোহিঙ্গারাই নয়, ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ২ লাখ ৬৬ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে। অর্থাৎ যে সংকট শুরু হয়েছিল একটি প্রজন্মের বাস্তুচ্যুতির মধ্য দিয়ে, তা এখন আরেকটি প্রজন্মের শরণার্থী পরিচয় নিয়ে বেড়ে ওঠার বাস্তবতায় পৌঁছেছে।

ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া এসব শিশুর অনেকেরই মিয়ানমারের নিজ ভূমি সম্পর্কে প্রত্যক্ষ কোনো স্মৃতি নেই। শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন, কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক সামাজিক জীবনের সুযোগ সীমিত থাকায় তাদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

বারবার উদ্যোগ, হয়নি প্রত্যাবাসন

রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গত নয় বছরে একাধিকবার আলোচনা ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালে প্রত্যাবাসন চুক্তি, রোহিঙ্গাদের তালিকা যাচাই এবং বিভিন্ন সময়ে প্রত্যাবাসনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনো প্রক্রিয়াই বাস্তবে সফল হয়নি।

এর প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, চলাচলের স্বাধীনতা, নিজ বসতভিটায় ফেরার অধিকার এবং মিয়ানমারে ফিরে গেলে আবারও নির্যাতনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা। এসব বিষয়ে নিশ্চয়তা না পাওয়ায় রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ প্রত্যাবাসনে আস্থা দেখায়নি।

রাখাইনে সংঘাত, আরও অনিশ্চয়তা

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে রাখাইন রাজ্যের চলমান সংঘাত। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষের কারণে অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল।

ফলে সেখানে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, বসবাসের সুযোগ এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা যাবে কি না—তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশও বারবার বলে আসছে, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত জোর করে কাউকে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়।

 

কমছে সহায়তা, বাড়ছে সংকট

দীর্ঘস্থায়ী এই শরণার্থী সংকটে আন্তর্জাতিক সহায়তাও ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে। খাদ্য সহায়তা, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য মানবিক কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থের সংকট তৈরি হওয়ায় ক্যাম্পের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

একই সঙ্গে ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে অগ্নিকাণ্ড, অপহরণ, মানবপাচার, মাদক ও বিভিন্ন অপরাধের ঝুঁকিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় তরুণদের একটি অংশ অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

চাপ বাড়ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও

রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব শুধু ক্যাম্পের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষের অবস্থানের কারণে উখিয়া-টেকনাফসহ আশপাশের এলাকার পরিবেশ, বনভূমি, পানি, যোগাযোগব্যবস্থা ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অনেকেই জীবিকা, পণ্যের মূল্য, শ্রমবাজার ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে নানা সমস্যার কথা বলে আসছেন। ফলে রোহিঙ্গা সংকট এখন শুধু মানবিক বা কূটনৈতিক সমস্যা নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জেও পরিণত হয়েছে।

সমাধানের পথ কোথায়?

বাংলাদেশের অবস্থান শুরু থেকেই স্পষ্ট—রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই সংকটের একমাত্র দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। এজন্য মিয়ানমারে তাদের নাগরিকত্বের অধিকার, নিরাপত্তা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং বসতভিটায় ফেরার নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

ঢাকা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে আসছে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরছে বাংলাদেশ।

নয় বছর পর রোহিঙ্গা সংকটের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—ক্যাম্পে মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, প্রজন্ম বদলাচ্ছে, কিন্তু প্রত্যাবাসনের পথ এখনো অনিশ্চিত। ২০১৭ সালের সেই ভয়াবহ দিনগুলোর স্মৃতি আজও বহন করছেন রোহিঙ্গারা। তাদের সামনে এখন একটাই প্রশ্ন—কবে ফিরবেন নিজের দেশে, আর ফিরলেও সেখানে কি মিলবে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মর্যাদার নিশ্চয়তা?

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!