চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়েছে সরকার। অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই ও আগস্টে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে প্রাথমিক হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। অথচ পুরো অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনীতিতে বিদ্যমান চাপ, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ধীরগতি, করজালের সীমাবদ্ধতা এবং রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি—সব মিলিয়ে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তবে শুধু প্রশাসনিক অদক্ষতাকেই ঘাটতির একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না তারা। কর আদায়ের কাঠামোগত দুর্বলতা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি এবং উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রাও এর সঙ্গে যুক্ত।
দুই মাসেই বড় ঘাটতি
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। আগের অর্থবছর ২০২৫-২৬-এ এনবিআরের প্রকৃত রাজস্ব আদায় ছিল প্রায় ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। সরকারি ও সংসদীয় তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, যা নির্ধারিত ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ।
এরই মধ্যে নতুন অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা এক লাফে আরও বড় করা হয়েছে। আগের অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি। স্বাধীনতার পর দেশের রাজস্ব আদায়ে বছরে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধিও সাধারণত ২৭ শতাংশের বেশি হয়নি। ফলে এক অর্থবছরে প্রায় ৪৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন রয়েছে।
প্রথম দুই মাসের ঘাটতির চিত্র সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
ভ্যাট আদায়েও ধাক্কা
রাজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট। কিন্তু চলতি অর্থবছরের শুরুতেই ভ্যাট আদায়ে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। জুলাইয়ে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ভ্যাট আদায় কমেছে। আগস্টেও একই ধরনের প্রবণতা অব্যাহত ছিল বলে সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যের গতি কমে গেলে ভ্যাট, আয়কর ও আমদানি পর্যায়ের শুল্ক—তিন ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়তে পারে। বিনিয়োগ কমে গেলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ধীর হয়, আর উৎপাদন ও ভোগ কমলে সরকারের রাজস্ব আয়ও প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ে না।
ফলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সময় অর্থনীতির বাস্তব সক্ষমতা, ব্যবসায়িক কার্যক্রম, আমদানি-রপ্তানি পরিস্থিতি এবং করদাতার সক্ষমতাকে কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে—সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
‘অদক্ষ পরিচালনা’ কতটা দায়ী?
রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি দেখা দিলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এর পেছনে কি শুধু অর্থনৈতিক মন্দা বা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের ধীরগতি দায়ী, নাকি রাজস্ব প্রশাসনের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনাগত দুর্বলতাও ভূমিকা রাখছে?
অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যে কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এর অর্থ হলো, বিদ্যমান করদাতাদের কাছ থেকে আরও কার্যকরভাবে রাজস্ব আদায় এবং করের আওতার বাইরে থাকা যোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করজালের মধ্যে আনা গেলে রাজস্ব আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
তবে রাজস্ব ঘাটতির পুরো দায় প্রশাসনিক অদক্ষতার ওপর দেওয়া ঠিক হবে না। কারণ চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রাটিই আগের বছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় অনেক বেশি। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে বিনিয়োগ, উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি ও ভোগের গতিও রাজস্ব আদায়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সরকারের ব্যয়ের চাপও বাড়ছে
রাজস্ব আদায় কমলেও সরকারের ব্যয়ের চাপ কমছে না। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানি খাতে লোকসান ও ভর্তুকির চাপ এবং উন্নয়ন ও অন্যান্য সরকারি ব্যয়—সব মিলিয়ে সরকারের অর্থের প্রয়োজন বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কারণে অর্থনীতি চাপের মধ্যে রয়েছে। রাজস্ব আয় যে হারে বাড়ছে, তার তুলনায় সরকারি ব্যয়ের চাপ দ্রুত বাড়ছে। ফলে সামনে সরকারকে আরও কঠিন আর্থিক সমীকরণের মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।
তার মতে, ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভর্তুকি কমানোর ক্ষেত্রে কৌশল প্রয়োজন। জ্বালানির দাম বাড়লে এর প্রভাব অন্যান্য পণ্য ও সেবার দামেও পড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করবে।
করজাল বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে
রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি কাটাতে নতুন করে সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা না চাপিয়ে কর প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন।
তার মতে, কর প্রশাসনে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি যারা কর দেওয়ার যোগ্য অথচ এখনো করজালের বাইরে রয়েছেন, তাদের করের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে কর পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
এতে করদাতার হয়রানি কমার পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়ানো সম্ভব হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন
চলতি অর্থবছরে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। আগের অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় এই লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি।
স্বাধীনতার পর রাজস্ব আদায়ে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি কখনো ২৭ শতাংশের বেশি না হওয়ার প্রেক্ষাপটে এত বড় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শুধু নিয়মিত কর আদায় বাড়ালেই হবে না। নতুন করদাতা শনাক্তকরণ, কর ফাঁকি বন্ধ, আমদানি-রপ্তানি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঠিক মূল্যায়ন এবং কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন প্রয়োজন হবে।
একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সামঞ্জস্যও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে না পারলে শুধু প্রশাসনিক নির্দেশনা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় বছরের বাকি সময় রাজস্ব আদায়ের গতি বাড়ানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বছরের শেষ দিকে গিয়ে বড় অঙ্কের ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করলে ব্যবসা ও করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরির ঝুঁকি থাকে।
তাই রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে হবে, অন্যদিকে করজাল সম্প্রসারণ, ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার, কর ফাঁকি রোধ এবং কর প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলায় শুধু আদায়ের পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা নয়—কীভাবে করদাতার আস্থা বাড়িয়ে, কর ব্যবস্থা সহজ করে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের মাধ্যমে টেকসইভাবে রাজস্ব বাড়ানো যায়, সেটিই হবে মূল বিষয়।
মূল তথ্য এক নজরে
২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্য: ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা
প্রথম দুই মাসে আনুমানিক ঘাটতি: ২৯ হাজার কোটি টাকা
২০২৫-২৬ অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্য: ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি তথ্য অনুযায়ী আদায়: ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা
নতুন লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধির হার: আগের অর্থবছরের প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ
প্রধান চ্যালেঞ্জ: রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা, করজাল সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি ও ব্যয় ব্যবস্থাপনা
গতানুগতিক রাজস্ব আহরণে থাকলে লক্ষ্যমাত্রার ৭৬ শতাংশও পূরণ হবে না
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) যদি রাজস্ব আহরণের গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে কার্যকর ও আধুনিক কৌশল গ্রহণ করতে না পারে, তাহলে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় ৪৫০ থেকে ৪৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায়ের হার প্রায় ৭৬.১৬ শতাংশে নেমে আসতে পারে, যা গত অর্থবছরের তুলনায়ও কম হবে।
রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো না গেলে বড় অঙ্কের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে অর্থবছরের শুরুতেই রাজস্ব আদায়ে ঘাটতির যে প্রবণতা দেখা দিয়েছে, তা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে রাজস্ব বাড়ানোর পরিবর্তে করজালের বাইরে থাকা যোগ্য ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে করের আওতায় আনা, কর পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে রাজস্ব প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে জবাবদিহি ও দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় উচ্চ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় করা কঠিন হতে পারে।
ফলে চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এনবিআর গতানুগতিক পদ্ধতির পরিবর্তে কতটা কার্যকর সংস্কার, প্রযুক্তিনির্ভরতা ও করজাল সম্প্রসারণ করতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

