ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬

menu

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নেপথ্যের তথ্য সামনে এল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ০২:৫০ পিএম

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নেপথ্যের তথ্য সামনে এল

ছবিঃ সংগৃহীত

পরিবারের অভাব দূর করে স্বজনদের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের দরিদ্র কৃষক আব্দুল বাছিরের বড় ছেলে নজরুল ইসলাম (২২)। পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় প্রবাসে গিয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। সৌদি আরবের মক্কায় তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে পরিবারজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো গ্রাম।

নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁর স্বজনেরা। তাঁদের অভিযোগ, পরিবারের সদস্যদের আগে থেকে না জানিয়ে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য ছাড়াই গোপনে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এ ঘটনায় তাঁরা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।

পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা বাংলাদেশ ও সৌদি আরব—উভয় দেশের সরকারের কাছে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

পরিবারের একমাত্র ভরসা ছিলেন নজরুল

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, বিরামপুর গ্রামের দরিদ্র কৃষক আব্দুল বাছিরের বড় ছেলে নজরুল ইসলাম ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর জীবিকার সন্ধানে সৌদি আরবে যান। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করে মা-বাবা ও ভাই-বোনদের ভালো রাখাই ছিল তাঁর স্বপ্ন। সৌদি আরবে পৌঁছে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি।

চার ভাই-বোনের মধ্যে নজরুল ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর আয়ের ওপর নির্ভর করত পরিবারের দৈনন্দিন খরচ ও ভবিষ্যতের নানা প্রত্যাশা। বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের অভাব ঘোচানোর যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর খবরে সেই পরিবার এখন অনিশ্চয়তা ও গভীর শোকের মুখে পড়েছে।

গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘদিন কারাবন্দী

স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর মক্কা নগরীর একটি মসজিদে সুইটি আক্তার নামের এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে নজরুল ও ওই তরুণীকে গ্রেপ্তার করে দেশটির পুলিশ। এরপর তাঁদের কারাগারে রাখা হয়।

পরিবারের দাবি, দীর্ঘ তিন বছর তিন মাস কারাবন্দী থাকার পর গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) সৌদি আরব সরকার তাঁদের দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। তবে মামলার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, আদালতের রায়, আপিলের সুযোগ এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

গণমাধ্যমের খবর দেখে মৃত্যুর সংবাদ জানতে পারে পরিবার

নজরুলের স্বজনদের অভিযোগ, কারাগারে থাকাকালে তিনি প্রতি রোববার টেলিফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দিন বা তার আগে পরিবারকে এ বিষয়ে কোনো পূর্ববার্তা দেওয়া হয়নি বলে দাবি তাঁদের।

স্বজনেরা জানান, গত বুধবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ দেখেই তাঁরা নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানতে পারেন। প্রবাসে থাকা সন্তানের এমন পরিণতির খবর আকস্মিকভাবে পাওয়ায় পরিবারে শোকের মাতম শুরু হয়।

নজরুলের মা রহিমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের না জানিয়ে এবং আমার ছেলেকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগ না দিয়েই গোপনীয়তার সঙ্গে তাকে মেরে ফেলা হয়েছে।’

মায়ের এই বক্তব্যে সন্তানের মৃত্যুকে ঘিরে পরিবারের গভীর শোক ও ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটেছে। তবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি ও সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।

ছেলের মৃত্যুতে অসুস্থ বাবা, ফুফুর মৃত্যু

নজরুলের মৃত্যুর সংবাদ শোনার পর তাঁর বাবা আব্দুল বাছির বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। শোকের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। দরিদ্র এই কৃষকের কাছে এখন সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা, ছেলের মরদেহ যেন দেশের মাটিতে ফিরিয়ে এনে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে পারেন।

আব্দুল বাছির আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার ছেলে কী অপরাধ করেছে, একমাত্র আল্লাহই জানেন। এখন আমি শুধু আমার সন্তানের মরদেহ দেশের মাটিতে ফিরে পেতে চাই।’

এদিকে, ভাইপোর মৃত্যুর খবর শোনার পর বুধবার রাতেই হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান নজরুলের আপন ফুফু আবেদা বেগম। একই পরিবারের ওপর পরপর এমন শোকের ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর বেদনা।

শোকাহত বিরামপুর, মরদেহ দেশে ফেরানোর দাবি

নজরুলের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তাঁর বাড়িতে ভিড় করছেন আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে আসছেন প্রতিবেশীরাও। তাঁদের ভাষ্য, পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যাওয়া একজন তরুণের এমন পরিণতি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

স্থানীয় বাসিন্দারা নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ এবং পরিবারের উত্থাপিত অভিযোগগুলো যথাযথভাবে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁরা নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তাঁদের মতে, প্রবাসে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক গুরুতর আইনি জটিলতায় পড়লে তাঁর পরিবারকে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো, আইনি সহায়তার সুযোগ সম্পর্কে অবহিত করা এবং দূতাবাসের মাধ্যমে সহযোগিতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশও পরিবারের উদ্বেগ দূর করতে সহায়ক হতে পারে।

সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রত্যাশা

নজরুলের পরিবারের সদস্যদের দাবি, তাঁদের ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হোক এবং তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিক। এ জন্য বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতা কামনা করেছেন তাঁরা।

পরিবারের অভিযোগের পাশাপাশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া, মামলার রায় এবং কনস্যুলার সহায়তার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানা গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে সরকারি বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।

একদিকে সন্তান হারানোর শোক, অন্যদিকে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে দিশাহারা নজরুলের পরিবার। প্রিয়জনের শেষ বিদায়ের অপেক্ষায় থাকা পরিবারটি এখন তাকিয়ে আছে সরকারের উদ্যোগের দিকে।
 

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!