মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ প্রসঙ্গ এবং তাঁকে ঘিরে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁর দাবি, মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ইশরাক হোসেন নতুনভাবে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছিলেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার কারণে তিনি ফাঁদে পড়েছেন।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকালে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
ইশরাক হোসেনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘ইশরাক ভাই নতুনভাবে রাজনীতিতে নেমেছেন। উনার মতলব ভালো ছিল, মাদকের বিষয়টি যাতে বন্ধ হয়। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতায় ফাঁদে পড়লেন তিনি।’
‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দোষ করেন, আরেকজন পাপের ভোগান্তিতে পড়েন’
ইশরাক হোসেনকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতাকে দায়ী করেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তাঁর ভাষ্য, এ ঘটনায় দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে এবং এর পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে অন্য একজনকে।
তিনি বলেন, ‘সমস্যাটা তো হলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। গুলি কেন খেলেন ইশরাক ভাই? অর্থাৎ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দোষ করেন। আরেকজন এই পাপে ভোগেন। এটা আসলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতা। মাঝখান দিয়ে ইশরাক ভাই ফাঁদে পড়ে গেলেন।’
তাঁর এ বক্তব্যে ইশরাক হোসেনকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক প্রশ্ন উঠে এসেছে। তবে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা বিনিময়ের সময় দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন এনসিপির এই নেতা। তাঁর অভিযোগ, বিএনপি সরকার সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বললেও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘হিন্দুধর্মের ধর্মাবলম্বী যারা রয়েছেন, আমরা শুনেছিলাম, বিএনপি সরকার নাকি সবাইকে নিরাপত্তা দেবে। কিন্তু হিন্দু ভাইয়েরা ভালো নেই। বিএনপি সরকার তাদের ভালোভাবে নিরাপত্তা দিতে পারেনি।’
তিনি আরও দাবি করেন, গত তিন-চার মাসের ঘটনাপ্রবাহের তথ্যেও বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুরের ঘটনা দেখা গেছে। তবে তিনি যে তথ্য-উপাত্তের কথা উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ বা পরিসংখ্যান বক্তব্যে তুলে ধরা হয়নি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা নিয়ে সম্প্রীতির আহ্বান
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই-সংক্রান্ত ইস্যু নিয়েও বক্তব্য দেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেন, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁদের উদ্বেগের কথা তুলে ধরতে তাঁর মাধ্যমে সামনে এনেছেন। এ ধরনের ঘটনায় ধর্মীয় অনুভূতি ও পারস্পরিক সম্মানের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্দেশে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, সব ধরনের কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে এমনভাবে এগোতে হবে, যাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ ক্ষুব্ধ, দুঃখিত বা আঘাতপ্রাপ্ত বোধ না করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি আমার মুসলিম ভাইদের বলব, আমরা সবকিছুই করব। তবে হিন্দু ভাইয়েরা যাতে কোথাও ক্ষোভ, দুঃখ বা আঘাত না পান, এই বিষয়টা আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে।’
একই সঙ্গে এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার কারণে তাঁকে যেন কোনো বিশেষ রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের তকমা দেওয়া না হয়, সেই অনুরোধও জানান তিনি। তাঁর মতে, কোনো সম্প্রদায়ের উদ্বেগের কথা তুলে ধরা মানেই অন্য কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সম্প্রীতি বজায় রাখাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
ভুল-বোঝাবুঝি দূর করতে আলোচনার প্রস্তাব
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো পক্ষের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হয়ে থাকলে আলোচনার মাধ্যমে তা নিরসনের আহ্বান জানান এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক।
তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত পরস্পরের সঙ্গে বসে কথা বলা। প্রয়োজনে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে তাঁদের বক্তব্য ও উদ্বেগ বোঝার চেষ্টা করতে হবে। একইভাবে তাঁরাও আলোচনায় বসতে আগ্রহী বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ভাষ্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও আলোচনার মাধ্যমে ভুল-বোঝাবুঝির অবসান ঘটানো সম্ভব। এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যাতে কোনো সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের অবহেলিত বা আহত মনে করেন।
রাজনৈতিক বক্তব্যে নিরাপত্তা ও সম্প্রীতির প্রসঙ্গ
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্যে একদিকে ইশরাক হোসেনকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা উঠে এসেছে, অন্যদিকে দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
তিনি মনে করেন, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো সরকারের দায়িত্ব। পাশাপাশি কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক বিভাজন বা পারস্পরিক বিরোধ বাড়তে না দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা প্রয়োজন।
তবে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ প্রসঙ্গ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।

