ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬

menu

ওসমানী উদ্যানে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী, খোদাই করা হয়েছে ৮৩৪ শহীদের নাম

ঢাকা প্রতিনিধি

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ০২:২৩ পিএম

ওসমানী উদ্যানে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী, খোদাই করা হয়েছে ৮৩৪ শহীদের নাম

ছবিঃ সংগৃহীত

ঐতিহাসিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বীর শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই অনুষ্ঠানে আধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে নতুন করে সাজানো ওসমানী উদ্যানেরও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তিনি। স্মৃতিস্তম্ভে গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ৮৩৪ জনের নাম খোদাই করা হয়েছে। অন্যদিকে, সবুজায়ন, জলাশয়, হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা যুক্ত করে উদ্যানটিকে নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী ওসমানী উদ্যানে পৌঁছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এ সময় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আত্মদানকারী শহীদদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে তিনি স্মৃতিস্তম্ভের ফলক উন্মোচন করেন। উদ্বোধনের এই আয়োজনে শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ত করা হয়।

অনুষ্ঠানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী সেখানে একটি বৃক্ষরোপণ করেন। পরে তিনি নবসজ্জিত উদ্যান ও সেখানে স্থাপিত গ্রন্থাগার ঘুরে দেখেন।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

৯০ ফুট উঁচু স্মৃতিস্তম্ভে ৮৩৪ শহীদের নাম

ওসমানী উদ্যানের প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মিত হয়েছে ৯০ ফুট উঁচু জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, সর্বাধুনিক লেজার কাটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্তম্ভের গায়ে খোদাই করা হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ৮৩৪ জনের নাম। এর মাধ্যমে শহীদদের আত্মত্যাগকে স্থায়ীভাবে স্মরণে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্মৃতিস্তম্ভের সামনে স্থাপন করা হয়েছে ২০টি শুভ্র প্রতীকী সমাধিফলক। পুরো স্থাপনাটির নকশায় স্মৃতি, শ্রদ্ধা ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের অংশে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে চার ফুট উঁচু এবং ভেতরের অংশে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে সাত ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে।

এই ভাস্কর্যে বাঙালির স্বাধীনতা, অধিকার আদায় এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ ও চেতনার প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে।

স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের সমন্বয়ে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি শুধু একটি স্মারক স্থাপনা নয়, বরং দেশের বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে একসঙ্গে তুলে ধরার একটি প্রয়াস। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এসব আন্দোলনের ইতিহাস পৌঁছে দিতে এ ধরনের স্মৃতিচিহ্ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে উদ্বোধন

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্মৃতিস্তম্ভের ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এতে শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের অবদান ও বেদনার প্রতিও শ্রদ্ধা জানানোর বার্তা উঠে এসেছে।

শহীদ আবু সাঈদ, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ, শাহারিয়ার খাঁন আনাস ও ওয়াসিম আকরামের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের ইতিহাসে এসব শহীদের আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষেত্রে স্মৃতিস্তম্ভটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হয়ে উঠতে পারে।

উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতীকী বার্তা বহন করে। একই সঙ্গে উদ্যানের বিভিন্ন অবকাঠামো ও নাগরিক সুবিধা পরিদর্শনের মাধ্যমে এর নতুন রূপ সম্পর্কে ধারণা নেন তিনি।

২৩ একরের ওসমানী উদ্যান পেল নতুন রূপ

রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত প্রায় ২৩ একর আয়তনের ওসমানী উদ্যানকে নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। একে সবুজ, পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নগরবাসীর হাঁটাচলা, শরীরচর্চা, বিশ্রাম ও অবসর কাটানোর জন্য বিভিন্ন সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।

উদ্যানের পুরোনো দীঘি বা জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি নতুন করে আরও পাঁচটি নান্দনিক জলাশয় তৈরি করা হয়েছে। জলাশয় ও সবুজ এলাকার সমন্বয়ে উদ্যানের প্রাকৃতিক পরিবেশ আরও আকর্ষণীয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বিদ্যমান পুরোনো গাছপালা অক্ষুণ্ণ রেখে উদ্যানের বিভিন্ন স্থানে সবুজ দ্বীপ সাজানো হয়েছে। নগরজীবনের ব্যস্ততার মধ্যে এমন সবুজ উন্মুক্ত স্থান মানুষের মানসিক প্রশান্তি, শরীরচর্চা এবং সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার ও গ্রন্থাগার

উদ্যানটিতে দর্শনার্থীদের চলাচল ও শরীরচর্চার সুবিধার্থে তৈরি করা হয়েছে ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ হাঁটার পথ বা ওয়াকওয়ে। পাশাপাশি রয়েছে খোলামেলা ব্যায়ামাগার, বিশ্রামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার এবং গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা।

এসব সুবিধার মাধ্যমে উদ্যানটিকে শুধু অবসর কাটানোর স্থান নয়, বরং নিয়মিত হাঁটাচলা ও শরীরচর্চার উপযোগী নাগরিক পরিসর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সময় কাটানো, বই পড়া কিংবা সবুজ পরিবেশে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগও বাড়বে বলে আশা করা যায়।

উদ্যানের ভেতরে স্থাপিত গ্রন্থাগার জ্ঞানচর্চা ও পাঠাভ্যাস বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। নাগরিক বিনোদনকেন্দ্রের সঙ্গে গ্রন্থাগারের মতো জ্ঞানভিত্তিক সুবিধা যুক্ত হওয়ায় উদ্যানটির ব্যবহার আরও বহুমুখী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

দুই মিটার উঁচু ওভারপাস ওয়াকওয়ে ও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ

ওসমানী উদ্যানের অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে সড়ক থেকে প্রায় দুই মিটার উঁচুতে বিশেষ ওভারপাস ওয়াকওয়ে তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে উদ্যানের বিভিন্ন অংশে চলাচলের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

এ ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য যুক্ত করা হয়েছে ওয়াটার হারভেস্টিং প্রযুক্তি। এর আওতায় ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার বৃষ্টির পানি সংরক্ষণব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে বলে দেওয়া তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। এ ধরনের ব্যবস্থা বৃষ্টির পানির কার্যকর ব্যবহার এবং পানির অপচয় কমানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

নগর এলাকায় বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, জলাশয় রক্ষা ও সবুজায়ন পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ওসমানী উদ্যানের উন্নয়নকাজে এসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় নাগরিক সুবিধার পাশাপাশি পরিবেশগত দিকেও গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে।

স্মৃতির সংরক্ষণ ও নাগরিক সুবিধার সমন্বয়

জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন এবং ওসমানী উদ্যানের নতুন রূপের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন—দুটি উদ্যোগের মাধ্যমে একই স্থানে ইতিহাস সংরক্ষণ ও নগরবাসীর বিনোদন সুবিধা সম্প্রসারণের সমন্বয় ঘটেছে।

স্মৃতিস্তম্ভটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে নির্মিত হলেও এর ভাস্কর্যে বাঙালির দীর্ঘ গণতান্ত্রিক ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ধারাবাহিকতাও তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে, উদ্যানের আধুনিকায়নের মাধ্যমে রাজধানীর মানুষের জন্য উন্মুক্ত সবুজ পরিসর, শরীরচর্চা ও অবসর বিনোদনের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নগরায়ণের চাপে রাজধানীতে উন্মুক্ত স্থান ও সবুজ এলাকার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। তাই উদ্যানের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, জলাশয় সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে স্মৃতিস্তম্ভ ও ভাস্কর্যের যথাযথ সংরক্ষণ এবং ঐতিহাসিক তথ্যের নির্ভুল উপস্থাপনও গুরুত্বপূর্ণ।

জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের মাধ্যমে শহীদদের আত্মত্যাগ স্মরণে রাখা এবং ওসমানী উদ্যানকে আধুনিক নাগরিক পরিসর হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ রাজধানীর ইতিহাস, পরিবেশ ও নাগরিক জীবনের সঙ্গে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!