‘আল্লাহ, আমাকে খাবার দাও, স্ত্রীকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি’—দুমুঠো খাবারের জন্য এমন আকুতি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসা ৮০ বছর বয়সী সাজু শেখের স্ত্রী নূরজাহান বেগম (৭৫) আর নেই। দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী থাকার পর রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শেরপুর সদর উপজেলার কামারিয়া ইউনিয়নের খুনুয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। একই দিন বিকেল ৫টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
নূরজাহান বেগমের মৃত্যুতে স্ত্রীকে ঘিরে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও অসহায় জীবনের এক অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তবে বার্ধক্য, দারিদ্র্য ও নানা সংকটের সঙ্গে লড়াই করা বৃদ্ধ সাজু শেখ এখন জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে আরও নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন।
ছয় বছর ধরে শয্যাশায়ী ছিলেন নূরজাহান
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ছয় বছর আগে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় নূরজাহান বেগমের। এরপর থেকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার সক্ষমতা হারিয়ে তিনি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকলেও অভাবের সংসারে তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
অসুস্থ স্ত্রীর দেখাশোনা, খাবার জোগাড় এবং সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন বৃদ্ধ সাজু শেখ। বয়সের ভারে ন্যুব্জ এই মানুষটির পক্ষে একদিকে স্ত্রীর সেবা-যত্ন করা, অন্যদিকে দুজনের খাবার ও ওষুধের ব্যবস্থা করা ছিল কঠিন চ্যালেঞ্জ।
দারিদ্র্যের কারণে তাঁদের দৈনন্দিন জীবন কাটত অনিশ্চয়তার মধ্যে। প্রয়োজনীয় খাবার, ওষুধ ও অন্যান্য খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হতো। অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে কীভাবে দিন কাটবে, সেই দুশ্চিন্তাই ছিল বৃদ্ধ সাজু শেখের নিত্যসঙ্গী।
প্রায় ৬৫ বছরের সংসার, ছয় সন্তানের পরিবার
সাজু শেখ ও নূরজাহান বেগমের দাম্পত্য জীবন ছিল প্রায় ৬৫ বছরের। দীর্ঘ এই সংসারজীবনে তাঁদের তিন মেয়ে ও তিন ছেলে রয়েছে। তিন মেয়েরই বিয়ে হয়েছে। তবে বার্ধক্য ও অসুস্থতার সময় তাঁদের পাশে নিয়মিত থাকার মতো পারিবারিক সহায়তা সীমিত ছিল বলে জানা গেছে।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, মেয়েদের কেউ কেউ মাঝেমধ্যে বাবার খোঁজখবর নেন। তিন ছেলের মধ্যে একজন করোনাকালে নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেও মাঝেমধ্যে যোগাযোগ রাখেন বলে জানা গেছে। আরেক ছেলে ঢাকায় রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন এবং বছরে দু-একবার বাড়িতে আসেন।
এ অবস্থায় অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে নিজেদের মতো করে দিন পার করার চেষ্টা করছিলেন সাজু শেখ। বয়সের ভার, অভাব আর স্ত্রীর চিকিৎসার চিন্তা—সব মিলিয়ে তাঁদের জীবন হয়ে উঠেছিল কঠিন সংগ্রামের।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে অসহায়ত্বের ভিডিও
কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে অসুস্থ স্ত্রীকে কোলে নিয়ে খাবারের জন্য আকুতি জানাতে দেখা যায় সাজু শেখকে। ‘আল্লাহ, আমাকে খাবার দাও, স্ত্রীকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি’—তাঁর এই অসহায় আবেদন মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে বহু মানুষ তাঁদের দুরবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন। বৃদ্ধের অসহায়ত্ব এবং অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়। অনেকেই তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
এরপর বিভিন্ন ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের খোঁজখবর নেওয়া হয়। তাঁদের কাছে মানবিক সহায়তাও পৌঁছে দেওয়া হয়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা স্বস্তি মিললেও দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, বার্ধক্য ও দারিদ্র্যের বাস্তবতা থেকে পুরোপুরি মুক্তি মেলেনি।
সহায়তা এলেও থামেনি অসুস্থতা ও বার্ধক্যের লড়াই
মানুষের সহমর্মিতা ও সহায়তা পাওয়ার পরও নূরজাহান বেগমের অসুস্থতা কাটেনি। দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থাকা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়ার সীমাবদ্ধতার মধ্যে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানেন তিনি।
রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিজ বাড়িতেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে বিকেল ৫টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
স্থানীয় ইউপি সদস্য ইলিয়াস মিয়া নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ওই বৃদ্ধা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নিজ বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়।
জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে একা সাজু শেখ
দীর্ঘ প্রায় ৬৫ বছরের সংসারজীবনে সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়া জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে এখন একা সাজু শেখ। অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে যে মানুষটি মানুষের কাছে সাহায্যের আকুতি জানিয়েছিলেন, তাঁর জীবনে নেমে এসেছে নতুন শূন্যতা।
সাজু শেখ ও নূরজাহান বেগমের ঘটনা শুধু একটি পরিবারের দুঃখের গল্প নয়; এটি গ্রামীণ জীবনে প্রবীণ মানুষের দারিদ্র্য, চিকিৎসাসংকট এবং সামাজিক নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে এনেছে। বিশেষ করে অসুস্থ ও অসহায় প্রবীণ দম্পতির জন্য নিয়মিত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত খাবার এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা কতটা জরুরি, তাঁদের জীবনসংগ্রাম সেই প্রশ্ন আবারও সামনে এনেছে।
নূরজাহান বেগমের মৃত্যুতে দীর্ঘদিনের সঙ্গীকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন সাজু শেখ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তাঁর সেই আকুতি মানুষের মনে যে বেদনা তৈরি করেছিল, জীবনসঙ্গীর মৃত্যু সেই বেদনাকে আরও গভীর করে তুলেছে।

