ঢাকা মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬

menu

কুষ্টিয়ায় লালন আখড়াবাড়িতে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার, আতঙ্কে বাউল সাধুরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ০২:৩১ পিএম

কুষ্টিয়ায় লালন আখড়াবাড়িতে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধার, আতঙ্কে বাউল সাধুরা

ছবিঃ সংগৃহীত

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ফকির লালন সাঁইয়ের আখড়াবাড়ির প্রধান ফটকের কাছ থেকে বোমাসদৃশ বস্তু, দুই লিটার পেট্রোল ও দুটি সার্কিটসদৃশ বস্তু উদ্ধার করেছে পুলিশ। লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আখড়াবাড়িতে তিন দিনব্যাপী উৎসব চলার মধ্যে এ ঘটনায় সাধু, বাউল ও দর্শনার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে মাজারের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা বস্তুটি নিষ্ক্রিয় করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

রোববার (১৮ অক্টোবর) দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টার দিকে আখড়াবাড়ির প্রধান ফটকের কাছে একটি সাদা ব্যাগ থেকে এসব বস্তু উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় কে বা কারা ব্যাগটি সেখানে রেখেছে, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

যেভাবে উদ্ধার হলো বোমাসদৃশ বস্তু

পুলিশের বরাত দিয়ে জানা গেছে, রোববার দিবাগত রাত ১২টার দিকে আখড়াবাড়ির প্রধান ফটকের কাছে একটি সাদা রঙের ব্যাগ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় এক চায়ের দোকানদার। ব্যাগটি খুলে তিনি লাল টেপ দিয়ে মোড়ানো বোমাসদৃশ একটি বস্তু, দুই লিটার পেট্রোল এবং দুটি সার্কিটসদৃশ বস্তু দেখতে পান।

বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি দ্রুত কুমারখালী থানা-পুলিশ ও মেলার আয়োজক কমিটিকে খবর দেন। খবর পেয়ে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে নিরাপত্তার স্বার্থে এলাকাটি ঘিরে রাখা হয় এবং আখড়াবাড়ির মূল ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ঘটনাস্থলে পুলিশ ও র‌্যাবের সদস্যরা উপস্থিত হয়ে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেন। সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত করা হয়।

রাত আড়াইটার দিকে নিষ্ক্রিয় করা হয় বস্তুটি

কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দিন জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করে। পরে রাত আড়াইটার দিকে বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল বোমাসদৃশ বস্তুটি নিষ্ক্রিয় করে।

ওসি আরও জানান, এ ঘটনার পর আখড়াবাড়ির নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। ব্যাগটি সেখানে কে বা কারা রেখেছে এবং এর পেছনে কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তবে উদ্ধার করা বস্তুটির প্রকৃতি, কার্যক্ষমতা এবং ঘটনাটির পেছনে কারা জড়িত—এসব বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো জানা যায়নি।

লালনের তিরোধান দিবসের উৎসবের মধ্যে ঘটনা

বাউলসম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় অবস্থিত লালন আখড়াবাড়িতে তিন দিনব্যাপী উৎসব চলছে। দেশ-বিদেশের লালনভক্ত, বাউল সাধু ও দর্শনার্থীদের অংশগ্রহণে প্রতিবছরই এখানে স্মরণোৎসবের আয়োজন করা হয়।

এবারের উৎসবের শেষ দিন সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে সমাপনী অনুষ্ঠান হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যেই আখড়াবাড়ির প্রধান ফটকের কাছ থেকে বোমাসদৃশ বস্তু ও পেট্রোল উদ্ধারের ঘটনায় উৎসবের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

লালন আখড়াবাড়ি শুধু একটি ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক আয়োজনের স্থান নয়; এটি বাংলার বাউল দর্শন, মানবতাবাদী চিন্তা ও লোকসংগীতের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রতিবছর উৎসবকে ঘিরে এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হয়। এমন সময়ে নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কোনো ঘটনা ঘটলে সাধু, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

নিরাপত্তার কারণে বন্ধ প্রধান ফটক, আতঙ্কে সাধুরা

বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের পর সাধু ও বাউলদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে রোববার রাত থেকে লালন আখড়াবাড়ির প্রধান ফটক বন্ধ রাখা হয়। নিরাপত্তার স্বার্থে কাউকে মাজারের ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

এ ঘটনায় আখড়াবাড়িতে অবস্থানরত অনেক বাউল সাধুর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাঁদের কেউ কেউ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে আখড়াবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

উৎসবের শেষ পর্যায়ে এমন ঘটনা ঘটায় আয়োজক, সাধু ও ভক্তদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে উৎসবের সমাপনী আয়োজনের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্ত জানা প্রয়োজন।

তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে ব্যাগ ও উদ্ধার করা সামগ্রী

আখড়াবাড়ির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক স্থাপনার প্রধান ফটকের কাছে বোমাসদৃশ বস্তু, পেট্রোল ও সার্কিটসদৃশ সামগ্রী পাওয়া যাওয়ায় ঘটনাটির পেছনের কারণ অনুসন্ধান জরুরি হয়ে উঠেছে। ব্যাগটি সেখানে কীভাবে এল, কে সেটি রেখেছে এবং উদ্ধার করা সামগ্রীগুলোর প্রকৃতি কী—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

এ ধরনের ঘটনায় ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং উদ্ধার করা সামগ্রীর ফরেনসিক পরীক্ষা তদন্তে সহায়ক হতে পারে। তবে তদন্তের ফল প্রকাশের আগে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে দায়ী করা সমীচীন নয়।

উৎসবকেন্দ্রিক নিরাপত্তা জোরদারের দাবি

লালন আখড়াবাড়িতে তিরোধান দিবসের উৎসব উপলক্ষে দেশ-বিদেশ থেকে আগত সাধু, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বড় জনসমাগমের সময় প্রবেশপথে নজরদারি, সন্দেহজনক বস্তু শনাক্তকরণ, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন।

আখড়াবাড়িতে উদ্ধার করা বস্তুটির বিষয়ে তদন্তের পাশাপাশি উৎসবস্থলের সার্বিক নিরাপত্তা পর্যালোচনা করাও জরুরি। এতে উপস্থিত মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলা করা সহজ হবে।

সার্বিকভাবে, লালন আখড়াবাড়ির প্রধান ফটকের কাছে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনাটি উৎসবের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বস্তুটি নিষ্ক্রিয় করার কথা জানিয়েছে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত করছে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটন ও দায়ীদের শনাক্ত করার পাশাপাশি সাধু, ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!