ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

menu

সংস্কার পরিষদ নয়, সংবিধান সংশোধনে বিদ্যমান কাঠামোর ওপর জোর বিশেষজ্ঞদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ১০:৩৬ এএম

সংস্কার পরিষদ নয়, সংবিধান সংশোধনে বিদ্যমান কাঠামোর ওপর জোর বিশেষজ্ঞদের

ছবিঃ সংগৃহীত

সংবিধান সংশোধন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সংবিধানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবীরা বলছেন, বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই সাংবিধানিক সংশোধন সম্পন্ন করা প্রয়োজন। বর্তমান সংবিধানে পৃথক সংস্কার পরিষদ গঠনের স্পষ্ট বিধান না থাকায় এ ধরনের পরিষদের সাংবিধানিক ভিত্তি এবং এর মাধ্যমে গৃহীত সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধান সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সরকার ও বিরোধী দল যদি বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়ার হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে সংশোধন প্রক্রিয়া এগোলেও তার দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যেতে পারে। দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য না হলে ভবিষ্যতে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক জটিলতা তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করছেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো ও মূলনীতিতে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা, নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার ওপর কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো উচিত।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মতপার্থক্য

জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদে স্বাক্ষরের পর এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। নির্বাচনের পর সংবিধান সংশোধন ও সংস্কারের প্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়।

সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত একটি বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিরোধী দলীয় জোট তাতে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকে। ফলে সংশোধন প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং জুলাই সনদের প্রস্তাবগুলো কীভাবে সাংবিধানিক কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, তা নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।

এ বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ‘সংস্কার’ ও ‘সংশোধন’—এই দুটি ধারণার পার্থক্য। সংবিধান সংশোধনের অর্থ হলো প্রচলিত সাংবিধানিক বিধান অনুসরণ করে নির্দিষ্ট ধারায় পরিবর্তন, সংযোজন বা বিলোপ আনা। অন্যদিকে, সংস্কার বলতে সংবিধানের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, শাসনব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তনকেও বোঝানো হতে পারে।

তবে সংস্কারের রাজনৈতিক বা নীতিগত লক্ষ্য যত বিস্তৃতই হোক, সংবিধানে পরিবর্তন আনতে হলে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

‘সংবিধানের অধীনেই করতে হবে সংশোধন’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কে এম মহিউদ্দিন মনে করেন, সংবিধান সংশোধন করতে হলে বিদ্যমান সংবিধানের অধীনেই তা করতে হবে। তাঁর মতে, সংবিধানের মূলনীতিতে পরিবর্তন আনা হলে তা নিয়ে ব্যাপক বিরোধিতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাংবিধানিক সংস্কারের ক্ষেত্রে তিনি নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা, নির্বাহী বিভাগের প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ কমানো এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

তাঁর মতে, এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পরিবর্তন আনা গেলে নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

ড. কে এম মহিউদ্দিন আরও বলেন, বিএনপি ও জামায়াত এ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পক্ষ। উভয় পক্ষই রাজনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় কে এগিয়ে থাকল, সেটিই যদি প্রধান বিবেচ্য হয়ে ওঠে, তাহলে সংশোধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও তার ফলাফল দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের এই বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, সাংবিধানিক পরিবর্তন কেবল তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক সমীকরণের ভিত্তিতে নয়, বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থায়িত্ব এবং জনগণের অধিকার সুরক্ষার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে করা প্রয়োজন।

সংস্কার পরিষদ গঠনের সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কাজী জাহেদ ইকবালের মতে, বিদ্যমান সংবিধানে সংস্কার পরিষদ গঠনের সুযোগ নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংঘটিত বিভিন্ন কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়া এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রয়োজনীয় বৃহত্তর সাংবিধানিক পরিবর্তন আনার বিষয়গুলো প্রস্তাবিত ১৮তম সংশোধনীর আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক পক্ষগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানের সংশোধনী গ্রহণ করা উচিত। তা না হলে ভবিষ্যতে সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

তবে সংস্কার পরিষদ গঠন বা এর মাধ্যমে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈধতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক বিধান, আদালতের প্রাসঙ্গিক সিদ্ধান্ত এবং প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য আইনি ব্যাখ্যা ও সাংবিধানিক বিশ্লেষণও গুরুত্বপূর্ণ।

সংবিধানের মূলনীতিতে পরিবর্তন নিয়ে সতর্কতা

সংবিধানের মূলনীতি রাষ্ট্রের পরিচয়, শাসনব্যবস্থার ভিত্তি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের মৌলিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। ফলে এসব বিষয়ে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ রাজনৈতিক ও আইনি—উভয় দিক থেকেই সংবেদনশীল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করা, ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে মূলনীতিতে এমন পরিবর্তন আনা উচিত নয়, যা ভবিষ্যতে নতুন বিতর্ক, আইনি অনিশ্চয়তা কিংবা রাজনৈতিক সংঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিশেষ করে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার সীমা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার মতো বিষয়গুলোতে স্পষ্ট ও কার্যকর সাংবিধানিক বিধান থাকা গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলে সংশোধনীর গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে।

রাজনৈতিক অনৈক্যে ভবিষ্যৎ জটিলতার আশঙ্কা

সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটিতে বিরোধী পক্ষের অংশ না নেওয়ার বিষয়টিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন কিছু বিশেষজ্ঞ। তাঁদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে দর-কষাকষি করতে পারে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নে দীর্ঘস্থায়ী অনৈক্য থাকলে তা ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনায় জটিলতা তৈরি করতে পারে।

সংবিধান সংশোধনের মতো বিষয় শুধু বর্তমান সরকারের মেয়াদ বা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এর প্রভাব ভবিষ্যৎ সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকদের অধিকার ও দায়িত্বের ওপরও পড়বে। তাই বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হলে পরবর্তী সময়ে তা নিয়ে বিরোধ তৈরি হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আলোচনার পথ খোলা রাখা, মতপার্থক্যের জায়গাগুলো চিহ্নিত করা এবং যেসব বিষয়ে ঐকমত্য সম্ভব, সেগুলোতে অগ্রাধিকার দেওয়া কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে।

জনগণের সম্মতি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধানের পরিবর্তন নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের সম্মতি, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং প্রচলিত আইনি কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধা থাকা জরুরি। রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাংবিধানিক পরিবর্তনের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে নির্ধারিত আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।

জুলাই সনদে উত্থাপিত সংস্কার প্রস্তাবগুলোর কোনগুলো সাধারণ আইন, কোনগুলো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং কোনগুলো বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন—তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এতে সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে বিভ্রান্তি কমবে এবং আলোচনাকে সুনির্দিষ্ট আইনি ও নীতিগত বিষয়ে কেন্দ্রীভূত করা সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর সম্ভাব্য প্রভাব, আইনি সামঞ্জস্য এবং ভবিষ্যৎ প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। সংশোধন প্রক্রিয়া যত বেশি স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও আইনসম্মত হবে, তার দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতাও তত বাড়ার সুযোগ থাকবে।

রাজনৈতিক সমঝোতাই হতে পারে টেকসই সমাধানের পথ

সব মিলিয়ে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংশোধন নিয়ে সরকার এবং বিরোধী দলের মতপার্থক্য দেশের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। একদিকে রয়েছে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার দাবি, অন্যদিকে রয়েছে বিদ্যমান সংবিধানের অধীনে পরিবর্তনের বৈধতা নিশ্চিত করার প্রশ্ন।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে পারস্পরিক বিরোধের ঊর্ধ্বে উঠে আলোচনায় বসতে হবে। নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতা, নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি এবং নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজতে হবে।

রাজনৈতিকভাবে কে জয়ী হলো, তার চেয়ে সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্র কতটা স্থিতিশীল, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক হবে—সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, আইনি কাঠামো মেনে, জনগণের সম্মতি ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করা গেলে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা কমানো সম্ভব। অন্যথায়, বর্তমান মতপার্থক্য দীর্ঘমেয়াদি সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!