ঢাকার আশুলিয়ার নরসিংহপুরে শারমিন গ্রুপের বহুতল ভবন থেকে পড়ে জামাল উদ্দিন (৩৯) নামের এক কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে তাঁকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে তাঁর মৃত্যুকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে দাবি করেছেন পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, জামাল উদ্দিনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এ ঘটনায় হত্যা মামলা করতে গিয়ে পুলিশি জটিলতার মুখে পড়ার অভিযোগ তুলে বুধবার রাত ১২টার দিকে আশুলিয়া থানার সামনে অবস্থান নেন নিহতের স্বজনেরা।
নিহতের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, জামাল উদ্দিনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে চান তাঁরা। কীভাবে তাঁর মৃত্যু হলো, এর পেছনে কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না এবং ঘটনাটি ঘিরে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত চান তাঁরা। একই সঙ্গে তাঁদের অভিযোগ, মামলা করতে একাধিকবার থানায় গেলেও তাঁদের অভিযোগ প্রত্যাশিতভাবে গ্রহণ করা হয়নি।
সকালে মৃত্যু, রাতে থানার সামনে স্বজনেরা
পরিবার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল ৯টার দিকে আশুলিয়ার নরসিংহপুরে অবস্থিত শারমিন গ্রুপের কারখানা থেকে জামাল উদ্দিনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে দুপুরে আশুলিয়ার নারী ও শিশু হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে জানা গেছে।
জামাল উদ্দিন শারমিন গ্রুপের ডিভিশন-৩-এর সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি গাজীপুর সদর উপজেলার বুরুলিয়া ডুয়েট এলাকার মৃত মো. সেকেন্দার আলীর ছেলে।

মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা ঘটনাটি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তাঁদের দাবি, মৃত্যুর পেছনের প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও তাঁদের অভিযোগ অনুযায়ী হত্যা মামলা গ্রহণ না করায় ক্ষুব্ধ হয়ে রাতেই আশুলিয়া থানার সামনে অবস্থান নেন তাঁরা।
পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ পরিবারের
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, অফিসের কোনো বিরোধ কিংবা অন্য কোনো আক্রোশের জেরে জামাল উদ্দিনকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। পরে ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তাঁদের সন্দেহ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য বা তদন্তের চূড়ান্ত ফল এখনো পাওয়া যায়নি।
পরিবারের আরও অভিযোগ, তাঁদের যথাযথভাবে মরদেহ দেখতে না দিয়েই সেটি মর্গে পাঠানো হয়েছে। এতে মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের সন্দেহ আরও বেড়েছে বলে দাবি করেন তাঁরা।
তাঁরা বলছেন, মৃত্যুর আগে জামাল উদ্দিনের সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল কি না, ঘটনার সময় কারা উপস্থিত ছিলেন, বহুতল ভবন থেকে কীভাবে তিনি নিচে পড়ে গেলেন এবং ঘটনাস্থলে কোনো সিসিটিভি ফুটেজ বা প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কারখানা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
সাত-আটবার অভিযোগ লিখেও মামলা হয়নি, দাবি ভাইয়ের
নিহত জামাল উদ্দিনের বড় ভাই ইস্কান্দার আলী খান অভিযোগ করেন, তাঁর ভাইয়ের মৃত্যু পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। তাঁর দাবি, কারখানা কর্তৃপক্ষ ও ভেতরের কিছু লোকজন ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এ কারণে তাঁরা শুরু থেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছেন।
ইস্কান্দার আলী খান বলেন, “এটি সম্পূর্ণ পরিকল্পিত হত্যা। কারখানা কর্তৃপক্ষ ও ভেতরের লোকজন ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। আমরা প্রথমে থানায় মামলা করতে আসলাম, তখন নিলো না। পরে আবার এসে কথা বললে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি দিয়ে মামলা নেবে না বলে জানানো হয়। এখন নামসহ মামলা দিতে চাচ্ছি, কিন্তু থানা থেকে নানা অজুহাত দেখানো হচ্ছে। সাত-আটবার অভিযোগ লিখে আনার পরও নিচ্ছে না। থানা থেকে বলা হচ্ছে, নাম ছাড়া মামলা করলে করবেন, অথবা আদালতে গিয়ে মামলা করবেন।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের মতো করে আমরা মামলা করতে না পারলে থানার সামনে থেকে যাব না। প্রয়োজনে সারারাত থানার সামনে থাকব।”
পরিবারের দাবি, তাঁরা কোনো পক্ষকে আগাম দোষী সাব্যস্ত করতে চান না; বরং তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করা হোক। তাঁদের অভিযোগ, মামলা গ্রহণে বিলম্ব হলে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও আলামত সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
পুলিশের বক্তব্য: অভিযোগের প্রাথমিক তদন্ত চলছে
এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে নিহতের ভাই একটি অভিযোগ জমা দিয়েছেন। অভিযোগটির প্রাথমিক তদন্ত শেষে তা মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি।
পুলিশের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অভিযোগের প্রাথমিক তদন্তের বিষয়টি সামনে এসেছে। তবে নিহতের পরিবার যে হত্যা মামলা গ্রহণে বিলম্ব ও নানা জটিলতার অভিযোগ তুলেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
জামাল উদ্দিনের মৃত্যু ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন—তিনি কীভাবে বহুতল ভবন থেকে নিচে পড়লেন এবং এটি দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং প্রাসঙ্গিক সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
একই সঙ্গে পরিবারের অভিযোগ ও পুলিশের বক্তব্য যাচাই করে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তদন্তের আগে মৃত্যুকে পরিকল্পিত হত্যা হিসেবে নিশ্চিতভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। তবে পরিবারের উত্থাপিত অভিযোগগুলো যথাযথভাবে খতিয়ে দেখে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণ এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্বজনেরা।
এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ময়নাতদন্তের ফলাফল এবং মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। শারমিন গ্রুপ কর্তৃপক্ষের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।

