ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

menu

চীনা বিনিয়োগে বাধা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, থমকে সম্ভাবনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ১০:৫৬ এএম

চীনা বিনিয়োগে বাধা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, থমকে সম্ভাবনা

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়লেও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়হীনতা এবং অনুমোদনপ্রক্রিয়ার জটিলতায় অনেক প্রস্তাব বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে। বন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চল, জ্বালানি, শিল্পকারখানা, সড়ক যোগাযোগ, কৃষি ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে বিনিয়োগের ঘোষণা থেকে প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লাগায় প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা।

চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার এবং ঋণনির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি ও যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকার। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হচ্ছে। কিন্তু জমি বরাদ্দ, পরিবেশগত ছাড়পত্র, অবকাঠামো প্রস্তুতি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, কর ও শুল্কসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন পেতে বিলম্ব হলে এসব সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়ে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বা করছাড় দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। বিনিয়োগকারীদের জন্য দ্রুত, স্বচ্ছ, পূর্বানুমানযোগ্য ও হয়রানিমুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, ডিজিটাল অনুমোদনপ্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা গেলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের গতি বাড়তে পারে।

চীনা বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও উৎপাদন খাতে চীনের ভূমিকা দীর্ঘদিনের। সড়ক, সেতু, রেলপথ, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিভিন্ন শিল্পপ্রকল্পে চীনা অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম ব্যবহৃত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্পকারখানার জন্য চীন থেকে যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি করা হয়। এসব উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য স্থানীয় বাজারে সরবরাহের পাশাপাশি রপ্তানিও করা হচ্ছে।

বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি, লজিস্টিকস, বন্দর উন্নয়ন, গ্যাস অনুসন্ধান, আধুনিক কৃষি ও উৎপাদনশিল্পে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহের এসব খাত বাস্তবায়িত হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি ও যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকও দুই দেশের সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। তবে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বিনিয়োগ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও নীতিগত সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

ঋণ থেকে সরাসরি বিনিয়োগে যেতে চায় বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার ফাঁকে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঋণনির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে যৌথ ও সরাসরি বিনিয়োগের দিকে যেতে চায় বাংলাদেশ।

তিনি জানান, শুধু ঋণ নিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবর্তে এমন অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে বাংলাদেশ ও বিনিয়োগকারী যৌথভাবে প্রকল্পের অংশীদার হবে। এতে প্রকল্পের অর্থায়ন, পরিচালনা ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল অর্জনের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ ও সরাসরি বিনিয়োগের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ঋণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী সুদসহ অর্থ পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে সরাসরি বা যৌথ বিনিয়োগে বিনিয়োগকারী প্রকল্পের মালিকানা, পরিচালনা কিংবা মুনাফার অংশীদার হতে পারেন। তবে এ ধরনের বিনিয়োগের সুফল পেতে প্রকল্প নির্বাচন, চুক্তির শর্ত, ঝুঁকি বণ্টন, মুনাফা প্রত্যাবাসন এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের বিষয়গুলো স্বচ্ছভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

চীনের ২০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়নে ব্যবধান

ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে চীন ২৭টি প্রকল্পের জন্য ২০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এর মধ্যে ১৩টি প্রকল্পে ৮ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, একই সময় পর্যন্ত ছাড় করা ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।

অন্যদিকে, ১০টি প্রকল্পের বিপরীতে বাংলাদেশ ৪৮৩ মিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

এই হিসাব অনুযায়ী, ২০ বিলিয়ন ডলারের প্রতিশ্রুতির বিপরীতে স্বাক্ষরিত ঋণচুক্তির পরিমাণ প্রায় ৪৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং ছাড় করা অর্থ প্রায় ২৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিশ্রুতির পুরো অর্থায়ন চুক্তি ও বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

তবে প্রতিশ্রুত অর্থ, স্বাক্ষরিত ঋণচুক্তি ও প্রকৃত অর্থছাড় এক বিষয় নয়। প্রকল্পের প্রস্তুতি, দর-কষাকষি, অর্থায়নের শর্ত, অনুমোদন এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতির ওপর অর্থছাড় নির্ভর করে। তাই বিনিয়োগ বা ঋণের প্রতিশ্রুতির পরিমাণের পাশাপাশি কোন প্রকল্প কত দূর এগিয়েছে, কোথায় বাধা রয়েছে এবং বাস্তবায়নে কত সময় লাগছে, সেসব তথ্যও মূল্যায়ন করা জরুরি।

যেসব খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে চীন

বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে চীনা বিনিয়োগের একাধিক প্রস্তাব রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বাড়তে পারে। তবে প্রস্তাবিত অর্থের পরিমাণকে চূড়ান্ত বিনিয়োগ বা বাস্তবায়িত প্রকল্পের অর্থায়ন হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

পায়রা বন্দর ও শিল্পাঞ্চল: পায়রা বন্দর শিল্পাঞ্চলে ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা শিল্প স্থাপনে ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে চীন। একই সঙ্গে পুনর্ব্যবহারযোগ্য তুলা উৎপাদন, লিথিয়াম ব্যাটারি এবং ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে ১৯০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোংলা বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল: মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলতে ৬৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া সেখানে ১৮০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস ও বন্ডেড ওয়্যারহাউস স্থাপনের আগ্রহ দেখিয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। মোংলা বন্দর সম্প্রসারণে চীনা এক্সিম ব্যাংক ৩৩৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দিয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক: চীনের সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্রুপ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসংক্রান্ত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) প্রকল্পে ৪ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রকল্পটির অর্থায়ন, চুক্তি ও বাস্তবায়নের কাঠামো চূড়ান্ত হলে দেশের প্রধান বাণিজ্যিক করিডরের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রাজধানীর বস্তি উন্নয়ন: ঢাকার কড়াইল, সাততলা ও ভাষানটেক বস্তির উন্নয়নে ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে চীন। এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আবাসন, পুনর্বাসন, জমির অধিকার, পরিবেশ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ।

ভোলার গ্যাসক্ষেত্র: চায়না ফিউচার গ্রুপ হোল্ডিং লিমিটেড বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) সঙ্গে অংশীদারত্বে ভোলার গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনে ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি সরবরাহ ও অনুসন্ধান কার্যক্রমে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অন্যান্য খাত: বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে রেলওয়ের রোলিং স্টক কারখানা স্থাপন, আধুনিক কৃষি, ঔষধি ভেষজ চাষ এবং শিক্ষা খাতেও চীনা বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রস্তাবের প্রতিটির ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাই, আর্থিক কাঠামো, পরিবেশগত প্রভাব, চুক্তির শর্ত ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা মূল্যায়ন করা দরকার। একই সঙ্গে কোন প্রস্তাব প্রাথমিক আলোচনায়, কোনটি চুক্তির পর্যায়ে এবং কোনটি বাস্তবায়নাধীন—তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা হলে বিনিয়োগ পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।

চীনা প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি স্থানান্তর

ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এক হাজারের বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে ৫৫ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।

চীনা বিনিয়োগের ফলে উৎপাদন খাতে যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন সম্প্রসারণেও বিদেশি বিনিয়োগ ভূমিকা রাখতে পারে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে সেখানে বিনিয়োগ প্রায় ১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর এবং এক লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে বলে ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

তবে কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ও বাস্তবে সৃষ্ট কর্মসংস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। প্রকল্পভিত্তিক বিনিয়োগ, কার্যক্রম শুরুর সময়, উৎপাদন সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থানের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা হলে এসব উদ্যোগের অর্থনৈতিক অবদান মূল্যায়ন করা সহজ হবে।

আনোয়ারার চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল: দীর্ঘসূত্রতার উদাহরণ

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ বাংলাদেশের বিনিয়োগ বাস্তবায়নপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

২০১৪ সালে শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলেও জমি, উন্নয়নকারী নির্বাচন, চুক্তি ও অবকাঠামো প্রস্তুতির বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। ২০২২ সালে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে উন্নয়নকারী হিসেবে যুক্ত করা হয়। ২০২৬ সালে শিল্পাঞ্চল-সংশ্লিষ্ট সহায়ক অবকাঠামোর জন্য ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন ও নির্মাণকাজ শুরুর তথ্য পাওয়া গেছে।

এ শিল্পাঞ্চলে ৩০টির বেশি চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ-প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব প্রতিশ্রুতির কত অংশ চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ নিয়েছে, কত অর্থ ছাড় হয়েছে এবং কতটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন শুরু করেছে—তা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু জমি বরাদ্দ বা বিনিয়োগকারীর আগ্রহ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বন্দর-সংযোগ এবং অন্যান্য সহায়ক অবকাঠামো। এসব সুবিধা প্রস্তুত না থাকলে জমি বরাদ্দের পরও কারখানা নির্মাণ ও উৎপাদন শুরু করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া উন্নয়নকারী নির্বাচন, চুক্তির শর্ত নির্ধারণ, অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার অনুমোদন পেতে বিলম্ব হলে প্রকল্পের ব্যয় ও অনিশ্চয়তা বাড়ে। আনোয়ারার শিল্পাঞ্চলের দীর্ঘ প্রস্তুতিপ্রক্রিয়া এ ধরনের সমস্যার গুরুত্ব তুলে ধরে।

বিনিয়োগ আটকে যাওয়ার পেছনে যেসব বাধা

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সাধারণত একাধিক সরকারি দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। কোম্পানি নিবন্ধন, জমি অধিগ্রহণ বা ইজারা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদন, বিদ্যুৎ-গ্যাস-পানি সংযোগ, কর ও শুল্কসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং অর্থ স্থানান্তরের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।

এসব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলে বা এক দপ্তরের সিদ্ধান্তের সঙ্গে অন্য দপ্তরের সমন্বয় না হলে ফাইল আটকে থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো প্রকল্পের জমি বরাদ্দ হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত না থাকলে বিনিয়োগকারী উৎপাদন শুরু করতে পারেন না। আবার নীতিমালা ও অনুমোদনের শর্ত সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না পেলে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার সঙ্গে স্বচ্ছতার অভাব যুক্ত হলে বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা আরও বাড়ে। প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্বের কারণে নির্মাণসামগ্রী, যন্ত্রপাতি, শ্রম ও অর্থায়নের ব্যয় বাড়তে পারে। এতে প্রকল্পের সম্ভাব্য মুনাফা কমে যায় এবং বিনিয়োগকারী বিকল্প বাজার বিবেচনা করতে পারেন।

তবে সব প্রকল্পের বিলম্বকে শুধু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ফল হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কোনো প্রকল্পে অর্থায়নের শর্ত, জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত ঝুঁকি, সম্ভাব্যতা যাচাই, চুক্তির অস্পষ্টতা কিংবা বিনিয়োগকারীর নিজস্ব সিদ্ধান্তও বিলম্বের কারণ হতে পারে। তাই প্রতিটি প্রকল্পের বাধা চিহ্নিত করে দায়ী প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার ভূমিকা যাচাই করা জরুরি।

বিনিয়োগ অন্য দেশে চলে যাওয়ার ঝুঁকি

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের অভাবে বাংলাদেশ সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগ হারাতে পারে।

তিনি ইনকিলাবকে বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশ্বজুড়ে বহু দেশে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে ওয়ান-স্টপ সার্ভিসসহ বিভিন্ন সুবিধার কথা বলা হলেও বাস্তবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এক জায়গা থেকে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া যায় না। ফলে নীতিমালা ও ঘোষিত সুযোগ-সুবিধার সুফল বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি পান না।

ভিয়েতনামের উদাহরণ তুলে ধরে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, দেশটি বিনিয়োগের জন্য বাস্তবমুখী পরিবেশ তৈরি করায় উল্লেখযোগ্য বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পেরেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রশাসনিক জটিলতা ও বাস্তবায়নগত সীমাবদ্ধতা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

তার মতে, এ সমস্যা শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নয়, দেশীয় উদ্যোক্তাদেরও প্রভাবিত করে। তাই বিনিয়োগ আকর্ষণে ঘোষিত নীতি ও সুবিধার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ওয়ান-স্টপ সার্ভিস কার্যকর করার পরামর্শ

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা, সমন্বয়হীনতা ও স্বচ্ছতার অভাব ব্যবসার ব্যয় বাড়িয়ে তুলছে এবং সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করছে।

তিনি ইনকিলাবকে বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু, বিধিবিধান সহজীকরণ, অনুমোদনপ্রক্রিয়ার ডিজিটালাইজেশন এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

তার মতে, শুধু করছাড় বা আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়। জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র, পানি-বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, কোম্পানি নিবন্ধন, কর, ভ্যাট ও কাস্টমস-সংক্রান্ত জটিলতা কমাতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যাতে একাধিক দপ্তরে ঘুরে সময় ও অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য না হন, সে ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের অর্থ শুধু একটি অনলাইন পোর্টাল বা আবেদন জমা দেওয়ার ব্যবস্থা নয়। এর আওতায় সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর অনুমোদনপ্রক্রিয়া সমন্বিত করা, আবেদনের অগ্রগতি জানানো এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাবদিহি নিশ্চিত করার তাগিদ

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু আকর্ষণীয় প্রণোদনা যথেষ্ট নয়; ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার প্রক্রিয়াও সহজ করতে হবে।

তিনি ইনকিলাবকে বলেন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের আওতায় বিভিন্ন দপ্তরের অনুমোদন ও সেবা একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে বিনিয়োগকারীকে আলাদাভাবে এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে যেতে না হয়। আবেদন জমা দেওয়ার পর কোন দপ্তরে ফাইল রয়েছে, কী কারণে আটকে আছে এবং কত দিনের মধ্যে সিদ্ধান্ত হবে—এসব তথ্য জানার সুযোগ থাকতে হবে।

ড. ফাহমিদা খাতুনের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা না দিলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি জমি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংযোগ, কর, শুল্ক ও পরিবেশগত অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ ও স্পষ্ট করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা এবং সরকারি সেবার নিয়মিত মূল্যায়নও প্রয়োজন।

তিনি মনে করেন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু কতটি সেবা এর আওতায় রয়েছে তার ওপর নয়; বরং বিনিয়োগকারীরা কত দ্রুত, স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্যভাবে প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাচ্ছেন, তার ওপর।

চীনের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা

চীনের অর্থায়ন ও বিনিয়োগ বিভিন্ন দেশে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এসব প্রকল্পের ফলাফল সব দেশে এক রকম হয়নি। কোনো দেশে উৎপাদন ও রপ্তানি বেড়েছে, আবার কোনো দেশে ঋণ পরিশোধের চাপ ও প্রকল্পের আর্থিক টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

পাকিস্তান: চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের আওতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, সড়ক যোগাযোগ, বন্দর ও অন্যান্য অবকাঠামোতে বিনিয়োগ হয়েছে। এসব প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল বিদ্যুৎ ঘাটতি কমানো, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা এবং শিল্প ও বাণিজ্যের সুযোগ বাড়ানো। তবে প্রকল্পের সুফলের পাশাপাশি ঋণ ও অর্থায়নের শর্তও দেশটির অর্থনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

ইন্দোনেশিয়া: নিকেল প্রক্রিয়াজাতকরণ, ধাতু শিল্প ও বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারিসংশ্লিষ্ট খাতে চীনা প্রতিষ্ঠানসহ বিদেশি বিনিয়োগ ইন্দোনেশিয়ার শিল্পায়নে ভূমিকা রেখেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, দেশটির নিকেলজাত পণ্যের রপ্তানি ২০১৭ সালের ৩ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৪ সালে ৩৩ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। এ অভিজ্ঞতা দেখায়, কাঁচামাল রপ্তানির পরিবর্তে দেশে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের সক্ষমতা তৈরি করা গেলে অর্থনৈতিক সুফল বাড়তে পারে।

লাওস: চীনের অর্থায়ন ও অংশীদারত্বে নির্মিত চীন-লাওস রেলপথ দেশটিকে চীনের সঙ্গে এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে প্রয়োজনীয় পরিবহন ও বাণিজ্য-সহায়ক সংস্কার হলে এ রেলপথে ভিয়েনতিয়েন-কুনমিং রুটে স্থলপথে পণ্য পরিবহনের খরচ ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল।

ইথিওপিয়া ও কেনিয়া: চীনা অর্থায়ন, ঠিকাদারি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে ইথিওপিয়ায় শিল্পাঞ্চল ও পরিবহন অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। কেনিয়ায় চীনা অর্থায়ন ও ঠিকাদারিতে মোম্বাসা বন্দর থেকে রাজধানী নাইরোবি পর্যন্ত আধুনিক রেলপথ নির্মিত হয়, যার প্রথম অংশ ২০১৭ সালে চালু হয়। এসব প্রকল্পে যোগাযোগ ও পরিবহন সক্ষমতা বাড়লেও অর্থনৈতিক সুফল নির্ভর করে প্রকল্পের ব্যবহার, পরিচালন ব্যয়, ঋণের শর্ত এবং স্থানীয় উৎপাদনের সঙ্গে সংযোগের ওপর।

বাংলাদেশের জন্য এসব অভিজ্ঞতার শিক্ষা হলো, বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ানোর পাশাপাশি বিনিয়োগের গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পের আর্থিক টেকসইতা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, স্থানীয় কর্মসংস্থান, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে করণীয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের বিনিয়োগ আকর্ষণেও বাংলাদেশকে কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রথমত, বিনিয়োগকারীদের জন্য কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করতে হবে। কোম্পানি নিবন্ধন থেকে শুরু করে জমি, পরিবেশগত ছাড়পত্র, ইউটিলিটি সংযোগ ও করসংক্রান্ত অনুমোদনের অগ্রগতি একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় পর্যবেক্ষণের সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি অনুমোদনের জন্য স্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত না হলে বিলম্বের কারণ জানানো এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার।

তৃতীয়ত, প্রস্তাবিত বিনিয়োগের তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। কোন প্রস্তাব আলোচনার পর্যায়ে, কোনটির চুক্তি হয়েছে, কত অর্থ ছাড় হয়েছে এবং কোন প্রকল্পে উৎপাদন শুরু হয়েছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে।

চতুর্থত, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলে জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবহন সুবিধা সময়মতো প্রস্তুত করতে হবে। অবকাঠামো প্রস্তুত না থাকলে বিনিয়োগকারীর আগ্রহ বাস্তব উৎপাদনে রূপ নেওয়ার সুযোগ কমে যায়।

পঞ্চমত, বিনিয়োগ চুক্তিতে স্থানীয় কর্মসংস্থান, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং স্থানীয় সরবরাহকারীদের অংশগ্রহণের বিষয়গুলো যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

ষষ্ঠত, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। সরকার পরিবর্তন হলেও অনুমোদিত প্রকল্প, চুক্তি ও বিনিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত যেন অযৌক্তিক বিলম্বের মুখে না পড়ে, সে জন্য স্পষ্ট নীতিমালা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন।

সম্ভাবনা আছে, প্রয়োজন বাস্তবায়নের সক্ষমতা

বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা থাকলেও ঘোষিত প্রস্তাবগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ নেবে না। অর্থায়নের শর্ত, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা, চুক্তি, অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক অনুমোদন—প্রতিটি ধাপ সময়মতো সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের স্বচ্ছতা, আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করা জরুরি।

অর্থনীতিবিদদের বক্তব্যে স্পষ্ট, বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য শুধু বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আহ্বান জানানো যথেষ্ট নয়। বরং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করা, সরকারি সেবার মান বাড়ানো এবং দপ্তরগুলোর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

চীনসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগ প্রস্তাব বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—প্রতিশ্রুতি ও আলোচনার পর্যায় পেরিয়ে সেসব বিনিয়োগকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দেওয়া। প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে কার্যকর ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বাস্তব শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!