ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

ঘাটতি থেকে শিল্পায়নের পথে, নাকি নতুন নির্ভরতার ফাঁদে চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য?

দৈনিক আজ ও আগামীকাল ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ০৯:২৭ এএম

ঘাটতি থেকে শিল্পায়নের পথে, নাকি নতুন নির্ভরতার ফাঁদে চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য?

ছবিঃ সংগৃহীত

চীন থেকে বাংলাদেশে আসে বিশাল জাহাজভর্তি পণ্য। শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট উপকরণসহ উৎপাদন খাতের নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়মিত প্রবেশ করছে দেশের বন্দরগুলো দিয়ে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে চীনের বন্দরে যায় তুলনামূলক অল্পসংখ্যক জাহাজ এবং অল্প পরিমাণ পণ্য।

এই অসম বাণিজ্য প্রবাহের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চীন থেকে বাংলাদেশ প্রায় ১৮ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। একই সময়ে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৬৯৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ চীন থেকে বাংলাদেশ যে পরিমাণ পণ্য কেনে, তার বিপরীতে দেশটিতে বাংলাদেশের পণ্য বিক্রির পরিমাণ খুবই কম। তবে এই ঘাটতির পুরো চিত্রটি কেবল ভোগ্যপণ্য আমদানির হিসাব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ চীন থেকে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ পণ্যের একটি অংশ বাংলাদেশের শিল্পকারখানার কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট উপকরণ। এসব আমদানির মাধ্যমে দেশের ভেতরে উৎপাদন হচ্ছে, কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে এবং উৎপাদিত পণ্যের একটি অংশ আবার ইউরোপ, উত্তর আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে রপ্তানিও হচ্ছে।

ফলে প্রশ্ন উঠছে—চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি কি শুধুই আমদানি-নির্ভরতার চিত্র, নাকি চীন থেকে আসা পণ্য ও পুঁজি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিল্প সক্ষমতা তৈরির ভিত্তিও তৈরি করছে?

তিন পর্বের অনুসন্ধানের প্রথম পর্বে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে। এতে চীনা পণ্য ও পুঁজি বাংলাদেশের কোন কোন খাতে উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করছে, চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশ কতটা প্রবেশ করতে পারছে এবং বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ঘোষণাগুলো বাস্তবে কতটা কারখানা ও উৎপাদনে রূপ নিচ্ছে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি

চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার। শিল্পের কাঁচামাল থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, রাসায়নিক, মধ্যবর্তী পণ্য ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য—বহু খাতেই বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য চীনা আমদানির ওপর নির্ভরশীল।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল প্রায় ১৮ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে একই সময়ে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে ৬৯৪ দশমিক ৪৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। এতে ওই অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার।

এটি বাংলাদেশের কোনো একক দেশের সঙ্গে সবচেয়ে বড় বাণিজ্য ঘাটতি।

তবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাবে চীন থেকে আমদানির পরিমাণ কিছুটা কম—প্রায় ১৮ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার। দুই সরকারি সংস্থার হিসাবের এই পার্থক্য থাকলেও সামগ্রিক চিত্রে পরিবর্তন নেই। চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানির তুলনায় বহু গুণ বেশি।

তবে পরিস্থিতির আরেকটি দিকও রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়ে প্রায় ৮২১ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এ প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৮ দশমিক ২৪ শতাংশ।

রপ্তানি বাড়ার এই প্রবণতা চীনের বাজারে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু ৮২১ মিলিয়ন ডলারের রপ্তানিও চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানির তুলনায় খুবই সামান্য।

তাই মূল প্রশ্ন শুধু বাণিজ্য ঘাটতির অঙ্ক কত—তা নয়। বরং চীন থেকে আমদানি করা কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী পণ্য ব্যবহার করে বাংলাদেশ কতটুকু নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করছে এবং সেই উৎপাদনের কত অংশ শেষ পর্যন্ত রপ্তানিতে যাচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

আমদানি কি তৈরি করছে নতুন শিল্প?

চীন থেকে আমদানি করা সব পণ্য সরাসরি বাংলাদেশের মানুষের ভোগের জন্য আসে না। শিল্পের কাঁচামাল, মধ্যবর্তী পণ্য, মূলধনি যন্ত্রপাতি এবং প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণের বড় অংশ বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যবহৃত হয়।

কোনো একটি কারখানা চীন থেকে মেশিন আমদানি করে দেশে উৎপাদন শুরু করলে সেই আমদানি পরবর্তী সময়ে স্থানীয় উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করতে পারে। একইভাবে চীন থেকে আমদানি করা কাপড়, সুতা, রাসায়নিক, ইলেকট্রনিক উপাদান কিংবা শিল্পযন্ত্র বাংলাদেশের বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত হয়ে দেশীয় ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

এ কারণে বাণিজ্য ঘাটতির বিশ্লেষণে আমদানির ধরন ও ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে আমরা শুধু আমদানি-রফতানির হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারি না। বাংলাদেশের প্রয়োজন চীনের বাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদন নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হওয়া। তবে এর জন্য নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং বাজার কৌশলও শক্তিশালী করতে হবে।”

সিপিডির আরেক বিশিষ্ট ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে শুধু ঋণ ও অবকাঠামো প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও রফতানি সম্প্রসারণের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশ শুধু কম খরচের শ্রম ও উৎপাদনঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।”

অর্থাৎ চীনা আমদানির অর্থনৈতিক মূল্যায়নে শুধু কত ডলারের পণ্য দেশে ঢুকছে তা নয়, সেই পণ্য দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি সক্ষমতা তৈরি করছে—সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

শুল্ক কমেছে, চীনের বাজার পাওয়া কতটা সহজ?

চীনের বিশাল ভোক্তা বাজারে প্রবেশ বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘদিনের একটি বড় সম্ভাবনা। সেই সম্ভাবনা আরও বাড়ে যখন চীন স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য শুল্ক সুবিধা সম্প্রসারণ করে।

২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে চীন স্বল্পোন্নত দেশগুলোর প্রায় সব ট্যারিফ লাইনে শূন্য শুল্ক সুবিধা কার্যকর করেছে। বাংলাদেশও এই সুবিধার আওতায় রয়েছে।

তবে শুল্ক কমে গেলেই কোনো দেশের বাজারে পণ্য বিক্রি সহজ হয়ে যায় না। চীনের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে পণ্যের মান, নকশা, প্যাকেজিং, প্রয়োজনীয় সনদ, সরবরাহের ধারাবাহিকতা, মূল্য প্রতিযোগিতা এবং ক্রেতাদের পছন্দ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারকেন্দ্রিক। ফলে চীনের বিশাল ভোক্তা বাজারে প্রবেশের জন্য শুধু শুল্ক সুবিধা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাজারভিত্তিক পণ্য নির্বাচন, বিপণন কৌশল এবং চীনা ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ।

বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, “চীন বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করে বলে অনেক উদ্যোক্তা সেখানে প্রতিযোগিতায় যেতে দ্বিধা করেন। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যকে সরাসরি চীনের ভোক্তা বাজারে তুলে ধরতে হবে।”

তার হিসাবে, একই ধরনের কাপড় উৎপাদনে চীনের ব্যয় বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ কম। ফলে প্রযুক্তি, উৎপাদন দক্ষতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় উন্নতি না ঘটালে বাংলাদেশের শিল্পের জন্য চীনের বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হতে পারে।

তবে বাজারের সম্ভাবনাও বড়। খোরশেদ আলমের মতে, বছরে ১০০ কোটি ডলারের পোশাক চীনের বাজারে নেওয়া অসম্ভব নয়। এ লক্ষ্য সামনে রেখে বিসিসিসিআই চীনের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য প্রায় ২০টি প্রদর্শনী বা বিক্রয়কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনা করছে।

কুনমিংয়ে স্থায়ী প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদাম

চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সরাসরি উপস্থিতি বাড়াতে কুনমিংয়ে স্থায়ী প্রদর্শনকেন্দ্র ও গুদাম স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইউনান প্রদেশের বাণিজ্য বিভাগের উদ্যোগে এ সুবিধা তৈরির প্রক্রিয়া চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ জানান, প্রায় ২ হাজার বর্গফুটের প্রদর্শনকেন্দ্র এবং সমপরিমাণ জায়গায় গুদাম চালুর জন্য একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে। চলতি বছরের মধ্যেই এটি চালু হতে পারে।

এ ধরনের স্থায়ী প্রদর্শনকেন্দ্র বাংলাদেশি পণ্যের নমুনা প্রদর্শন, ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে শেষ পর্যন্ত এর সাফল্য নির্ভর করবে পণ্যের মূল্য, মান, সরবরাহের ধারাবাহিকতা, বিপণন এবং চীনা ক্রেতাদের প্রকৃত চাহিদার ওপর।

পোশাকের বাইরে চীনা বিনিয়োগের সম্ভাবনা কোথায়?

বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক। কিন্তু চীন নিজেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক উৎপাদক। ফলে শুধু তৈরি পোশাক রপ্তানির দিকে নজর না দিয়ে চীনা বিনিয়োগকে বাংলাদেশের উচ্চমূল্যের ও পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্প গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, “বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক শুধু কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি কেনার সম্পর্ক হয়ে থাকলে আমাদের সম্ভাবনা সীমিত থাকবে। আমরা চাই চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বাংলাদেশের পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্প এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে আসুক।”

এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম তন্তু, মানবসৃষ্ট তন্তু, প্রযুক্তিগত বস্ত্র, রং ও প্রিন্টিং এবং পোশাকের পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্পে চীনা বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছে বিজিএমইএ।

২০২৬ সালের ৪ আগস্ট বিজিএমইএ ও বাংলাদেশে প্রবাসী চীনা উদ্যোক্তাদের সংগঠন ‘ওভারসিজ চাইনিজ অ্যাসোসিয়েশন’-এর মধ্যে চীনা বিনিয়োগ, যৌথ উদ্যোগ এবং বন্ধ বা দুর্বল কারখানায় নতুন পুঁজি ও প্রযুক্তি আনার বিষয়ে উদ্যোগ শুরু হয়েছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “চীনের বাজার বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ, কিন্তু সেই বাজারে প্রবেশের জন্য পণ্য, বিপণন ও ব্যবসায়িক কৌশলও আলাদা করতে হবে। আমরা দীর্ঘদিন ইউরোপ-উত্তর আমেরিকার ক্রেতাকেন্দ্রিক কাঠামোয় অভ্যস্ত।”

বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ঘোষণা, বাস্তবে কারখানা কতটি?

চীনা বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে বড় অঙ্কের নানা ঘোষণা এসেছে। শিল্পপার্ক, ইলেকট্রনিকস, বস্ত্র, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ ও প্রস্তাবের কথা প্রকাশ্যে এসেছে।

কিন্তু বিনিয়োগের ঘোষণা এবং বাস্তবে উৎপাদন শুরু করা কারখানা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

একটি বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জমি, অর্থায়ন, অনুমোদন, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ-গ্যাস, দক্ষ জনবল এবং বাজার—সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। শুধু সমঝোতা স্মারক বা বিনিয়োগ ঘোষণাকে বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতার সমান হিসেবে দেখা যায় না।

শিল্পায়নের বাস্তব ফল তখনই পাওয়া যায়, যখন বিনিয়োগকারী জমি পায়, অর্থায়ন নিশ্চিত করে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন করে, কারখানা নির্মাণ করে, যন্ত্রপাতি স্থাপন করে এবং শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়।

এ বিষয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনের মন্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

তবে এর আগে বিভিন্ন প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে তিনি বিনিয়োগের ঘোষণা ও বাস্তবায়নের মধ্যে পার্থক্যের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল—বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রস্তাব ইতিবাচক সংকেত হলেও মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সেই প্রস্তাবকে প্রকল্পে এবং প্রকল্পকে বাস্তব উৎপাদনে রূপ দেওয়া।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে আটকে যেতে পারে বিনিয়োগ

বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পথে অন্যতম বড় বাস্তব চ্যালেঞ্জ জ্বালানি। বিশেষ করে শিল্পকারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলে বড় বিনিয়োগও প্রত্যাশিত উৎপাদনে যেতে পারে না।

২০২৬ সালের জুনে আশিক চৌধুরী প্রকাশ্যে বলেছিলেন, স্থানীয় ও বিদেশি উভয় ধরনের বিনিয়োগকারীর জন্যই জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাসের সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের মেঘনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে গড়ে ওঠা তিনটি কারখানা গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে বছরের পর বছর পূর্ণ উৎপাদনে যেতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এটি দেখায়, করছাড়, নীতিসুবিধা বা বিনিয়োগ অনুমোদন থাকলেও উৎপাদন চালানোর মতো অবকাঠামো ও জ্বালানি নিশ্চিত না হলে বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া কঠিন।

বিদেশি বিনিয়োগকারীর কাছে তাই প্রশ্নটি শুধু বাংলাদেশে বিনিয়োগ করা নিরাপদ কি না—এমন নয়; বরং বিনিয়োগের পর কারখানাটি নিয়মিত ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে চালানো যাবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্কের আসল চ্যালেঞ্জ কোথায়?

চীন থেকে বাংলাদেশে বিপুল পণ্য আসছে—এটি যেমন সত্য, তেমনি এসব আমদানির একটি অংশ দেশের শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত—এটিও গুরুত্বপূর্ণ।

একদিকে চীনা যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য বাংলাদেশের শিল্পকে উৎপাদনের উপকরণ দিচ্ছে। অন্যদিকে চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনও আমদানির তুলনায় অতি ক্ষুদ্র।

ফলে সম্পর্কটিকে শুধু “আমদানি বনাম রপ্তানি” দিয়ে বিচার করলে চিত্রের একটি অংশ দেখা হয়। আবার বিপুল আমদানিকে শিল্পায়নের সাফল্য হিসেবেও ধরে নেওয়া যায় না। কারণ আমদানি করা উপকরণ কতটা স্থানীয় মূল্য সংযোজন তৈরি করছে, কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং উৎপাদিত পণ্যের কতটা রপ্তানি হচ্ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ হতে পারে চীনা বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদন নেটওয়ার্ককে স্থানীয় শিল্প সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করা। বিশেষ করে পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্প, কৃত্রিম ও প্রযুক্তিগত তন্তু, ইলেকট্রনিকস, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্য এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতা ধীরে ধীরে উৎপাদন সক্ষমতায় রূপ নিতে পারে।

একই সঙ্গে চীনের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ বাড়াতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য, মান, দাম, বিপণন, সার্টিফিকেশন এবং সরবরাহ সক্ষমতার উন্নতি প্রয়োজন।

ঘাটতি কমানোর চেয়ে বড় প্রশ্ন উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি নিঃসন্দেহে বড় অঙ্ক। তবে এই ঘাটতির প্রকৃতি বোঝা জরুরি।

যদি আমদানি করা যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল স্থানীয় উৎপাদন বাড়ায়, নতুন শিল্প তৈরি করে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ায়, তাহলে আমদানির একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতার বিনিয়োগে পরিণত হতে পারে।

অন্যদিকে যদি আমদানি মূলত ভোগনির্ভর হয় এবং স্থানীয় মূল্য সংযোজন ও রপ্তানি সক্ষমতা না বাড়ায়, তাহলে ঘাটতি অর্থনীতির ওপর ভিন্ন ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।

সুতরাং চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ মূল্যায়নে শুধু আমদানি কমানো বা রপ্তানি বাড়ানোর লক্ষ্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একটি উৎপাদন ও বিনিয়োগ কাঠামো তৈরি করা, যেখানে চীনা পণ্য, প্রযুক্তি ও পুঁজি বাংলাদেশের স্থানীয় শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হবে এবং একই সঙ্গে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য চীনের বিশাল বাজারও কার্যকরভাবে উন্মুক্ত হবে।

চীন থেকে বাংলাদেশে আসা প্রতিটি জাহাজ যদি শুধু আমদানির প্রতীক না হয়ে নতুন কারখানা, নতুন প্রযুক্তি, নতুন কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যতের রপ্তানি সক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করে—তাহলেই বিপুল বাণিজ্য ঘাটতির অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা অন্য মাত্রা পাবে।

আর সেই চক্রটি কার্যকরভাবে তৈরি করা না গেলে চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্য সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে মূলত একমুখী আমদানিনির্ভর সম্পর্ক হিসেবেই থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!