ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

menu

রায়পুর ভূমি অফিসে দুর্নীতি করেও টিকতে পারেনি, ফেরত দিতে হলো সরকারি ১২ লাখ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ১২:২০ পিএম

রায়পুর ভূমি অফিসে দুর্নীতি করেও টিকতে পারেনি, ফেরত দিতে হলো সরকারি ১২ লাখ টাকা

ছবিঃ সংগৃহীত

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলা ভূমি অফিসে সরকারি রাজস্ব আদায়ের ১২ লাখ ৭ হাজার ৯১০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে। অডিটে অনিয়মের বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত দুই কর্মচারী হলেন প্রধান সহকারী কাম-হিসাবরক্ষক জাহাঙ্গীর আলম এবং সার্টিফিকেট পেশকার (নাজির) নকিব হোসেন শান্ত। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

 

দাপ্তরিক চিঠিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে চান্দিনা ভিটির একসনা লিজমানি বাবদ আদায় করা ১ লাখ ৯ হাজার ১৩০ টাকা এবং ভিপি লিজমানির নথি বাবদ আদায় করা ১০ লাখ ৯৮ হাজার ৭৮০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। দুটি খাতের মোট অর্থের পরিমাণ ১২ লাখ ৭ হাজার ৯১০ টাকা।

 

সম্প্রতি লক্ষ্মীপুরের হিসাব তত্ত্বাবধায়কের অডিটে বিষয়টি উঠে আসে। পরে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসককে অর্থ উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী অর্থ জমা এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়।

অডিটে উঠে আসে সরকারি অর্থ জমা না দেওয়ার তথ্য

সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, রায়পুর উপজেলা ভূমি অফিসে চান্দিনা ভিটির একসনা লিজমানি এবং ভিপি লিজমানির নথি বাবদ আদায় করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত অর্থ জমা না পড়ায় হিসাব যাচাইয়ের সময় অনিয়মের বিষয়টি সামনে আসে।

 

ভূমি মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্মীপুরের হিসাব তত্ত্বাবধায়ক মনজুরুল আলম গত ৯ সেপ্টেম্বর লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেন, দুটি ডিসিআর বইয়ের মাধ্যমে প্রধান সহকারী কাম-হিসাবরক্ষক জাহাঙ্গীর আলম ওই অর্থ আদায় করেছিলেন। অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় সার্টিফিকেট পেশকার (নাজির) নকিব হোসেন শান্তর যোগসাজশ থাকার অভিযোগও ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

 

চিঠিতে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত অর্থ আদায় ও সরকারি কোষাগারে জমার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে মিথ্যা বিবরণী দাখিল করে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে সহযোগিতা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

 

তবে দাপ্তরিক নথিতে উত্থাপিত অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এবং দুই কর্মচারীর প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণের বিষয়টি বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

দুই কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ

অর্থ জমা না দেওয়ার বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসককে অর্থ উদ্ধার এবং অভিযুক্ত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।

 

এর ধারাবাহিকতায় লক্ষ্মীপুরের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর হাবিবুর রহমান গত ৪ অক্টোবর রায়পুরের সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) চিঠি দেন। ওই চিঠিতে সরকারি অর্থ কোষাগারে জমা করা এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

 

এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর রায়পুরের সদ্য বিদায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিগার সুলতানা অভিযুক্ত দুই কর্মচারীকে অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে সরকারি অর্থ কোষাগারে জমা না দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয় তাঁদের।

 

চিঠিতে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩ ধারার উপধারা (ঘ) ও (ঙ) অনুযায়ী কেন তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে জবাব চাওয়া হয়।

 

অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর আলম বর্তমানে রামগতি উপজেলা ভূমি অফিসে কর্মরত রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

নকিব হোসেন শান্তর দাবি, তিনি অর্থ আত্মসাৎ করেননি

অভিযোগের বিষয়ে সার্টিফিকেট পেশকার (নাজির) নকিব হোসেন শান্ত বলেন, জাহাঙ্গীর আলমকে বিশ্বাস করে তিনি প্রতি মাসের অর্থ জমা হয়েছে বলে উপজেলা ও জেলা কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠিয়েছিলেন। তবে তিনি নিজে কোনো অর্থ আত্মসাৎ করেননি বলে দাবি করেন।

 

নকিব হোসেন শান্ত বলেন, “জাহাঙ্গীর আলমকে বিশ্বাস করে আমি প্রতি মাসের টাকা প্রতি মাসে জমা হয়েছে মর্মে উপজেলা ও জেলা কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দেই। আমি কোনো টাকা আত্মসাৎ করিনি। আমি আমার নোটিশের জবাব দিয়েছি। কর্তৃপক্ষ পরবর্তী বিষয়টি দেখবেন।”

 

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়ে তিনি জাহাঙ্গীর আলমের ওপর নির্ভর করেছিলেন। তবে প্রতিবেদন দাখিল, হিসাব সংরক্ষণ এবং অর্থ জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কার কী দায়িত্ব ছিল, তা তদন্তে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

 

অন্যদিকে, প্রধান সহকারী কাম-হিসাবরক্ষক জাহাঙ্গীর আলমের বক্তব্য জানতে একাধিকবার তাঁর কর্মস্থলে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি। বারবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে পুরো অর্থ: উপজেলা প্রশাসন

রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেহেদী হাসান কাউছার জানিয়েছেন, আত্মসাতের অভিযোগে আলোচিত অর্থ ইতিমধ্যে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্ত কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।

 

অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হলেও অর্থ আদায়, সংরক্ষণ, হিসাব উপস্থাপন এবং নির্ধারিত সময়ে জমা না দেওয়ার ঘটনায় কার কী ধরনের দায় রয়েছে, তা নির্ধারণের বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে দাপ্তরিক হিসাব ও অডিটের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের করে আনার প্রয়োজন রয়েছে।

জেলা প্রশাসনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মাহবুব হাসানের সঙ্গে ফোন ও মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অর্থ ফেরত এলেও দায় নির্ধারণ জরুরি

সরকারি ভূমি অফিসে রাজস্ব আদায় ও জমার হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আদায় করা অর্থ নির্ধারিত সময়ে সরকারি কোষাগারে জমা না পড়লে তা সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

 

রায়পুর উপজেলা ভূমি অফিসের ঘটনায় ১২ লাখ ৭ হাজার ৯১০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলেও অর্থ জমা না দেওয়ার পেছনে কী ঘটেছিল, হিসাবের তথ্য কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের দায়িত্ব ও ভূমিকা কী ছিল—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর পেতে বিভাগীয় তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।

 

প্রশাসনিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ভূমি অফিসের রাজস্ব আদায়, ডিসিআর বই সংরক্ষণ, হিসাব যাচাই এবং সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কোনো দুর্বলতা থাকলে তা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা জরুরি।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!