ঢাকা বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

menu

জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) হোস্টেল আয় ১২ কোটি, কোষাগারে জমা হয়নি ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ১০:০৮ এএম

জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) হোস্টেল আয় ১২ কোটি, কোষাগারে জমা হয়নি ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা

ছবিঃ সংগৃহীত

রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় অবস্থিত জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান। তবে প্রতিষ্ঠানটির হোস্টেল পরিচালনা, আয়-ব্যয়, প্রশিক্ষণ কোর্স, সরকারি ক্রয়, দোকান ভাড়া, স্টক ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে একাধিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার চিত্র উঠে এসেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) সাম্প্রতিক পরিদর্শনে।

ডিআইএর পরিদর্শন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নায়েমের পাঁচটি হোস্টেলে মোট ৫৫২টি আসন রয়েছে। ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এসব হোস্টেলের বিভিন্ন কোর্স বাবদ ১২ কোটি ১৯ লাখ ৬১ হাজার ১৭ টাকা আয় এবং ৮ কোটি ৯৯ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫৬ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ৩ কোটি ২০ লাখ ১৫ হাজার ৩৬১ টাকা অবশিষ্ট থাকার কথা। কিন্তু এ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ডিআইএ।

শুধু হোস্টেল খাতেই নয়, নায়েমের জমিতে থাকা ক্যাফেটেরিয়া, লন্ড্রি, সেলুন ও মনিহারি দোকানের ভাড়ার অর্থ নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে নিরীক্ষা সংস্থাটি। ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থাপনার ভাড়া নায়েম কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড সংগ্রহ করছে। গত পাঁচ বছরে এ খাত থেকে নেওয়া ৩২ লাখ ৫৩ হাজার ৭৫০ টাকাসহ আগের বছরগুলোর প্রাপ্ত অর্থও সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে ডিআইএ।

হোস্টেলের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতার ঘাটতি

নায়েমে রয়েছে পাঁচটি হোস্টেল—শহীদ বুদ্ধিজীবী হোস্টেল, শহীদ জননী হোস্টেল, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হোস্টেল, অমর একুশে হোস্টেল ও সোনার বাংলা হোস্টেল। এসব হোস্টেলে মোট ৫৫২টি সিট রয়েছে।

ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচ অর্থবছরে হোস্টেলগুলোর বিভিন্ন কোর্স থেকে ১২ কোটি ১৯ লাখ ৬১ হাজার ১৭ টাকা আয় এবং ৮ কোটি ৯৯ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫৬ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। কিন্তু নিরীক্ষার সময় সংশ্লিষ্টরা স্টক রেজিস্টার, বিল-ভাউচারসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেননি।

পাশাপাশি এসব পণ্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাট ও ট্যাক্স পরিশোধের প্রমাণকও পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আয় ও ব্যয়ের হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ডিআইএ হোস্টেল খাত থেকে অবশিষ্ট ৩ কোটি ২০ লাখ ১৫ হাজার ৩৬১ টাকা রাজস্ব খাতে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য সরবরাহ করা সুযোগ-সুবিধার তালিকা দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন এবং হোস্টেল থেকে অর্জিত অর্থ হোস্টেল খাতেই ব্যয় করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

দোকানের ভাড়া নেয় কর্মচারী সমবায় সমিতি

নায়েমের নিজস্ব জমিতে ক্যাফেটেরিয়া, লন্ড্রি, সেলুন ও মনিহারি দোকান রয়েছে। ডিআইএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৯ সাল থেকে এসব দোকানের ভাড়া নায়েম কর্মচারী বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড সংগ্রহ করে আসছে।

নিরীক্ষায় গত পাঁচ বছরে এভাবে সংগ্রহ করা ৩২ লাখ ৫৩ হাজার ৭৫০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত এ খাত থেকে পাওয়া অর্থও সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে এ ব্যবস্থাপনার আইনগত ও আর্থিক ভিত্তি স্পষ্ট করার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে।

প্রশিক্ষণ কোর্সে একই বিষয়, নেই কাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা

নায়েমের মূল দায়িত্ব শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির চলমান প্রশিক্ষণ কোর্সগুলোর মডিউল ও পাঠ্যসূচি নিয়েও গুরুতর পর্যবেক্ষণ দিয়েছে ডিআইএ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নায়েমে বর্তমানে ২৬ ধরনের প্রশিক্ষণের মডিউল ও টপিক রয়েছে। তবে একেকটি কোর্সের মডিউলের মধ্যে যথেষ্ট অসামঞ্জস্য এবং পুনরাবৃত্তি রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ও উদ্দেশ্য বিবেচনায় নিয়ে মডিউলগুলো যথাযথভাবে প্রণয়ন করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে অ্যাডভান্সড কোর্স অন স্কিল ডেভেলপমেন্ট (এসিএসডি)-তে ১০৮টি টপিক এবং শিক্ষা ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক সিনিয়র স্টাফ কোর্স (এসএসসিইএম)-এ ১১৫টি টপিক রয়েছে। এর মধ্যে ৭৮টি টপিকের মিল পাওয়া গেছে।

ডিআইএর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একই ধরনের বিষয় বারবার পড়ানোর কারণে প্রশিক্ষণের সময় ও অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

পদমর্যাদা ভিন্ন হলেও পাঠ্যসূচিতে বড় মিল

নায়েমের অ্যাডভান্সড কোর্স অন এডুকেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (এসিইএম) সহযোগী অধ্যাপক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য এবং এসএসসিইএম অধ্যাপক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জন্য পরিচালিত হয়।

ডিআইএ দুই কোর্সের পাঠ্যসূচি পর্যালোচনা করে বিষয়বস্তু ও মডিউলে উল্লেখযোগ্য মিল ও পুনরাবৃত্তি পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পদমর্যাদা, দায়িত্ব ও অভিজ্ঞতার স্তর ভিন্ন হওয়ার পরও প্রায় একই ধরনের পাঠ্যসূচি অনুসরণ করা হলে দুই কোর্সের স্বতন্ত্র উদ্দেশ্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।

অন্যদিকে এসিএসডি কোর্সের অনুমোদনসংক্রান্ত নথিতে সহকারী অধ্যাপক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ নির্দেশিকার মডিউল ও সিলেবাসে অনুমোদিত উদ্দেশ্যের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি পাওয়া গেছে বলে ডিআইএ জানিয়েছে।

মূল্যায়নের তথ্য নিয়মিত সংরক্ষণ হয় না

নায়েমের প্রশিক্ষণ কোর্সে পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, উপস্থাপনা, উপস্থিতি ও অন্যান্য মূল্যায়নের ফলাফল কোর্স চলাকালে নিয়মিতভাবে হালনাগাদ ও সংরক্ষণ করা হয় না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিটি কোর্সের সেরা ২০ জন প্রশিক্ষণার্থীর বৈদেশিক শিক্ষা সফরে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না বলে ডিআইএ জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে কোর্সের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মডিউল ও টপিক পুনর্বিন্যাস, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ উপাদান বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

৪৫ দিনের প্রশিক্ষণে ১৮ কর্মচারীর হিসাব নেই

জাতীয়করণকৃত কলেজ শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এসইডিপির অর্থায়নে ৪৫ দিনব্যাপী বেসিক ট্রেনিং কোর্স পরিচালনা করে নায়েম। এরই মধ্যে সম্পন্ন হওয়া ৪০টি কোর্সের মধ্যে পাঁচটির তথ্য বিশ্লেষণ করেছে ডিআইএ।

নিরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতিটি প্রশিক্ষণে দৈনিক মজুরিভিত্তিক ১৮ জন কর্মচারীকে বিভিন্ন ধরনের সম্মানি বা মজুরি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের তালিকা পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া অফিস অ্যাটাচমেন্টে ৪০ জন এবং কোর্স পরিচালকদের তিনজনের জন্য এক দিনে ১২টি গাড়ি ভাড়া করা হয়। এ খাতে ৯৬ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।

ডিআইএর মতে, অস্বাভাবিক সংখ্যক যানবাহন ও সহায়ক জনবল ব্যবহার, প্রয়োজনীয় চাহিদাপত্র ও গ্রহণপত্রের ঘাটতি, পুনরাবৃত্ত সামগ্রী ক্রয় এবং যানবাহন ও জ্বালানি খাতে একই ধরনের ব্যয়ের প্রবণতা পাওয়া গেছে।

এসব ব্যয়ের ক্ষেত্রে আর্থিক বিধিবিধান ও পিপিআর যথাযথভাবে অনুসরণের সুপারিশ করা হয়েছে।

গবেষণা ও প্রকাশনায়ও খাতভিত্তিক ঘাটতি

ডিআইএর প্রতিবেদনে নায়েমের গবেষণা কার্যক্রমের আর্থিক ব্যবস্থাপনাতেও ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ইআরএম বাজেটে গবেষণা পরিচালনার পাশাপাশি সম্পাদনা, পর্যালোচনা, প্রকাশনা, মুদ্রণ ও প্রচারের জন্য পৃথক খাত রাখা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রশিক্ষণ ও গবেষণার মতো নায়েমের মূল কার্যক্রমে পরিকল্পিত বাজেট কাঠামো নিশ্চিত করা না হলে প্রতিষ্ঠানটির একাডেমিক কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেওয়া কঠিন হতে পারে বলে প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ থেকে প্রতীয়মান হয়।

নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের হাতেই সব কাজ

সরকারি বরাদ্দ থেকে নায়েমের বিভিন্ন পণ্য ও পূর্তকাজের ব্যয়েও পিপিআর যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে ডিআইএর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারই বিভিন্ন ধরনের—পণ্য সংগ্রহ ও পূর্ত—কাজ করে থাকেন। পণ্য গ্রহণের জন্য কমিটি থাকলেও বাস্তবে স্টোরকিপার পণ্য গ্রহণ করেন বলে নিরীক্ষায় উঠে এসেছে।

এ কারণে বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং পণ্য সংগ্রহের সময় গ্রহণকারী কমিটির নির্ধারিত স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী পণ্যের মান যাচাই করে গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

হিসাব শাখায় ‘শুদ্ধি অভিযান’ প্রয়োজন

নায়েমের প্রকল্প থেকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত কয়েকজন কর্মচারীর ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ পাওয়ার কথা জানিয়েছে ডিআইএ। তাদের কর্মকাণ্ডের কারণে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমনকি প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারছেন না—পরিদর্শনকালে এমন চিত্র পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ডিআইএ। তবে কোন কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত, প্রতিবেদনে তাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসাব শাখায় শুদ্ধি অভিযান প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছে নিরীক্ষা সংস্থাটি।

একই সঙ্গে মহাপরিচালক ও পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে নেতৃত্বদানের ক্ষমতা, দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত সক্ষমতা, গবেষণার আগ্রহ ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা নেই, বন্ধ স্টক টেকিং

নায়েমে নিয়মিত ও যথাযথ অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা হয় না বলেও ডিআইএর পরিদর্শনে উঠে এসেছে। রাজস্ব অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত আর্থিক চিত্র যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া নায়েমে নিয়মিত স্টক টেকিং চালু নেই।

পরিদর্শনের সময় প্রশাসনিক ভবনের বেজমেন্ট ও স্টোররুমের সামনের করিডোরে নিলামযোগ্য চেয়ার, এসি, ফটোকপিয়ার মেশিন, ডেস্কটপ কম্পিউটার, প্রিন্টার ও ফ্রিজ দীর্ঘদিন ধরে স্তূপ করে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এসব অকেজো মালপত্র নিলামের মাধ্যমে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেছে ডিআইএ।

পুরোনো ভবন, জলাবদ্ধতা ও আবাসন সংকট

আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের পাশাপাশি নায়েমের অবকাঠামোগত সংকটও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

ডিআইএর পর্যবেক্ষণে, নায়েমের পুরোনো ভবন ও আসবাবপত্রের কারণে প্রশিক্ষণে আসা শিক্ষকদের নানা ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়। বর্ষাকালে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন অংশে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পানি কোমরসমান উচ্চতায় পৌঁছে যায় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জলাবদ্ধতার কারণে ক্যাম্পাসের রাস্তাঘাট, আসবাবপত্র ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে পানি সরানো, পরিচ্ছন্নতা ও পুনর্বাসনেও অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।

হোস্টেলগুলোর অবস্থাও সন্তোষজনক নয় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অধিকাংশ হোস্টেল পুরোনো ও স্যাঁতসেঁতে হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও সিলিংয়ের পলেস্তারা খসে বিছানায় পড়ছে এবং ওপরতলার বাথরুম থেকে পানি চুঁইয়ে পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকার বাইরে নায়েম স্থানান্তরের সুপারিশ

বিদ্যমান অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নায়েমকে ঢাকার বাইরে আরও প্রশস্ত ও পরিকল্পিত স্থানে সম্প্রসারণ বা স্থানান্তরের সুপারিশ করেছে ডিআইএ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ক্যাম্পাসে আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধার পাশাপাশি গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষণ কেন্দ্র, ডিজিটাল লার্নিং অবকাঠামো, আবাসিক সুবিধা, গ্রন্থাগার, কনফারেন্স ও সেমিনার সুবিধা, একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবন এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

ডিআইএর মতে, এ ধরনের পরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে নায়েমের প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।

নায়েমের বক্তব্য

ডিআইএর প্রতিবেদনে উঠে আসা অভিযোগ ও পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে জানতে চাইলে নায়েমের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. ওয়াসীম মো. মেজবাহুল হক বলেন, ডিআইএর প্রতিবেদন তিনি এখনো হাতে পাননি। তাই এ বিষয়ে আপাতত কোনো মন্তব্য করবেন না।

ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক মো. আফলাতুন বলেন, নায়েমে নানা সমস্যা ও সংকট রয়েছে। পরিদর্শনের সময় এসব বিষয় তুলে ধরার পাশাপাশি কীভাবে সেগুলোর সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, নায়েমকে ঢাকার বাইরে স্থানান্তরেরও সুপারিশ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন ক্যাম্পাসে আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা, গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষণ কেন্দ্র, ডিজিটাল লার্নিং, আবাসিক সুবিধা, গ্রন্থাগার, কনফারেন্স ও সেমিনার সুবিধাসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সমন্বিতভাবে গড়ে তোলা গেলে তা দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

ডিআইএর প্রতিবেদনের এসব পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করছে। একই সঙ্গে হোস্টেল আয়, দোকান ভাড়া, প্রশিক্ষণ ব্যয়, সরকারি ক্রয়, স্টক ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার ক্ষেত্রে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোর নথিভিত্তিক নিষ্পত্তি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!