পাচার হওয়া অর্থ ও বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারে বড় ধরনের আইনি উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এর অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দেওয়ানি মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। তদন্তে যুক্তরাষ্ট্রে সিকদার গ্রুপের প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। এসব সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনতেই এবার যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে আইনি লড়াইয়ে নামার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলাটি এখনো দায়ের হয়নি। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো আইনি ও প্রক্রিয়াগত প্রস্তুতি শেষ করার কাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সিকদার গ্রুপের সম্পদের সন্ধান
দেশের ব্যাংক খাতে ঋণসংক্রান্ত নানা অনিয়ম ও কেলেঙ্কারির অভিযোগে আলোচিত নাম সিকদার গ্রুপ। ন্যাশনাল ব্যাংকসহ দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং সেই অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত চলছে।
সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার অনুসন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রে গ্রুপটির প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের সম্পদের সন্ধান পাওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এসব সম্পদের প্রকৃতি, মালিকানা এবং অর্থের উৎসসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যাচাই করে আইনগত প্রক্রিয়ায় এগোতে চাইছে বাংলাদেশ।
তদন্তে পাওয়া সম্পদগুলো আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জব্দ বা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলে তা বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
অর্থ উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দেওয়ানি মামলা
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে এবার যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দেওয়ানি মামলা করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ১১টি বড় শিল্প গ্রুপের মধ্যে একটি গ্রুপের অর্থ উদ্ধারের বিষয়ে বড় অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং অর্থ উদ্ধারে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে এ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগ সফল হলে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রে এটি একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।
আইনি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো
অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আইনি প্রতিষ্ঠান আর-ওয়ান কাজ করছে বলে জানানো হয়েছে। অর্থ উদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়ার প্রস্তুতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য মামলার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আলোচনা চলছে।
প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে। এরপর ন্যাশনাল ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি এবং সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে এ বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার কথা রয়েছে।
এসব চুক্তির মাধ্যমে বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্তকরণ, আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সম্ভাব্য অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘নো উইন, নো পে’ ভিত্তিতে আইনি উদ্যোগ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পুরো উদ্যোগটি ‘নো উইন, নো পে’ ভিত্তিতে পরিচালিত হবে। অর্থাৎ, আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ বা সম্পদ উদ্ধার করা সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোকে মামলার ব্যয় বহন করতে হবে না।
বিদেশে বড় অঙ্কের অর্থ উদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়ায় সাধারণত দীর্ঘ সময় ও উল্লেখযোগ্য ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে। এ ধরনের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উদ্ধার না হলে ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না দেওয়ার জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কীভাবে উদ্ধার হওয়া অর্থ ফেরত আসতে পারে
অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়ায় রিকভারি এজেন্ট বা সংশ্লিষ্ট আইনি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থাকবে। বিশ্লেষক মামুনুর রশিদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিদেশ থেকে অর্থ উদ্ধারের পর তা সংশ্লিষ্ট ঋণদাতা বা লেন্ডারদের কাছে ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকার উদ্ধার হওয়া অর্থের একটি অংশ রিকভারি এজেন্টকে দিতে পারে। এরপর রিকভারি এজেন্ট সংশ্লিষ্ট লেন্ডারদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবে।
অর্থাৎ, বিদেশে থাকা সম্পদ বা অর্থ শনাক্ত করার পর তা আইনগতভাবে জব্দ ও পুনরুদ্ধার করা এবং পরে সংশ্লিষ্ট পাওনাদারদের কাছে ফেরত দেওয়ার জন্য একাধিক ধাপের প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
একাধিক ব্যাংকের অর্থ উদ্ধারের চেষ্টা
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিকদার গ্রুপের বিরুদ্ধে ঋণের নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে পাচারের অভিযোগের সঙ্গে একাধিক ব্যাংকের পাওনা জড়িত। ন্যাশনাল ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের অর্থের একটি অংশ বিদেশে স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে।
তদন্তের মাধ্যমে বিদেশে সম্পদ শনাক্ত হওয়ার পর এখন সেসব সম্পদের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর পাওনার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করাই অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলা হলে সেখানে উপস্থাপন করা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই সম্পদ পুনরুদ্ধারের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।
অর্থ পাচার ঠেকাতে দৃষ্টান্ত তৈরির প্রত্যাশা
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, পাচার হওয়া অর্থ আর কখনো ফেরত আনা যাবে না—এমন হতাশা অনেকের মধ্যে রয়েছে। একটি উদাহরণ তৈরি করা গেলে তা অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে এবং যারা অর্থ পাচার করেছে, তাদের নিরুৎসাহিত করবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগে ইতিবাচক ফল পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ পুনরুদ্ধারে সফলতা এলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা বাড়বে।
কত টাকা দেশে ফিরবে, তা নির্ভর করবে আদালতের সিদ্ধান্তে
যুক্তরাষ্ট্রে শনাক্ত হওয়া প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারের সম্পদের কতটা শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়। কারণ সম্পদের মালিকানা, অর্থের উৎস, সংশ্লিষ্ট লেনদেন এবং বাংলাদেশের দাবির পক্ষে প্রমাণসহ বিভিন্ন আইনি বিষয় আদালতে উপস্থাপন করতে হবে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে মামলার ফলাফল, আদালতের আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট সম্পদের আইনগত অবস্থার ওপরও অর্থ পুনরুদ্ধারের পরিমাণ নির্ভর করবে।
ফলে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার সম্পদ শনাক্ত হওয়ার তথ্যকে সম্ভাব্য পুনরুদ্ধারের পরিমাণ হিসেবে দেখা হলেও, এই অর্থের পুরোটা বাংলাদেশে ফেরত আসবে—এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে নতুন অধ্যায়
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে বাংলাদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে সম্ভাব্য এই মামলা গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশে থাকা বড় অঙ্কের সম্পদ শনাক্ত করার পর সেগুলো আইনগত প্রক্রিয়ায় দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ অর্থ পাচারবিরোধী কার্যক্রমকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত কত সম্পদ উদ্ধার হবে এবং তা কীভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও পাওনাদারদের কাছে ফেরত যাবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে শুরু হতে যাওয়া আইনি প্রক্রিয়ার ফলাফলের ওপর।

