রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী এলাকায় ঐতিহাসিক রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুর ও গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর একাধিক সাংগঠনিক কমিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বুধবার পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের পক্ষ থেকে এসব সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি এবং ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্ত
বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক মুহম্মদ মুনির হোসেন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলের নির্দেশক্রমে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর মো. আমিনুল হককে আহ্বায়ক এবং মো. মোস্তফা জামানকে সদস্যসচিব করে ওই কমিটি গঠন করা হয়েছিল। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, খুব শিগগির ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপিতে নতুন সাংগঠনিক কমিটি ঘোষণা করা হবে।
একই বিজ্ঞপ্তিতে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগে শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, সি-ব্লক ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন এবং মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য হাফিজুর রহমান শুভ্রকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সব পদ থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়।
যুবদলের কমিটিও বিলুপ্ত
যুবদলের দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত করার কথা জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। ওই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন শরিফ উদ্দিন জুয়েল এবং সদস্যসচিব ছিলেন সাজ্জাদুল মিরাজ।
তবে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সরবরাহ করা তথ্যে বলা হয়েছে, গত ২৪ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার সময় সাজ্জাদুল মিরাজ ঘটনাটি প্রতিহত করার চেষ্টা করেন এবং বিষয়টি দ্রুত শাহ আলী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও মিরপুর জোনের উপকমিশনারকে জানান।
ভাঙচুরের সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তিনি গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন বলে ওই তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুবদলের আরও কয়েক নেতা বহিষ্কার
একই সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে শাহ আলী থানা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নূর আলম এবং থানা যুবদল নেতা সাজ্জাদুর রহমান মিশু, মো. সোহেল, কবির হোসেন ও আকবর হোসেনকে দল থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়েছে।
তবে এসব নেতার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য বা পৃথক কোনো ব্যাখ্যা সরবরাহ করা তথ্যে পাওয়া যায়নি।
ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত
ছাত্রদলের দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটিও বিলুপ্ত করার কথা জানানো হয়েছে।
২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর মো. রবিন খানকে সভাপতি এবং আকরাম আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে নয় সদস্যের আংশিক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। বৃহত্তর মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকার ১১টি সাংগঠনিক থানা এই কমিটির আওতাধীন ছিল।
স্বেচ্ছাসেবক দলের দুই নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
এদিকে স্বেচ্ছাসেবক দলের সহদপ্তর সম্পাদক ওসমান গণি স্বাক্ষরিত পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দারুস সালাম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আক্তার ও সদস্যসচিব হাফিজুর রহমানকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়েছে।
কী ঘটেছিল রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে?
সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুরের শাহ আলী থানা এলাকায় অবস্থিত বহু বছরের পুরোনো রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একদল লোক হামলা চালিয়ে বুলডোজার দিয়ে স্থাপনাটি ভেঙে দেয়।
ঘটনার পর স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একটি অংশের সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে আসে। সিসিটিভি ফুটেজে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কয়েকজন নেতাকে ঘটনাস্থলে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে ফুটেজে কারও উপস্থিতি থাকলেই তিনি ভাঙচুরে সরাসরি জড়িত ছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভূমিকা ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।
দলীয় সিদ্ধান্তের পর নতুন করে আলোচনা
স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। এরপর বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে একাধিক সাংগঠনিক কমিটি বিলুপ্ত এবং কয়েকজন নেতাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হলো।
দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে এসব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলাভঙ্গ, অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সংগঠনের ভাবমূর্তি-সংশ্লিষ্ট বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভাঙচুরের ঘটনায় প্রত্যেক বহিষ্কৃত ব্যক্তি কী ভূমিকা পালন করেছেন, সে বিষয়ে পৃথকভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা বিজ্ঞপ্তিগুলোতে নেই।
ঘটনাটি ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠেছে বলে সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগেরও স্বাধীন যাচাই বা সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের উপকরণে পাওয়া যায়নি।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো পুরোনো একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুরের ঘটনায় দলীয় পর্যায়ে একাধিক কমিটি বিলুপ্ত ও নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পর এখন মূল প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—ঘটনার সঙ্গে কারা কীভাবে জড়িত ছিলেন এবং স্থাপনাটি ভাঙার বিষয়ে আইনগতভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

