দেশে চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে আবারও ‘জুলাই’ ফিরে আসবে এবং এবার সেই আন্দোলন আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতে ইসলামীর আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে হামলা ও ভাঙচুরে ক্ষতিগ্রস্ত রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার (মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র) পরিদর্শন শেষে তিনি এ কথা বলেন।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও দখলচেষ্টার অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে সেলিম উদ্দিন বলেন, তদন্তে কোনো ধরনের দুর্বলতা দেখানো হলে কিংবা অভিযুক্তদের ছাড় দেওয়া হলে জামায়াতে ইসলামী কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে পারে।
‘চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে জুলাই ফিরে আসবে’
জুলাইয়ের গণআন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে সেলিম উদ্দিন বলেন, জুলাই আন্দোলন কি এ জন্য হয়েছিল যে দেশের মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবে?
তিনি অভিযোগ করেন, দেশে চাঁদাবাজির বিস্তার ঘটেছে। তাঁর ভাষায়, চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে আবারও জুলাই ফিরে আসবে এবং সেই জুলাই আরও ভয়াবহ হবে।
তবে তিনি দাবি করেন, তাঁদের আন্দোলন সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে নয়, বরং চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার যদি চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে আন্দোলন সরকারের বিরুদ্ধেও পরিচালিত হতে পারে।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের হামলা নিয়ে অভিযোগ
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনাকে ‘বর্বরতা’ হিসেবে বর্ণনা করেন সেলিম উদ্দিন। তাঁর অভিযোগ, হামলা ও দখলচেষ্টার সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা জড়িত। এসব ব্যক্তিকে আড়াল করতেই সরকার ভিন্ন ধরনের বক্তব্য দিচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনতে হবে। কোনো সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী এ ঘটনায় জড়িত থাকলে তাঁদের নাম প্রকাশ এবং পদচ্যুত করার দাবি জানান তিনি।
তবে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
দ্রুত তদন্ত শেষ করার দাবি
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় তদন্ত দীর্ঘায়িত না করার আহ্বান জানান জামায়াতের এই নেতা। তাঁর দাবি, তদন্তের নামে ছয় মাস সময়ক্ষেপণ করা যাবে না।
তিনি বলেন, হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তদন্তে কোনো ধরনের গাফিলতি বা দুর্বলতা দেখা গেলে তাঁরা কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেবেন।
সেলিম উদ্দিন আরও বলেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে না পারলে সরকারের ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
‘হামলার সঙ্গে জড়িতদের নিয়েই হাসপাতাল পরিদর্শন’
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিদর্শনের সময় মিরপুর-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আরমানও বক্তব্য দেন।
তিনি অভিযোগ করেন, রাড্ডা হাসপাতালে হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়েই বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্যরা হাসপাতালটি পরিদর্শন করেছেন। তাঁর ভাষায়, বিষয়টি সরকারের জন্য ‘চরম লজ্জার’।
দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন তিনি। প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও মানুষের অধিকার আদায়ের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এই সংসদ সদস্য।
মূল হোতাদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত মূল হোতাদের কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন ব্যারিস্টার আরমান।
তিনি বলেন, মিরপুরের এই একটি ঘটনাই বর্তমানে সারাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রশ্ন তৈরি করে। তাঁর অভিযোগ, হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট আরও বাড়তে পারে।
তবে কারা হামলার মূল হোতা এবং কারা সরাসরি ঘটনায় জড়িত ছিলেন, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়।
মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশের প্রসঙ্গ
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার খবর এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন এবং লিখিতভাবে সেই নির্দেশনা তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনা এবং এর সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগের মধ্যে এ সিদ্ধান্তের খবর সামনে এসেছে। তবে মিষ্টির পদত্যাগের নির্দেশের নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে সরকারি আদেশ বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে কী উল্লেখ করা হয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়নি বলে দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়।
তদন্তের ফলের অপেক্ষা
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন, হামলার উদ্দেশ্য কী ছিল এবং কার নির্দেশ বা সম্পৃক্ততা ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার কথা।
রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় একে অপরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠলেও সেগুলোর সত্যতা নির্ধারণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসা ও মা-শিশুস্বাস্থ্যসেবা কীভাবে স্বাভাবিক করা হবে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক বক্তব্য, সংসদ সদস্যের পদত্যাগের নির্দেশ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এখন তদন্ত কত দ্রুত শেষ হয় এবং ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেদিকেই নজর সংশ্লিষ্টদের।

