ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২৬

menu

গ্যাস সরবরাহ ও চাপ বাড়ায় শিল্পকারখানায় ফিরছে উৎপাদনের গতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: অক্টোবর ১, ২০২৬, ১১:১৫ এএম

গ্যাস সরবরাহ ও চাপ বাড়ায় শিল্পকারখানায় ফিরছে উৎপাদনের গতি

ছবিঃ সংগৃহীত

শিল্পকারখানায় গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ বাড়ায় দেশের উৎপাদন পরিস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। গ্যাসনির্ভর অনেক শিল্পকারখানা ইতোমধ্যে স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরেছে। গত মাসে গ্যাস সংকটের কারণে যেসব কারখানা উৎপাদন বন্ধ রেখেছিল কিংবা সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন করছিল, সেগুলোরও অনেকগুলো ধীরে ধীরে পুরোদমে উৎপাদনে ফিরছে বলে জানিয়েছেন শিল্পোদ্যোক্তারা।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির এই উন্নতি অব্যাহত থাকলে সাম্প্রতিক সময়ে তৈরি হওয়া উৎপাদন ঘাটতি ধীরে ধীরে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, স্পিনিং, ডাইংসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পে উৎপাদন বাড়লে রপ্তানি আয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের পর সরবরাহ বাড়ার দাবি

বাংলাদেশ সচিবালয়ে ব্যবসায়ী নেতা ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে গত ১৪ সেপ্টেম্বরের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ প্রায় দেড় মাস আগের পর্যায়ে ফিরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানান। এরপর থেকেই বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ বাড়তে শুরু করে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তারা।

পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস সরবরাহের তথ্য অনুযায়ী, ২২ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে দৈনিক গড়ে প্রায় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ হয়েছে। এর এক মাস আগে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২ হাজার ৩০০ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৩০০ এমএমসিএফডি বেড়েছে।

শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। ফলে গ্যাসনির্ভর বয়লার, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অন্যান্য শিল্পযন্ত্র তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব হচ্ছে।

অধিকাংশ কারখানা উৎপাদনে ফিরেছে

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি এস এম ফজলুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে অধিকাংশ কারখানা উৎপাদনে ফিরেছে।

তিনি বলেন, গত মাসে গ্যাস সংকটের কারণে যেসব কারখানা উৎপাদন বন্ধ রেখেছিল অথবা উৎপাদনের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছিল, সেগুলোর অনেকগুলোই আবার উৎপাদনে ফিরেছে। তবে শিল্পের চাহিদার তুলনায় বর্তমান গ্যাস সরবরাহ এখনো কম বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এস এম ফজলুল হক আরও বলেন, গ্যাসের সরবরাহ আরও বাড়বে বলে শিল্পোদ্যোক্তারা আশা করছেন। একই সঙ্গে দেশীয় উৎস থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

গাজীপুরে পরিস্থিতির উন্নতি

শিল্পাঞ্চলগুলোর মধ্যে গাজীপুরে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রি (বিসিআই) সভাপতি ও ইভেন্স গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ।

তিনি বলেন, বর্তমানে গাজীপুর এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ পরিস্থিতি অনেক ভালো। গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যার কারণে কোনো শিল্পকারখানা বন্ধ আছে—এমন তথ্য তাঁদের জানা নেই।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, গাজীপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হওয়ায় এখানকার গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

আশুলিয়ার কিছু এলাকায় এখনো ডিজেলনির্ভরতা

তবে সব শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি একই রকম নয়। এস এম ফজলুল হক জানান, শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ ও সরবরাহ আগের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ উন্নতি হয়েছে। তবে আশুলিয়ার কিছু কিছু এলাকায় এখনো ডিজেল সাপোর্ট নিয়ে কারখানা চালাতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, অন্যান্য শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ও বিদ্যুতের পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক ভালো হয়েছে এবং কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়াও বেশ স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।

শিল্পোদ্যোক্তাদের মতে, ডিজেল ব্যবহার করে কারখানা চালাতে হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে গ্যাস সরবরাহের স্থিতিশীলতা শুধু উৎপাদনের জন্য নয়, শিল্পপণ্যের প্রতিযোগিতামূলক মূল্য ধরে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

দুই-তিন সপ্তাহ আগের তুলনায় পরিস্থিতি ভালো

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবুল কাসেম খান বলেন, শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। বর্তমানে অনেক এলাকায় গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল হয়েছে।

তিনি বলেন, দুই-তিন সপ্তাহ আগেও যেসব এলাকায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছিল না, সেসব এলাকার অনেক জায়গায় এখন সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। তৈরি পোশাক খাত দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হওয়ায় এ খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

তাঁর মতে, শুধু এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর না করে দেশীয় গ্যাসের অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগও নিতে হবে।

উৎপাদন বাড়লে রপ্তানিতেও প্রভাব পড়তে পারে

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্যাস সরবরাহের বর্তমান উন্নতি অব্যাহত থাকলে সাম্প্রতিক সময়ে যে উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা ধীরে ধীরে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, স্পিনিং ও ডাইং শিল্পে উৎপাদন বাড়লে রপ্তানি কার্যক্রমেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তৈরি পোশাক খাতের পাশাপাশি টেক্সটাইল শিল্পের বিভিন্ন ধাপ—সুতা উৎপাদন, কাপড় তৈরি, ডাইং ও ফিনিশিং—গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব খাতে উৎপাদন স্বাভাবিক হলে সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমার পাশাপাশি রপ্তানি আদেশ সময়মতো পূরণ করার সক্ষমতাও বাড়তে পারে।

শুধু সরবরাহ বাড়ানো নয়, প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান

শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হলেও দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ গ্যাসের চাপ বারবার ওঠানামা করলে কারখানার উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হয়।

গ্যাসের চাপ কমে গেলে শিল্পকারখানার বয়লার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির উৎপাদন সক্ষমতা কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা ও উৎপাদনের ধারাবাহিকতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস সরবরাহের একটি পূর্বানুমানযোগ্য ও স্থিতিশীল ব্যবস্থা থাকলে কারখানাগুলো উৎপাদন পরিকল্পনা আরও কার্যকরভাবে করতে পারবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং নতুন শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হবে।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার তাগিদ

শিল্প খাতের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন ব্যবসায়ী নেতারা। তাঁদের মতে, শিল্পের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে শুধু আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে ভবিষ্যতে ব্যয় ও সরবরাহ—দুই দিকেই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ অবকাঠামোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, পাইপলাইন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিল্পাঞ্চলভিত্তিক চাহিদা বিবেচনায় সরবরাহ পরিকল্পনা করা হলে শিল্প খাত আরও স্থিতিশীল হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর সুযোগ

শিল্পকারখানায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা গেলে উৎপাদন সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হবে। এর মাধ্যমে শিল্পপণ্যের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে সময়মতো উৎপাদন ও পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতেও তা সহায়ক হতে পারে।

তবে শিল্পোদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, সাম্প্রতিক গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধিকে সাময়িক উদ্যোগ হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নেওয়া হবে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ, দেশীয় উৎসে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং শিল্পাঞ্চলে চাহিদাভিত্তিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ঘাটতি কাটিয়ে দেশের শিল্প ও অর্থনীতিতে আরও গতি ফেরানো সম্ভব হবে।

দৈনিক আজ ও আগামীকাল

অনলাইনে পড়তে স্ক্যান করুন

QR Code
banner
Link copied!